shono
Advertisement
Boong Fim Review

বন্ধুত্বের মোড়কে শুধু জাতি নয়, জেন্ডার অন্তর্ভুক্তির কথাও বলে মণিপুরি ছবি 'বুং', পড়ুন রিভিউ

বাফটা পেয়ে বিশ্বজয় করেছিল 'বুং', কেমন হল সেই মণিপুরি ছবি?
Published By: Sandipta BhanjaPosted: 07:08 PM Mar 20, 2026Updated: 08:06 PM Mar 20, 2026

ছেলেবেলার মন তার নিজের বিশ্বাসের উপর ভর করে অনেক দূর চলে যেতে পারে ম্যাজিক ডানার পাখা মেলে। আমরা যত বড় হই সেই ডানা ছোট হতে হতে একেবারে মিলিয়ে যায়। নিরাপত্তাহীনতা, ভয় জন্ম নেয় আর এই ভয় থেকে রাগ, হিংসা, স্বার্থপরতা জন্মায়। আমরা চারপাশে গণ্ডি কেটে নিজেদের বৃত্ত ক্রমশ ক্ষুদ্র থেকে ক্ষুদ্রতর করে ফেলি। সীমানা এঁকে অন্যদের থেকে নিজেদের আলাদা করে ফেলি। গোটা বিশ্বজুড়ে যে যেভাবে পারছে অন্যদের হটিয়ে দিয়ে নিজেদের সীমারেখা বড় করার খেলায় মেতেছে। নিজের ডানা নেই তাই অন্যদের ডানা কেটে ফেলছে। কিন্তু উড়তে পারছে কই! কিন্তু 'বুং' আর তার বন্ধু 'রাজু' পরস্পরকে জড়িয়ে ডানা মেলতে পারে।

Advertisement

গল্প বলতে গিয়ে আমাদের চারপাশে নিজেদের, রাষ্ট্রের তৈরি করা সীমানা আলতো করে খসিয়ে দেয়। আমরা দেখি বুং-এর গ্রামের মোড়ল, রাজু এবং তার পরিবারকে বহিরাগত মনে করলেও রাজুর বাবা সস্নেহে রাজুকে মনে করায় তারা এখানে বংশ পরম্পরায় ব্যবসা করছে, তারা আর মাড়োয়ারি নয়, তারা মণিপুরি। রাজুও মনেপ্রাণে তাই বিশ্বাস করে, না হোক সে বুং-এর মতো ফর্সা, বা নাই থাক তার ছোট চোখ আর চ্যাপ্টা নাক। তার হৃদয়ে যে অকৃত্রিম ভালোবাসা আছে সেটার মাপজোক ইঞ্চি বা সেন্টিমিটারে করা যাবে না।

সম্প্রতি বাফটায় সেরা ছোটদের ছবি হিসাবে পুরস্কৃত, লক্ষ্মীপ্রিয়া দেবী পরিচালিত মণিপুরি ছবি ‘বুং’ কলকাতায় মুক্তি পেয়েছে। এই ছবি দেখতে গিয়ে একটা অদ্ভুত আরাম হয়, ছোটবেলার মনটা খুব দূর থেকে দেখার একটা সুযোগ হয়, আবছা হলেও, ঝাপসা হলেও। পশ্চিমবঙ্গ থেকে মণিপুর কতদূর? ‘বুং’-এর মনের আতশ কাচ দিয়ে দেখলে কোনও দূরত্বই এমন নয় যে পার করা যায় না। মণিপুরি ভাষা, সংস্কৃতি, ধর্মীয় আচার সম্পর্কে কিছুই জানি না। সেই সমস্ত অজ্ঞতা একপাশে রেখে দেখতে দেখতে মনে হল, কই খুব আলাদা নয় তো। বুং-এর মা মন্দাকিনী এবং বাকিরা বৈষ্ণবদের মতো করে কপালে তিলক কাটে। জানা যায়, মণিপুরি বৈষ্ণববাদ মূলত রাধা ও কৃষ্ণের প্রতি নিবিড় আবেগপূর্ণ ভক্তি-ভিত্তিক, যা চৈতন্য মহাপ্রভু কর্তৃক প্রচারিত বাংলা গৌড়ীয় বৈষ্ণবধর্মের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে মিলে যায়। আমাদের দোল উৎসব আর ওদের হোলি খুব আলাদা নয়। তবে যে আমরা ছোট চোখ আর চ্যাপ্টা নাক দেখলেই 'চিঙ্কি-মোমো' বহিরাগত বলে দূর দূর করি! এই তো গত বছর ৯ ডিসেম্বর দেরাদুনে, ত্রিপুরা থেকে পড়তে আসা ২৪ বছর বয়সি অ্যাঞ্জেল চাকমাকে খুন করা হল। কেন? কারণ সে তার ভাই মাইকেল চাকমাকে জাতিবিদ্বেষ থেকে বাঁচাতে গিয়েছিল।

