shono
Advertisement
Swami Jnanananda

দশ বছর হিমালয়ে অধ্যাত্মচর্চা, তিনিই পরমাণু গবেষণার পথপ্রদর্শক! চেনেন এই বিজ্ঞানীকে?

Published By: Biswadip DeyPosted: 05:38 PM May 02, 2026Updated: 05:38 PM May 02, 2026

'আমাদের চাই কী জানিস? স্বাধীনভাবে স্বদেশি বিদ্যার সঙ্গে ইংরেজি আর সায়েন্স পড়ানো। চাই টেকনিক্যাল এডুকেশন।' এই উক্তি স্বামী বিবেকানন্দের। তিনি বরাবরই আধ্যাত্মিকতা ও বিজ্ঞানের মেলবন্ধন নিয়ে কথা বলেছেন। তাঁর মতো চিন্তানায়কের এমন মন্তব্য বুঝিয়ে দেয় উনবিংশ শতাব্দীর শেষভাগ থেকে বঙ্গসমাজে কীভাবে এই দুই ধারা মিশতে শুরু করেছিল। বিংশ শতাব্দীতে আমরা পেয়েছিলাম স্বামী জ্ঞানানন্দকে। যিনি একই সঙ্গে অধ্যাত্মবাদ ও বিজ্ঞানের সাধক। এবছর শতবর্ষ পূরণ হল অন্ধ্র বিশ্ববিদ্যালয়ের। যেখানে দেশের প্রথম নিউক্লিয়ার ফিজিক্স বিভাগ প্রতিষ্ঠিত হয়। যা প্রতিষ্ঠা করেছিলেন জ্ঞানানন্দই। জীবনের দশটা বছর যিনি হিমালয়ে তপস্যা করে কাটিয়েছিলেন। এই বৈপরীত্যই তাঁর চরিত্রের বহুমুখিতা এবং বিজ্ঞান-অধ্যাত্মবাদের সম্পর্ককে স্পষ্ট করে তোলে।

Advertisement

১৮৯৬ সালে জন্ম ভূপতিরাজু লক্ষ্মীনরসিমহা রাজুর। অন্ধ্রপ্রদেশের পশ্চিম গোদাবরী জেলায়। বাবা ছিলেন বেদ-আগ্রহী। বাড়িতে ছিল প্রচুর বই। ছোট থেকেই সেই সব বই পড়ার সুযোগ হয়েছিল রাজুর। ফলে সেই বয়স থেকেই অধ্যাত্মবাদ তাঁর বুকের ভিতরে জাগিয়ে তুলেছিল জ্ঞানের অনির্বাণ শিখা। বছর কুড়ি বয়সে বিয়ে হয়ে যায় তাঁর। বাবার আদেশ অমান্য করতে পারেননি। কিন্তু সংসারে জড়িয়ে পড়তে চাননি। মনে মনে ক্রমেই জোরালো হচ্ছিল ঘর ছাড়ার ইচ্ছে। আসলে গৌতম বুদ্ধের আদর্শে দীক্ষিত মানুষটা এরপর চলে যান বুদ্ধের জন্মস্থান লুম্বিনীতে। তারপর সেখান থেকে একে একে বিভিন্ন ধর্মস্থান হয়ে হিমালয়। সেখানে এবং মাউন্ট আবুতে কাটে তাঁর জীবনের দশটা বছর। বৈদিক শিক্ষায় শিক্ষিত হওয়ার পাশাপাশি নৈঃশব্দ্যের ভিতরে নিজের মনের গহীনে ডুব দিয়ে সন্ধান করেছিলেন জীবনসত্য।

এবছর শতবর্ষ পূরণ হল অন্ধ্র বিশ্ববিদ্যালয়ের। যেখানে দেশের প্রথম নিউক্লিয়ার ফিজিক্স বিভাগ প্রতিষ্ঠিত হয়। যা প্রতিষ্ঠা করেছিলেন জ্ঞানানন্দই।

সন্ন্যাসীর জীবন ও বিজ্ঞানীর জীবন এক নয়। অথচ দু'জনের অনুসন্ধিৎসাই প্রবল। স্বামী জ্ঞানানন্দের অন্তরলোক সেই সত্যকে মেলাতে পেরেছিল। আর তাই হিমালয়ের গভীর গোপন থেকে নেমে এসে তিনি পৌঁছে যান জার্মানির ড্রেসডেনে। বেছে নেন অঙ্ক ও পদার্থবিদ্যা। সেখানে শিক্ষা সম্পূর্ণ হতেই পাড়ি দেন প্রাগে। সেখানে চার্লস বিশ্ববিদ্যালয়ে এক্স-রে ফিজিক্স ও স্পেকট্রোস্কপি নিয়ে পড়াশোনা করেন। সেই সময়টায় এই দুই বিষয়ই খুব জনপ্রিয় ছিল। কীভাবে কোনও বস্তুর সঙ্গে তেজস্ক্রিয়তার বিক্রিয়া হয় তা নিয়ে বিশ্বজুড়ে চলছিল চর্চা। আর সেই সময় থেকেই পরমাণুর আচরণ তাঁর আগ্রহের বিষয়বস্তু হয়ে ওঠে। ধীরে ধীরে নিউক্লিয়ার ফিজিক্সের প্রধান বিষয় হয়ে উঠবে যেটা। আর সেই বিষয় নিয়েই নিবিড় চর্চা শুরু করেন জ্ঞানানন্দ। গত শতকের তিনের দশকের মধ্যবর্তী সময়ে নিউক্লিয়ার ফিজিক্সে অ্যাডভান্সড রিসার্চ ডিগ্রি লাভ করেন। শুরু হয় গবেষণার কাজ। ততদিনে শুরু হয়ে গিয়েছে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ।

