ক্ষমতা এমন এক আশ্চর্য বিষয় যা মানুষের চরিত্রের পরিবর্তন ঘটিয়ে ফেলতে পারে। এই পরিবর্তন এত সন্তর্পণে ঘটে যে কীভাবে নৈতিকতার ক্ষয় শুরু হয় তা টের পাওয়া যায় না। চারিত্রিক রূপান্তর ঘটে যাওয়ার পর আর আলাদা করে কিছু মনেও হয় না, কারণ এই নতুন মন নিয়ে ক্ষমতায় থাকা মানুষ নানান দমননীতি ব্যবহার করবে সেটাই তার কাছে স্বাভাবিক। এই দমনের আগ্রাসী লোভ কাউকে ছাড়ে না। লিঙ্গ, জাতি, ধর্ম, অর্থনৈতিক, যৌনতা নির্বিশেষে যে সিঁড়ির ওপর দিকে থাকবে সে নিচুতে থাকা মানুষকে আটকাবে, আটকাবেই! নেটফ্লিক্সে মুক্তি পাওয়া অনুভূতি কাশ্যপ পরিচালিত ছবি ‘অ্যাকিউজড’ (Accused Review) তেমনই এক ক্ষমতায়নের বিস্তারের গল্প বলতে চেয়েছে দুই নারীর প্রেমের সম্পর্কের মধ্যে দিয়ে ।
'অ্যাকিউজড' ছবির দৃশ্য, ছবি: সোশাল মিডিয়া।
গীতিকা (কঙ্কনা সেনশর্মা) এবং মীরা (প্রতিভা রত্না)। গীতিকা একজন হাই প্রোফাইল সার্জন, অন্যদিকে মীরা একজন সদ্য পাশ করা চাইল্ড স্পেশালিস্ট। সে থাকে গীতিকার বিলাসবহুল বাড়িতে। বাগদানের পর তারা লিভ ইন করে, কিন্তু যেহেতু তাদের সম্পর্কের ডায়নামিক্স-এ, আর্থিকভাবে এবং কর্মক্ষেত্রে গীতিকা অনেক বেশি সফল তার সূক্ষ ছায়া পড়ে তাদের সম্পর্কে। সমস্যা ঘনীভূত হয় যখন গীতিকার বিরুদ্ধে একাধিক যৌন হেনস্তার অভিযোগ আসে। এবং অত্যন্ত উচ্চাকাঙ্খী গীতিকার আপসহীন আচরণ এবং আকাশছোঁয়া সাফল্য অনেকেরই চক্ষুশূল, বিশেষ করে তার পুরুষ সহকর্মীরা যে ভালো চোখে দেখে এমন নয়। অন্যদিকে মীরার প্রেমে পড়ে যাওয়া জুনিয়র পুরুষ ডাক্তারটিও এই সময়ের সুযোগ নিয়ে মীরা এবং গীতিকার মধ্যে দূরত্ব করার চেষ্টা যে করবে না, সেই গ্যারান্টি সেই। পরিচালক অনুভূতি একসঙ্গে অনেকগুলো স্তর ধরতে চেয়েছেন। একদিকে গীতিকা এবং মীরার সম্পর্কের মধ্যেকার ক্ষমতার রাজনীতি, অন্যদিকে প্রান্তিক যৌনতার প্রতিনিধি উচ্চাকাঙ্খী গীতিকার পুরুষশাসিত জগতের সঙ্গে লড়াই। গীতিকা কি সত্যি ক্ষমতার অপব্যবহার করেছে? এই প্রশ্নের উত্তর আসলে খুব সাদা কালো হয় না। অভিজ্ঞতাবলে ক্ষমতার অপব্যবহার কখনও কখনও এত সূক্ষ হয় যে উলটোদিকের মানুষটা অর্থাৎ ভিক্টিমের সেটা বোঝার আগেই অনেক ক্ষতি হয়ে যায়। এই সূক্ষতা এই ছবিতে আছে আবার নেইও। কারণ ছবির শেষে একটা মীমাংসার দিকে গীতিকাকে ঠেলে দেন পরিচালক। বাস্তবে সেটা হয় না। ক্ষমতায়নের লোভ এমন এক ভাইরাস যা কোনও না কোনও আকারে থেকেই যায়। পুরোপুরি ধ্বংস হয় না কখনই।
'অ্যাকিউজড' ছবির দৃশ্য, ছবি: সোশাল মিডিয়া।
অভিজ্ঞতাবলে ক্ষমতার অপব্যবহার কখনও কখনও এত সূক্ষ হয় যে উলটোদিকের মানুষটা অর্থাৎ ভিক্টিমের সেটা বোঝার আগেই অনেক ক্ষতি হয়ে যায়। এই সূক্ষতা এই ছবিতে আছে আবার নেইও। কারণ ছবির শেষে একটা মীমাংসার দিকে গীতিকাকে ঠেলে দেন পরিচালক।
গীতিকা যৌন হেনস্তা করেছে কিনা সেটার উত্তর পাওয়ার দিকেই যেন বেশি জোর দেওয়া হল। আর সেই উত্তর পাওয়াও গেল খুব সহজে। বাকি যা কিছু ব্যক্তিগত তাও প্রায় একরকম স্বীকার করে নিল গীতিকা। ছবির সমস্যা এখানেই। অতি সরলীকরণ! জীবনে সব উত্তর এত সহজে পাওয়া যায় না। সেই জটিলতা ছবিতে এবং কলাকুশলীদের অভিনয়ে থাকলে ভালো হত। কঙ্কনা সেনশর্মা গীতিকার চরিত্রে বিশ্বাসযোগ্য কিন্তু এটা তার সেরা পারফরম্যান্সের কাছাকাছি নয় কিছুতেই। আমার পরিচিত একজন ছবি দেখে বলল, সেটা এখানে লিখতে চাই, ‘মনে হয় এত সরল চিত্রনাট্যে কঙ্কনা নিজেও মনে মনে সহমত হননি।' এই বিষয়ে সুধীর মিশ্র পরিচালিত ছবি ‘ইনকার’- এর কথা মনে পড়ছে। কোম্পানির সিইও- র বিরুদ্ধে যৌন হেনস্তার অভিযোগ এনে তার অধস্তন কর্মচারী এবং প্রেমিকা। দুজনেরই অ্যালিবাই রয়েছে, দুজনেরই সুযোগ রয়েছে অন্যের কেরিয়ারে ক্ষতি করার। কে সত্যি বলছে, কার পক্ষ নেব আমরা? দুজনের কথাই ঠিক মনে হয় একেক সময়। বাস্তব আসলে এটাই। কিন্তু দুজনের অবস্থান এক মনে হলেও, মনে রাখতে হবে পুরুষটির ক্ষমতা বেশি এই কাজের জায়গায়। আর তাই প্রমাণ না থাকায় বিষয়টি অমিমাংসিত হলেও যেন অলিখিত ভাবে সত্যিটা আবছা হয়ে ধরা দেয়। ‘ইনকার’ আজকের দিনে তৈরি হলে হয়তো আরও অন্যভাবে তৈরি হত। ঋতুপর্ণ ঘোষের 'দোসর' ছবিতে সংশয় নিয়েই বিবাহিত নারী তার স্বামীকে মেনে নেয়। আসলে বাস্তবে সংশয়টা থেকেই যায়। ‘অ্যাকিউজড’ ছবিতে সেই সংশয়টাই কেড়ে নিয়েছেন পরিচালক আর সেটাই ছবিটাকে অনেক পিছিয়ে দেয়।
