shono
Advertisement
Winkle Twinkle film review

ঋত্বিক-পরমব্রতর তর্ক-বিতর্কে বিস্ফোরক ক্লাইম্যাক্সের বীজ! কেমন হল সৃজিতের 'উইঙ্কল টুইঙ্কল'?

কেমন হল সৃজিত মুখোপাধ্যায় পরিচালিত লিরিকাল রাজনৈতিক ছবি 'উইঙ্কল টুইঙ্কল'? পড়ুন রিভিউ।
Published By: Sandipta BhanjaPosted: 04:04 PM Sep 04, 2026Updated: 04:04 PM Sep 04, 2026

পরিচালক সৃজিত মুখোপাধ্যায় এবং নাট্যকার ব্রাত্য বসু- এই দুই প্রতিভা ও প্রবণতার মধুর মিশ্রণে তৈরি হয়েছে এই বিরল বাংলা ছবি। এমন লিরিক‌্যাল রাজনৈতিক ছবি আগে দেখিনি। আগামী বহুদিন বাঙালি এমন সিনেমা পাবে না, এই কথাও নির্দ্বিধায় বলতে পারি। কুম্ভকর্ণ থেকে রিপ ভ্যান উইঙ্কল, অপরিমেয় নিদ্রা থেকে বাস্তবের সংকট ও সমরে ফিরে আসার গল্পের অভাব নেই পৃথিবীতে। বহুবছর আগে পড়েছিলাম মার্কিন লেখক আরভিং ওয়াশিংটনের রিপ ভ্যান উইঙ্কল-এর গল্প। এবং রিপ ভ্যানের বিশ বছরের ঘুমের সূত্র ধরে পৌঁছে ছিলাম গ্রিক সাহিত্যে যিশুর জন্মের ৬০০ বছর আগে এপিমেনিডসের সাতান্ন বছর ঘুমের গল্পে। এই ধরনের গল্পে থাকে একই বাস্তবের দুটি দিক- স্মৃতির গরমিলের মজা এবং করুণ দিক। বহু বছরের জন্য বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়া প্রেমিক-প্রেমিকা যখন আবার আসে সহবাসে, কী করুণ ও জটিল সমস্যা তৈরি হয় তাদের বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়া স্মৃতির গরমিলের, সেই বিষয়ে মিলান কুন্দেরা লিখেছেন এক অসামান্য উপন্যাস। স্মৃতির গরমিল এবং তারই ট্র্যাজেডি, অন্তত আমার কাছে, সৃজিতের সদ্য মুক্তিপ্রাপ্ত ‘উইঙ্কল টুইঙ্কল’- এর প্রধান বিষয়। এবং সেই গরমিলের মধ্যে যে অপূর্ব অদৃশ্য অপার্থিব মিলের বুনন ভাবতে পেরেছে সৃজিত এবং তৈরি করেছে শীলিত সূক্ষ্মতায়, সেই বুনন গানের, সাঙ্গীতিক আবহের। এই ছবি দেখতে দেখতে পাশাপাশি মনে পড়ছিল দেবশঙ্কর হালদার এবং রজতাভ দত্ত অভিনীত ব্রাত্যর অসামান্য রাজনৈতিক নাটক ‘উইঙ্কল টুইঙ্কল’। সেখানে কিন্তু সিনেমার এই মধুর করুণ গীতিময়তা ছিল না। তবে দেবশঙ্কর. রজতাভ দু'জনেই আছেন সিনেমাতেও, নাট্যস্মৃতির কৌতুকী প্রতিধ্বনি হয়ে। বলছি না, কোন ভূমিকায়! 