'বুং' ছবির দৃশ্য, ছবি: সোশাল মিডিয়া।

ছবিতে ব্রজেন্দ্র সিং বা বুং বছর ৬ বা সাতের পুঁচকে ছেলে। থাকে মায়ের সঙ্গে। বাবা সেই যে বছর কয়েক আগে মোড়ে (ভারত-মায়ানমার সীমান্তের শহর) গিয়েছে কাঠের ব্যবসা করতে আর ফেরেনি। তার একমাত্র বন্ধু রাজু আগরওয়াল। দু'জনে যাকে বলে হরিহর আত্মা। দুষ্টুমিতে, ভালোবাসায় সর্বক্ষণের একে অপরের সঙ্গী। রেগে গেলে বুং 'আউটসাইডার' বলে রাজুকে, রাজুও বুং-কে ‘মোমো’ বলে। কিন্তু বড়দের মতো ওরা সেসব ধরে বসে থাকে না। বুং তার বন্ধু রাজুর সঙ্গে সব্বার চোখে ধুলো দিয়ে কী করে মোড়ে চলে যায় বাবাকে খুঁজতে- এই ছবি সেই রূপকথার গল্প বলে। আর সেই গল্প বলতে গিয়ে আমাদের চারপাশে নিজেদের, রাষ্ট্রের তৈরি করা সীমানা আলতো করে খসিয়ে দেয়। আমরা দেখি বুং-এর গ্রামের মোড়ল, রাজু এবং তার পরিবারকে বহিরাগত মনে করলেও রাজুর বাবা সস্নেহে রাজুকে মনে করায় তারা এখানে বংশ পরম্পরায় ব্যবসা করছে, তারা আর মাড়োয়ারি নয়, তারা মণিপুরি। রাজুও মনেপ্রাণে তাই বিশ্বাস করে, না হোক সে বুং-এর মতো ফর্সা, বা নাই থাক তার ছোট চোখ আর চ্যাপ্টা নাক। তার হৃদয়ে যে অকৃত্রিম ভালোবাসা আছে সেটার মাপজোক ইঞ্চি বা সেন্টিমিটারে করা যাবে না। বুং-এর সব দুষ্টুমি, প্ল্যান-পয়জারে সে দুরুদুরু বুকে হলেও পাশে থাকে। মোড়েতে গিয়ে বুং রাজুকে বলে তার মাড়োয়ারি বুদ্ধি কাজে লাগিয়ে ইমা হোটেলের জেঠিমাকে বশ করতে। এই নিয়ে দুজনের সে কী হাসি! দর্শকাসনে বসে আমরাও হাসি। লক্ষ্মীপ্রিয়া দেবী পরিচালিত এই ছবি এমন অনেক সহজ মুহূর্ত তৈরি করে মনের উপর অনেকদিনের জমে থাকা ধুলোময়লা আলতো ফুঁয়ে উড়িয়ে দেয়। যেসব কারণে আমরা হাসতে ভুলে গিয়েছি, যে সব দুষ্টুমি আর নির্ভেজাল মিথ্যের বুড়বুড়ি ফেনা ওড়াতে ভুলে গিয়েছি, যে সব স্কুল পালানো আর মনে পড়ে না, যে সব শৈশবের আহ্লাদ আর করে উঠতে পারি না, যে সব স্নেহমাখা অমলিন বন্ধুদের আমরা হারিয়ে ফেলেছি সেইসব স্মৃতি হাতড়ে আনে।

