মায়ামি থেকে ভোরের বিমানে নিউ জার্সিতে পা দেওয়া ইস্তক মনে হচ্ছে, রবিবার মেটলাইফে ব্রাজিল বা নরওয়ে একে অপরের প্রতিপক্ষ নয়। দু’দলেরই যৌথভাবে আসল প্রতিপক্ষ অসহনীয় গরম। তীব্র দাবদাহে নিউ জার্সির পরিস্থিতি এখন এতটাই খারাপ যে, বাইরের কাজকর্ম যতটা সম্ভব এড়িয়ে চলার জন্য সরকারি নির্দেশ জারি হয়েছে। চার বছর আগে মরুদেশের গরমের কথা ভেবে কাতার বিশ্বকাপের সময় বদলে নভেম্বর-ডিসেম্বর হয়েছিল।
শুক্রবার মায়ামিতে আর্জেন্টিনা-কেপ ভার্দের ম্যাচ কভার করার পর রাতে সোজা ফোর্ট লডারডেল বিমানবন্দর। নিউ জার্সির উদ্দেশে যখন ভোর রাতে ইউনাইটেড এয়ারলাইন্সের বিমানে উঠলাম, যাত্রীদের দেশের ২৫০তম স্বাধীনতা দিবসের শুভেচ্ছা জানালেন ক্যাপ্টেন। নিউ ইয়র্ক বিমানবন্দর থেকে প্রিস্টন আসার পথে গাড়িতে একটু মেটলাইফ স্টেডিয়াম ঘুরে আসার পথে যা দেখলাম, তাতে পুরো এলাকা আমেরিকার ২৫০তম স্বাধীনতা দিবস আর বিশ্বকাপ, এই আবহে সাজানো। আমেরিকার পতাকার রঙের পাশাপাশি নজরে পড়ল ব্রাজিলের হলুদ পতাকা।
রবিবার রাতেই মেটলাইফ স্টেডিয়ামে নরওয়ের বিরুদ্ধে নকআউটের দ্বিতীয় যুদ্ধে নামছেন ভিনিসিয়াস জুনিয়ররা। তার আগে নিউ জার্সির যা আবহগত যা পরিস্থিতি, তাপমাত্রা ৪১ ডিগ্রি সেলসিয়াসের কাছাকাছি। আদতে অনুভূত হচ্ছে প্রায় ৪৬ ডিগ্রির মতো। পরিস্থিতির সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার জন্য বিশ্বকাপ শুরুর দশ দিন আগে নিউ জার্সি এসে ঘাঁটি গেড়েছিল ব্রাজিল। ম্যাচের আগে ফুটবলাররা, এই অসহনীয় গরম সহ্য করবেন কীভাবে? এদিন নিউ জার্সির বেসক্যাম্পে প্র্যাকটিসের মাঝেই নেইমারদের দেওয়া হল, ‘আইসভেস্ট।’ ঠিক হয়েছে, নরওয়ে ম্যাচের বিরতিতে ফুটবলারদের এই জ্যাকেট দেওয়া হবে। যেখানে জ্যাকেটের পকেটে থাকবে বরফ।
ব্রাজিলের অনুশীলনে ভিনিসিয়াস। ছবি: সোশাল মিডিয়া।
নরওয়ের তারকা হালান্ড, তিনি কী করবেন? নরওয়েতে গ্রীষ্মকালেও তাপমাত্রা ঘোরাফেরা করে ২০ ডিগ্রির মধ্যে। শীতকালে তো কথাই নেই। হিমাঙ্কের নিচে চলে যায়। এই অবস্থায় আমেরিকা বিশ্বকাপে খেলতে আসা পর্যন্ত হালান্ডদের জন্য প্রতিদিন বিশেষ পরীক্ষার ব্যবস্থা করেছে নরওয়ে শিবির। উদ্দেশ্য একটাই। দেখা শরীরে জলের ভারসাম্য সঠিক রয়েছে কি না। ফলে দু’দলের জন্যই আগামীকাল মেটলাইফ স্টেডিয়ামে ম্যাচটা যে খুব সহজ হতে চলেছে এরকম নয়।