Advertisement

 ‘উইঙ্কল টুইঙ্কল’ ছবিতে ঋত্বিক-সোহিনী। ছবি: সোশাল মিডিয়া

পঁচিশ বছরে তুমুল পরিবর্তন ঘটেছে কলকাতার বাতাবরণে, যাপনে , সংস্কৃতিতে, বাংলার রাজনীতিতে, এবং সমস্ত পৃথিবীজুড়ে ক্ষমতার বিন্যাসে ও বিনাশে। যাদের চোখের সামনে ঘটেছে এই পরিবর্তন তাদের স্মৃতিতে কিছু আকস্মিক নয়, সবই যেন ঘটেছে অনিবার্য পারম্পর্যে। কিন্তু এই আমূল পরিবর্তনের মধ্যে দিশাহারা সব্যসাচী চরিত্রে ঋত্বিক সম্পূর্ণ আউটসাইডার। এবং ব্রিলিয়ান্টলি সো !

ব্রাত্যর গল্পের মধ্যমণি সব্যসাচী সেন বঙ্গের এক তোলপাড় রাজনৈতিক সময়ে বামপন্থী আদর্শে বিশ্বাসী অবিচ্যুত কর্মী। এই চ্যালেঞ্জিং চরিত্রে ঋত্বিক চক্রবর্তী। রাইট চয়েস বেবি, এর থেকে ভালো কিছু হতে পারতো না। ঋত্বিকের আমি মহাভক্ত ওর উভয় স্তরতার জন্য। এক স্তরে ওর আপাত হালকামি। উদাসীনতা। কেমন যেন একটা তুড়ি মেরে উড়িয়ে দেওয়ার ভাব। অন্য স্তরে ওর অতল গভীরতা। একমাত্র ওই পারে এই ‘চোরাবালি’ স্টাইল। ঋত্বিক মুহূর্তের জন্য অভিনয় করেনি। ঋত্বিক প্রথম থেকে শেষ পর্যন্ত সব্যসাচী সেন, যেমন তাকে আমাদের মন চায়। সব্যসাচী পুলিশের হেফাজত থেকে পালায়। তারপর পুলিশ ভোরের কুয়াশায় তাকে গুলি করে কিন্তু তার বডি পাওয়া যায় না। তারপর সব্যসাচী ফিরে আসে। তার ধারণা সে ঘুমিয়ে পড়েছিল কিছুক্ষণের জন্যে। কিন্তু মাঝখানে কেটে গেছে পঁচিশটা বছর। এবং সেই পঁচিশ বছরে তুমুল পরিবর্তন ঘটেছে কলকাতার বাতাবরণে, যাপনে , সংস্কৃতিতে, বাংলার রাজনীতিতে, এবং সমস্ত পৃথিবীজুড়ে ক্ষমতার বিন্যাসে ও বিনাশে। যাদের চোখের সামনে ঘটেছে এই পরিবর্তন তাদের স্মৃতিতে কিছু আকস্মিক নয়, সবই যেন ঘটেছে অনিবার্য পারম্পর্যে। কিন্তু এই আমূল পরিবর্তনের মধ্যে দিশাহারা সব্যসাচী চরিত্রে ঋত্বিক সম্পূর্ণ আউটসাইডার। এবং ব্রিলিয়ান্টলি সো ! এটাই নির্ভেজাল ঋত্বিক। সে রিলেট করতে পারে একমাত্র তার স্ত্রী রাজলক্ষ্মীর সঙ্গে, সে-ই শুধু বেঁচে আছে তার অতীতের মধ্যে, নস্টালজিয়ায়, পুরনো প্রত্যয়ে।

স্মৃতির গরমিল এবং তারই ট্র্যাজেডি, অন্তত আমার কাছে, সৃজিতের সদ্য মুক্তিপ্রাপ্ত ‘উইঙ্কল টুইঙ্কল’- এর প্রধান বিষয়।

