কলম্বিয়া ম্যাচের জন্য হার্ডরক স্টেডিয়ামে এসে সবে সাংবাদিক সম্মেলন শুরু করেছেন পর্তুগাল কোচ রবার্তো মার্টিনেজ। শুরুতেই জানালেন, আগে পর্তুগিজ সাংবাদিকদের কথা শুনবেন। তারপর বিশ্বের বাকি মিডিয়া।সেভাবেই কথা শুরু করেছিলেন। কিন্তু হঠাৎ অবাক করে সাউন্ড সিস্টেমে মিউজিক বাজতে শুরু করল। বিশ্বকাপের সাংবাদিক সম্মেলনের মধ্যে মিউজিক! পর্তুগাল কোচের পাশে বসা ফিফার মিডিয়া অফিসারও তখন অবাক! মিউজিকটা বাজাচ্ছে কে? যার জন্য পর্তুগাল-কলম্বিয়ার মতো হাইভোল্টেজ মাচের আগে সাংবাদিক সম্মেলন শুরু করেও বন্ধ করে রাখতে হচ্ছে?
কোচ মার্টিনেজ আর কী করবেন। পর্তুগাল কোচও সাংবাদিক সম্মেলনে চেয়ারে বসে সুরের তালে তালে মাথা-শরীর দোলাতে লাগলেন। সাংবাদিকরা বলছেন, 'আমরা কি বিশ্বকাপের সাংবাদিক সম্মেলনে এসেছি না কোনও ডিস্কোতে। চারিদিকে হাসির রোল। অস্বস্তিতে ফিফা ম্যানেজার। মার্টিনেজ অবশ্য পরিস্থিতিটা বেশ উপভোগই করছিলেন। শরীরে হিল্লোল তোলা সুর বাজলে কতক্ষণ আর চুপ করে বসে থাকা যায়। ফলে কোচের চেয়ারে বসেই বসেই হাত-পা দোলাতে লাগলেন। বেশ কিছুক্ষণ পর মিউজিক থামল। শুরু হল সাংবাদিক সম্মেলন।
প্রথমে ঠিক ছিল, কলম্বিয়া ম্যাচের আগে দু'দলের কোচকে নিয়ে বিকেলের দিকে হার্ডরক স্টেডিয়ামে সাংবাদিক সম্মেলন হবে। আমেরিকায় মোটামুটি এরকম হয়ে আসছে। কারণ, এক শহর থেকে আরেক শহরের দূরত্ব। খেলা হচ্ছে এক শহরে। দলগুলির বেসক্যাম্প আরেক শহরে। এদিন, অবশ্য পর্তুগাল-কলম্বিয়া হাই ভোল্টেজ ম্যাচের আগে সামান্য কিছু পরিবর্তন ঘটল। রোনাল্ডোরা এই মুহূর্তে মায়ামিতে থাকার জন্য স্থানীয় সময় দুপুর ১২টায় প্রেস কনফারেন্স।
অনুশীলনে রোনাল্ডো। ছবি সংগৃহীত।
তারপর বিকেলে নিজেদের ডেরায় প্র্যাকটিস। প্র্যাকটিস বললেই কলম্বিয়ার ম্যাচের প্রস্তুতি সব কিছু পরিকল্পনামাফিক হবে, এরকম কোনও কারণ নেই। আগেরদিনই তো বজ্রপাত-সহ ঝড়ের আগাম বিজ্ঞপ্তিতে প্রাকটিস মাঝপথে থামিয়ে হোটেলে ফিরে যেতে হয়েছে। তাহলে কি আবহাওয়ার কারণে রোনাল্ডোর প্রস্তুতিতে কোনও খামতি রয়েছে। পর্তুগিজ কোচ অবশ্য এসব সম্ভাবনা ফুঁৎকারে উড়িয়ে দিয়ে বলেছেন, "কোনও ঝড়বৃষ্টি আমাদের প্রস্তুতিতে বাধা হতে পারে না।' তবে প্রাকৃতিক ঝড়ের থেকেও পর্তুগাল শিবিরে এই মুহূর্তে বেশি ভয় কলম্বিয়ার রইটব্যাক ডানিয়েল মুনাজকে নিয়ে। এমনিতে ডিফেন্ডার। কিন্তু যেভাবে ঘন ঘন ঝড়ের গতিতে ওভারল্যাপে