সেই সময় ব্রিটেনের লিভারপুল বিশ্ববিদ্যালয় ছিল পরমাণু গবেষণার এক ভরকেন্দ্র। যেখানকার প্রাণপুরুষ জেমস চাডউইক। তিনি নোবেলজয়ী। তাঁর তৈরি করা ওই কেন্দ্র থেকেই পিএইচডি সম্পূর্ণ করেন জ্ঞানানন্দ। বিষয় ছিল বিটা রেডিয়েশন স্পেকট্রোস্কপি। বিলেত থেকে তিনি পাড়ি দিলেন মার্কিন ভূমে। সেখানে তিনি মিশিগান বিশ্ববিদ্যালয়ে তাঁর বিষয় নিয়ে কাজ চালিয়ে যাওয়ার পাশাপাশি তেজস্ক্রিয় আইসোটোপ সংক্রান্ত গবেষণাতেও যুক্ত হয়ে পড়েন। একটি বইও লেখেন।

কীভাবে কোনও বস্তুর সঙ্গে তেজস্ক্রিয়তার বিক্রিয়া হয় তা নিয়ে বিশ্বজুড়ে চলছিল চর্চা। আর সেই সময় থেকেই পরমাণুর আচরণ তাঁর আগ্রহের বিষয়বস্তু হয়ে ওঠে। ধীরে ধীরে নিউক্লিয়ার ফিজিক্সের প্রধান বিষয় হয়ে উঠবে যেটা।

এদিকে ততদিনে এসে পড়েছে ১৯৪৭ সাল। দেশ স্বাধীন হয়েছে। জ্ঞানানন্দ বিদেশে পাট চুকিয়ে ফিরে এলেন। সিনিয়র সায়েন্টিফিক অফিসার হিসেবে যোগ দিলেন ন্যাশনাল ফিজিক্যাল ল্যাবরেটরিতে। কয়েক বছর পরে অন্ধ্র বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইস চ্যান্সেলরের অনুরোধে সেখানে যোগ দিলেন নিউক্লিয়ার ফিজিক্স নিয়ে কাজ করতে। সেটা ১৯৫৪ সাল। এরপর ১৯৫৬ সালের ১ জুলাই তাঁর নেতৃত্বে তৈরি হল নিউক্লিয়ার ফিজিক্স বিভাগ। তিনিই ছিলেন বিভাগের প্রধান। তৈরি করলেন ল্যাবরেটরি, আধুনিক যন্ত্রপাতি, প্রশিক্ষিত পড়ুয়া। শতাধিক গবেষণাপত্র ও ২০ জন গবেষককে প্রশিক্ষণ দেওয়ার কাজ করা হয় দ্রুত। ফলে অন্ধ্র বিশ্ববিদ্যালয় দেশের নিউক্লিয়ার ফিজিক্সে অগ্রণী হয়ে ওঠে দ্রুত। ১৯৬৫ সালে স্বামী জ্ঞানানন্দ অবসর নেওয়ার আগে ওই এক দশকে তৈরি হয়ে গিয়েছিল এক ঐতিহ্য।
এভাবেই অধ্যাত্মবাদ চর্চার পর বিজ্ঞান নিয়ে গবেষণায় এহেন সাফল্য জ্ঞানানন্দকে ভারতীয় বিজ্ঞানচর্চার অন্যতম পথিকৃত করে তুলেছিল। মনে রাখতে হবে সেটা একটা এমন সময় যখন এদেশের বিজ্ঞান গবেষণা এমন সব ব্যক্তির ওপর নির্ভরশীল ছিল, যাঁরা বিদেশে প্রশিক্ষণ গ্রহণ করে দেশে ফিরে এসে একেবারে গোড়া থেকে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলেছিলেন।

জ্ঞানানন্দ ছিলেন তেমনই একজন। পাশাপাশি ভারতে নিউক্লিয়ার ফিজিক্স সংক্রান্ত গবেষণার শুরুর দিনগুলো নেহাতই সরকারি পরিকল্পনায় গড়ে ওঠেনি। বরং বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর আঙিনাতেও তা বিকশিত হয়েছিল। এর নেপথ্যেও ছিলেন জ্ঞানানন্দ। তিনি প্রমাণ করে দিয়েছিলেন, বৈজ্ঞানিক অনুসন্ধান ও অধ্যাত্মিক চর্চা পরস্পরের থেকে পৃথক, এই ধারণা ঠিক নয়। এভাবেই এদেশের বিজ্ঞানচর্চার অন্যতম অগ্রণী মানুষটি আজও স্মরণীয় হয়ে রয়েছেন। অন্ধ্র বিশ্ববিদ্যালয়ের শতবর্ষে, মৃত্যুর ৫৭ বছর পরও তাই তিনি বারবারই ফিরে আসছেন আলোচনায়।

Sangbad Pratidin News App

খবরের টাটকা আপডেট পেতে ডাউনলোড করুন সংবাদ প্রতিদিন অ্যাপ

হাইলাইটস

Highlights Heading
Advertisement
toolbarHome ই পেপার toolbarup মহানগর toolbarvideo শোনো toolbarshorts রোববার