'বুং' ছবির দৃশ্য, ছবি: সোশাল মিডিয়া।

কোনও রকম জটিলতা, নীতিকথা ছাড়া, উপদেশমূলক না হয়েও এই ছবি বলে সহমর্মিতা আর অন্তর্ভুক্তির কথা। আমরা দেখি মোড়েতে এক টুকরো ভারত। সেখানে ব্যবসা করছে দক্ষিণ ভারতীয়রা, সীমান্তে পাহারা দিচ্ছে ভারতের অন্য প্রান্ত থেকে আসা হিন্দিভাষী যুবক। মণিপুরের প্রান্তিক শহরে লুঙ্গি ডান্স-এর দু কলি বেজে উঠলে, দুই বন্ধুও নেচে ওঠে। কেবল জাতি নয়, আছে জেন্ডার অন্তর্ভুক্তির কথাও।

‘বুং’ ছোটদের ছবি হলেও, আসলে সব ভালো ছোটদের ছবিই বড়দেরও। বড় হয়ে যেসব মূল্যবোধ, যে আত্মীয়তা আমরা ভুলে যাই, ছোটদের থেকে আবার শিখতে হয়। কোনও রকম জটিলতা, নীতিকথা ছাড়া, উপদেশমূলক না হয়েও এই ছবি বলে সহমর্মিতা আর অন্তর্ভুক্তির কথা। আমরা দেখি মোড়েতে এক টুকরো ভারত। সেখানে ব্যবসা করছে দক্ষিণ ভারতীয়রা, সীমান্তে পাহারা দিচ্ছে ভারতের অন্য প্রান্ত থেকে আসা হিন্দিভাষী যুবক। মণিপুরের প্রান্তিক শহরে লুঙ্গি ডান্স-এর দু কলি বেজে উঠলে, দুই বন্ধুও নেচে ওঠে। কেবল জাতি নয়, আছে জেন্ডার অন্তর্ভুক্তির কথাও। স্কুল থেকে পালাবে বলে ওরা স্কুলের নাম কেটে হোমো বয়েজ স্কুল লিখে দিয়েছিল। মানে না জানলেও, হোমো কথাটা যে খারাপ এটা বুং জানত, কারণ বড়রা তাই শিখিয়েছে। যদিও বুং-এর মা সেটা মনে করে না। বাবার রেখে যাওয়া ‘লাইক এ ভার্জিন’ গানের এক কলি লেখা যে ম্যাডোনার পোস্টার আঁকড়ে বুং তার সন্ধানে নেমেছিল— সে জানতও না ম্যাডোনা আট নয়ের দশকের বিখ্যাত পপ গে আইকন। মোড়েতে বাবাকে খুঁজতে গিয়ে ট্রান্সউওমেন জয়-এর সঙ্গে দেখা হয় তাদের। বুং-এর বাবার নামও জয়। প্রথমে নারীরূপী এই পুরুষকে দেখে কুঁকড়ে যায় বুং। কারণ বড়রা তাকে শিখিয়েছে যে মেয়েরা মেয়েদের মতো (সিসজেন্ডার ফিমেল) আর ছেলেরা ছেলেদের মতো (সিসজেন্ডার মেল) না হলেই সেটা খারাপ। কিন্তু সে আর তার বন্ধু রাজু মিলে ঠিক জয় আন্টিকে রাজি করিয়ে নেয় ‘লাইক আ ভার্জিন’ গাওয়ার জন্য। বুং জানত তার বাবা ম্যাডোনার ফ্যান, গান শুনতে আসবেই। আর ‘জয় আন্টি’ মঞ্চে উঠে যখন এই গান ধরল কত কত মানুষ এসে জড়ো হল সেই গানের টানে। সেই জমায়েত, উন্মাদনা মুছে দিল লিঙ্গভেদের রাজনীতি। আন্তর্জাতিক সীমারেখা কত অনায়াসে মুছে ফেলে সংগীত তা বারংবার প্রমাণ হয়েছে। ‘জয় আন্টি’ বুং-এর বাবা না হোক আসলে যে খুব সুইট এবং ভালো মানুষ সেটা ওরা দুজনেই বুঝেছিল। বড়রা যা বলে সবসময় ঠিক হয় না আসলে। বুং তাই আমাদের মতো বড়দের আরেকবার শৈশবের জানলা দিয়ে পৃথিবীটাকে দেখতে বলে। বলা যায় না, সেই অদৃশ্য ডানার দেখা পেলেও পেতে পারি। আর ম্যাডোনার গান ‘লাইক এ ভার্জিন’-এর মতোই একটা নতুন শুরু হতে পারে!

Sangbad Pratidin News App

খবরের টাটকা আপডেট পেতে ডাউনলোড করুন সংবাদ প্রতিদিন অ্যাপ

হাইলাইটস

Highlights Heading
Advertisement