যাচ্ছেন, তাতে এই বিশ্বকাপেই তাঁর নামের পাশে ২ গোল। গ্রুপের শেষ ম্যাচ হলেও হাইভোল্টেজ বলার একটাই কারণ, ড্র করলেও পরের রউন্ড পর্তুগালের চলে যাবে, এটা নিয়ে কোনও সন্দেহ নেই। তবে সেটা গ্রুপ রানার্স হয়ে। সেক্ষেত্রে প্রতিপক্ষ দল হিসেবে হয়তো শুরুতেই কোনও শক্তিশালী প্রতিপক্ষ পড়ে যাবে। আর এই সম্ভাবনা অতিক্রম করতে চাইলে, শনিবারের কলম্বিয়া ম্যাচটি জোতা ছাড়া আর তো বিকল্প কোনও উপায় নেই পর্তুগালের সামনে।
অঙ্কের খাতায় যে হিসেবটা খুবই সহজ। খেলার মাঠে সেটাই ঠিক উল্টো। গ্রপের প্রথম দুটো ম্যাচই জিতে রেখেছে কলম্বিয়া। যা করে দেখতে পারেননি রেনাল্ডোরা। হার্ডরক স্টেডিয়ামে কলম্বিয়া ম্যাচটাই রোনাল্ডোদের সেই অর্থে বিশ্বকাপের প্রথম অ্যাসিড টেস্ট হতে চলেছে। সাংবাদিক সম্মেলনে বসে মার্টিনেজ বলছিলেন, 'সত্যি বলতে কী, এই ম্যাচটার জন্য আমরা সবচেয়ে বেশি প্রস্তুতি নিয়েছি। বিশ্বকাপের গ্রুপ ঠিক হওয়ার পর থেকেই এই ম্যাচ নিয়ে আমাদের প্রস্তুতি চলেছে। তাতেও কি চিন্তা কমছে? কারণ, স্রেফ ড্র করলেই গ্রুপের শীর্ষস্থান কলম্বিয়ার পকেটে।
কিন্তু পর্তুগাল দলে ওই যে রোনাল্ডো নামক ভদ্রলোক আছেন না। যখনই মনে হয়েছে, আর বোধহয় হল না। ঠিক তখনই সময়ের বিরুদ্ধে ঘুরে গিয়ে ইতিহাস তৈরি করেছেন। কলম্বিয়া মাচে সি আর সেভেনের এই বিধ্বংসী মানসিকতাই এখন তাতিয়ে রেখেছে পর্তুগাল শিবিরকে। আর রোনাল্ডো নিজে কী করছেন। "প্রতিদিন প্র্যাকটিসে মনে হয় প্রয়োজনের তুলনায় আরও একটু বেশি ঘাম ঝরাই। আমার কেরিয়ারের শুরু থেকে কতবার যে আমাকে ফুটবল থেকে নির্বাসনে পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছে, তার ইয়ত্তা নেই। আমার বিরুদ্ধে যত বলবে। তত আমি শক্তিশালী হয়ে ফিরে আসব।'
উজবেকিস্তান ম্যাচের পর পর্তুগিজ ড্রেসিংরুমে রোনাল্ডো এখন শুধুই আর একজন দারুণ পারফর্ম করা ফুটবলার নন। তিনি এখন ড্রেসিংরুমে, সহ ফুটবলারদের কাছে আদর্শ। যাঁর অপরিসীম জেতার খিদে পুরো দলটাকে চাঙ্গা করে রেখেছে। কিন্তু শুধুই তো ড্রেসিংরুমে বোর্ডের আঁকিবুকিতে যুদ্ধ জয় করা সম্ভব নয়। তার জন্য দরকার সঠিক পরিকল্পনা। কোচ মার্টিনেজ এই কলম্বিয়ার মাঝমাঠ ভাঙতে প্রাকটিসে কখনও ৩-৪-৩ পদ্ধতিতে। কখনও আবার ৪-৩-৩ পদ্ধতিতে দল সাজাচ্ছেন। যার অর্থ ব্রুনো ফার্নান্ডেজ এবং জোয়াও ফেলিক্স যেন মিডল থার্ড থেকে অনায়াসে ঠিকানা লেখা বল রোনাল্ডোর পায়ে পৌঁছে দিতে পারে।