এই পরিস্থিতিতে ব্রাজিল কোচ আন্সেলোত্তি ঠিক করে ফেলেছেন প্রথম দল নির্বাচনের আগে দশবার ভাববেন। কোন কোন ফুটবলার নব্বই মিনিট সমানে তালে দলের জন্য দৌড়তে পারবেন? প্রথম দলে ঢোকার ক্ষেত্রে এটাই যদি হয় মাপকাঠি, তাহলে ধরেই নেওয়া যায় নরওয়ের বিরুদ্ধেও প্রথম একাদশের নেমারের জায়গা পাওয়ার সম্ভাবনা কম। তা সে নেমারের প্রতি আন্সেলোত্তি যতই আবেগপ্রবণ হন না কেন। পরিস্থিতি দেখে মনে হচ্ছে নেমারকে তিনি সেই পরিবর্ত ফুটবলার হিসেবেই আপাতত ভাবছেন।
শুধুই গরম নয়। নরওয়ের বিরুদ্ধে ম্যাচের আগে মাঠের বাইরে এমন এক তথ্য ব্রাজিলকে তাড়া করছে যাতে আন্সেলোত্তির কপালে চিন্তার ভাঁজ পড়তে বাধ্য। আজ পর্যন্ত নরওয়ের বিরুদ্ধে ব্রাজিল কখনও জিততে পারেনি! অবিশ্বাস্য শোনালেও এটাই সত্যি। ব্রাজিল আর নরওয়ে একে অপরের বিরুদ্ধে মাঠে নেমেছে মোট চারবার। যার মধ্যে ২ বার ড্র। বাকি দু’বার ব্রাজিল হেরেছে। তারমধ্যে ’৯৮-এর বিশ্বকাপে গ্রুপ লিগে নরওয়ের কাছে ২-১ গোলে হারের স্মৃতি নিশ্চিতভাবেই এখনও ভুলতে পারেননি ব্রাজিল।
ব্রাজিলের অনুশীলনে নেইমার। ছবি: সোশাল মিডিয়া।
সেলেকাওদের বিরুদ্ধে তেতে ওঠার জন্য ম্যাচের আগে হালান্ডদের এই তথ্যটাই তো যথেষ্ট। অনেকে ভাবছেন, ম্যাচটা বোধহয় হালান্ড ভার্সেস ভিনিসিয়াস দ্বৈরথ হতে চলেছে। কিন্তু সাম্প্রতিক কিছু উদাহরণ টানলে বোঝা যাবে, হালান্ডের লড়াইটা ভিনিসিয়াসের সঙ্গে নয়। গ্যাব্রিয়েল ম্যাগলাইসের সঙ্গে। প্রিমিয়ার লিগে ম্যান সিটি–আর্সেনাল ম্যাচে হালান্ড বনাম গ্যাব্রিয়েলের যে দ্বৈরথ দেখা গিয়েছে, সেটাই ফিরবে ব্রাজিল-নরওয়ে ম্যাচে।
এমনিতে জাপান ম্যাচের পর ব্রাজিলের মনোবল অনেক এভারেস্ট সমান উচ্চতায় রয়েছে। তবে নরওয়ে যেরকম হঠাৎ করে কাউন্টার অ্যাটাকে চলে এসে আক্রমণ শানিয়ে চলে যায়, সেটা নিয়ে ব্রুনো, দানিলোদের বুঝিয়েছেন আন্সেলোত্তি। চোট পেয়ে বিশ্বকাপের বাইরে চলে গিয়েছেন পাকেতা। আবার চোট সারিয়ে প্র্যাকটিসে নামলেও রবিবার নরওয়ে ম্যাচে রাফিনহাকে দলে রাখছেন না কোচ। ঠিক করেছেন, আরেকটু বিশ্রাম দিয়ে কোয়ার্টার ফাইনাল ম্যাচের জন্য তৈরি রাখা। তাই রাফিনহার জায়গায় আগের ম্যাচের মতোই শুরু করবেন রায়ান। তবে পাকেতার জায়গা নেওয়ার জন্য মনে হচ্ছে লড়াই চলছে দানিলো স্যান্টোস আর মার্টিনেলির মধ্যে। এদিন প্র্যাকটিসে অনেকক্ষণ মার্টিনেলিকে নিয়ে পড়ে রইলেন আন্সেলোত্তি। তা দেখে মনে হচ্ছে, জাপানের বিরুদ্ধে অসাধারণ পারফরম্যান্সের জন্য পাকেতার জায়গায় মার্টিনেলির খেলার সম্ভাবনাই বেশি। সঙ্গে বেঞ্চে নেইমার তো রইলেনই।
