তাঁকে বলা যায় স্প্যানিশ ফুটবলের পুনর্জাগরণের নায়ক। তাঁর হাত ধরেই ২০২৪ ইউরো জিতেছে স্পেন। তাঁর হাত ধরেই ১৬ বছর পর বিশ্বজয়ের স্বপ্নপূরণ। লুইস দে লা ফুয়ন্তে। ভিসেন্তে দেল বস্কির নাম যদি স্প্যানিশ ফুটবলে স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকে, তাহলে তারপরই উচ্চারিত হবে লুইস দে লা ফুয়েন্তের নাম। তাঁদের ফুটবল দর্শন অনেকটা একই ধরনের। যে তিকিতাকাকে অপ্রতিরোধ্য করে তুলেছিলেন দেল বস্কি, সেটাকেই আরও খানিকতা ঘসেমেজে উন্নততর তিকিতাকা-তে পরিণত করেছেন ফুয়েন্তে।
তবে মজার কথা হল দেল বস্কি এবং দে লা ফুয়েন্তে সম্পূর্ণ ভিন্ন মানুষ। দেল বস্কির চেহারায় আবেগের বহিঃপ্রকাশ সেভাবে দেখা যায়নি কোনওকালেই। দল চাপে থাকলেও শান্ত থাকতেন, ভালো থাকলেও। দে লা ফুয়েন্তে অনেক বেশি খোলামেলা। আবেগ লুকিয়ে রাখেন না। দল গোল করলে শিশুদের মতো লাফান। আসলে ৬৫ বছরের ওই ভদ্রলোক স্পেনের তরুণ ফুটবলারদের সঙ্গে মিশে গিয়েছেন।
২০২২ সালে কাতার বিশ্বকাপের শেষ ষোলো থেকে অপ্রত্যাশিতভাবে বিদায়ের পর পদত্যাগ করেন স্পেনের কোচ লুইস এনরিকে। ওই বছর ডিসেম্বরে দায়িত্ব নেন দে লা ফুয়েন্তে। দায়িত্ব নিয়ে দু'বছরের মধ্যে বদলে দেন তিনি স্পেনকে। এনরিকের অধীনে বিরক্তকর হয়ে ওঠা ‘তিকিতাকা’কে তিনি খানিকটা পরিমার্জন করেন। ছোট ছোট পাসে খেলার পাশাপাশি প্রয়োজনে লম্বা পাসে প্রতিপক্ষের ওপর সাঁড়াশি আক্রমণের পথেও হাঁটেন তিনি। একটা সময় যে স্পেন স্রেফ মাটি কামড়ে ফুটবল খেলত, তারা শূন্যে বল তোলা শুরু করল। বল দখল করে রাখা মানে যে শুধু নিজেদের মধ্যে পাস খেলা নয়, পাসের ফুলঝুরিতে প্রতিপক্ষকে ছিন্নভিন্ন করে দেওয়ায়ও, সেটা দেখিয়ে দিলেন ফুয়ন্তে। ফাইনাল থার্ডে একের পর এক ত্রিভুজ তৈরি করা, যে ত্রিভুজের কেন্দ্রে কখনও ওলমো, কখনও ইয়ামাল, কখনও ওয়ারজাবাল। সেই ত্রিভুজের ওয়ান টাচ পাস, গতি এবং পজিশন সেন্স তৈরি করা, রক্ষণে অহেতুক হুড়োহুড়ি নয়, মাথা ঠান্ডা রেখে বল দখলে রেখে বিপক্ষকে বিরক্ত করে, দেওয়া-এই হল তাঁর ফুটবল দর্শন।
স্পেনের এই তরুণ দলটা তাঁকে দারুন সাহায্য করেছে। ইয়ামাল, ওলমো, উইলিয়ামস, রদ্রিরা যেমন বল পায়ে অনবদ্য তেমন পজিশন সেন্সেও। ফুয়ন্তের কোচিংয়ের সবচেয়ে বড় প্লাস পয়েন্ট ফুটবলারদের মধ্যে একে অপরের প্রতি আস্থা তৈরি করা, একে অপরকে বিশ্বাস করে পাস বাড়ানো, দলের মধ্যে রসায়ন তৈরি এবং প্রত্যেক সতীর্থের মধ্যে বন্ধুত্ব তৈরি করা। স্পেনের সাফল্যের অন্যতম কারণ একই ধরনের মানসিকতা এবং ফুটবলারদের মধ্যে কোনও ‘ইগো’ না থাকা। সকলে একই মানসিকতা নিয়ে চলাতেই সাফল্য এসেছে। আসলে কোচিং ক্যারিয়ারে দীর্ঘ সময় তিনি কাটিয়েছেন স্পেনের বয়সভিত্তিক দলে কাজ করে। শুরুতে সেভিয়া ও অ্যাথলেটিক বিলবাওয়ের অ্যাকাডেমিতে কাজ করতেন। এরপর ৫ বছর স্পেন অনূর্ধ্ব-১৯ দলের দায়িত্বে ছিলেন। সেখান থেকে পদোন্নতি পেয়ে ৪ বছর ছিলেন স্পেন অনূর্ধ্ব-২১ দলের দায়িত্বে। অনূর্ধ্ব-২৩ দলকে এক বছর কোচিং করানোর পরই জাতীয় দলের দায়িত্ব পান তিনি। তাই তারুণ্যে বড় বেশি ভরসা করেন তিনি। আর তরুণ ফুটবলাররা হতাশ করেন না তাঁকে।
৪ বছর পর আজ স্পেন সেরার সেরা। ফাইনালে (FIFA World Cup 2026 Final) যেভাবে আর্জেন্টিনাকে হারাল স্পেন, সেটা বোধ হয় সাম্প্রতিক ইতিহাসের সবচেয়ে একপেশে খেলা। দিবু মার্টিনেজ না থাকলে এদিন আর্জেন্টিনার কপালে আরও লজ্জা লেখা ছিল। শুধু ফাইনাল কেন, গোটা ফাইনালেই কোনও সময় মনে হয়নি এই স্পেন হারতে পারে। গোটা টুর্নামেন্টে মোটে একটি গোল হজম। টানা ৩৪ ম্যাচে অপরাজিত এই স্পেন। যা সর্বকালের রেকর্ড। আরও মজার একটা রেকর্ড এদিন গড়েছেন ফুয়ন্তে। এই প্রথম কেশহীন কোচ হিসাবে বিশ্বকাপ জিতলেন তিনি।