রাজলক্ষ্মীর চরিত্রে অভিনয় করেছেন দু’জন, অনসূয়া মজুমদার এবং সোহিনী সরকার। কিন্তু দুজনকে আলাদা করা যায় না। সৃজিত নিয়ে এসেছে তরুণী ও মধ্যবয়সি রাজলক্ষ্মীকে মিশিয়ে দেবার এক আশ্চর্য রোমান্টিক তারল্য, লিকুইডিটি। তরুণ সোহিনী তার কণ্ঠে ধারণ করে রাপূর্ণার গাওয়া এই সময়ের কিছু অবিস্মরণীয় প্রেম ও আদরের গান বারবার গলে যায় মধ্যবয়সি রাজলক্ষ্মীর অঙ্গে। আমরা একই সঙ্গে বেদনা ও আনন্দের বুঝতে পারি যে তরুণী তরুণ সব্যসাচীর রাজনৈতিক বান্ধবী ছিল সেই একই মেয়ে তার স্ত্রী এবং তার দুই সন্তান, ইন্দ্র আর ইন্দ্রাণীর মা। সমস্যা হল এদের সবার বয়েস বেড়েছে। কিন্তু সব্যসাচী এখনো তরুণ। এবং শরীরের দিক থেকে প্রায় তারই মতো তরুণ সব্যসাচীকে কিছুতেই বাবার জায়গায় বসাতে পারে না। এমনকী, সে বাবাকে নাম ধরে ডাকে। এক কথায়, সব্যসাচীর ছেলে ইন্দ্রর চরিত্রে পরমব্রত অসাধারণ। সে তৃণমূল পার্টির সদস্য। উদ্ধত। এবং বামপন্থী বাবার বিদগ্ধ বিপ্রতীপ। ২০০২ সালের রাজনৈতিক প্রেক্ষিতে পরমব্রতর সততা, ঔদ্ধত্য এবং বোধবুদ্ধি খুবই বিশ্বাস্য। কেন না তখনও তৃণমূল ক্ষমতায় আসেনি। শুরু হয়নি তার লোভ ও লুপ্তির পথ। তার অশিক্ষার বিস্ফোরণ। এই ছবির একেবারে শেষের দিকে সৃজিতের স্যাটায়ার কয়েক সেকেন্ড স্থির হয় ‘সত্যজিৎ রায় ধরণী’র গায়ে। আমরা বুঝতে পারি সৃজিত যা বোঝাতে চাইল।

 ‘উইঙ্কল টুইঙ্কল’ ছবিতে ঋত্বিক-পরমব্রত । ছবি: সোশাল মিডিয়া

আসি ঋত্বিক আর পরমব্রত প্রসঙ্গে, কেন না ওদের দু'জনের তর্ক-বিতর্কই তো গড়ে তোলে এই ছবির কেন্দ্রীয় পলেমিক্‌, তর্ক-বিতর্কের দীপন ও আকর্ষণ এবং বহন করে চরম পরিণতি, বিস্ফোরক ক্লাইম্যাক্সের বীজ।

আরও একবার আসি ঋত্বিক আর পরমব্রত প্রসঙ্গে, কেন না ওদের দু'জনের তর্ক-বিতর্কই তো গড়ে তোলে এই ছবির কেন্দ্রীয় পলেমিক্‌, তর্ক-বিতর্কের দীপন ও আকর্ষণ এবং বহন করে চরম পরিণতি, বিস্ফোরক ক্লাইম্যাক্সের বীজ। সেই সব ঢাকনার তলায় রাখলাম এবং তার পরিবর্তে এই প্রতিশ্রুতি, মিস করবেন না এই বোধবুদ্ধি দীপিত সিনেমা যা তৈরি করবে ঘরে ঘরে বিতর্কসভা। আমার নিজের তো মনে হয়, ছবিটা সময়ের সঙ্গে আমাদের সম্পর্কের ছবি। একবার সেই সম্পর্ক ছিন্ন হলে, আর মেরামত করে ফিরে আসা যায় না। হয়ে যেতেই হয় মরা সময়ের মরা মানুষ। অসামান্য দক্ষতায় সৃজিত ফুটিয়ে তুলতে পেরেছে এই বিষয়টাকে, সম্ভবত ভারতীয় সিনেমায় এই প্রথম। আর একটা কথা, ছবিটার কাছে ফিরে যেতে ইচ্ছে করছে রাপূর্ণার গানের মাদক টানের জন্যও।

Sangbad Pratidin News App

খবরের টাটকা আপডেট পেতে ডাউনলোড করুন সংবাদ প্রতিদিন অ্যাপ

হাইলাইটস

Highlights Heading
Advertisement