বিশ্বকাপ ফাইনাল। আর্জেন্টিনা বনাম স্পেন। ১৯ জুলাই, ২০২৬। নীল-সাদা জার্সিতে তৈরি লিওনেল স্কালোনির ছাত্ররা। অন্যদিকে লাল জার্সিতে তৈরি ইয়ামাল-পেদ্রিরা। সঙ্গে বিশ্বকাপের সর্বকালের 'সেরা' ফুটবলার। একাধিকবার বিশ্বজয়ী। ৩৯ বছর বয়সি ফুটবলার শেষবার বিশ্বকাপ জিততে মাঠে নামছেন নিজের মাতৃভূমির বিরুদ্ধে। সেই স্প্যানিশ ফুটবলারের নাম- লিওনেল আন্দ্রেস মেসি। হ্যাঁ, স্পেনের জার্সি পরে পুরো আন্তর্জাতিক ফুটবল খেলেছেন। জিতেছেন অসংখ্য ট্রফি। এবার শেষবার মাঠে নামছেন।
কী, অবিশ্বাস্য মনে হচ্ছে? নীল-সাদা জার্সি ছাড়া মেসিকে ভাবাই যায় না। কিন্তু তার বহু আগেই স্পেনের হয়ে খেলার সুযোগ ছিল মেসির কাছে। সেটার সম্ভাবনাই বেশি ছিল। কেন ও কীভাবে সেই অঙ্কটা বদলে গেল? এর নেপথ্যে ছিল একটি ভিডিও টেপ ও 'অপহরণের' ছক।
১৩ বছর বয়সে আর্জেন্টিনা ছেড়ে বার্সেলোনায় চলে আসেন মেসি। ভর্তি হন লা মাসিয়া অ্যাকাডেমিতে। দীর্ঘদিন সেখানে থাকার সুবাদে স্পেনের হয়ে খেলার যোগ্যতাও অর্জন করেন মেসি। অন্যদিকে রয়েছে মাতৃভূমি আর্জেন্টিনা। ২০০২ সালের কথা। ততদিনে লা মাসিয়া মাতিয়ে দিয়েছেন ১৫ বছরের কিশোর। বার্সেলোনার মূল দলে সুযোগ পাওয়া সময়ের অপেক্ষা। স্কাউটদের কাছে খবর চলে গিয়েছে। কিন্তু না স্পেন, না আর্জেন্টিনা, কেউই যুব দলের জন্য মেসির খোঁজ পর্যন্ত করেনি। অথচ, লা মাসিয়ায় তাঁর সতীর্থ জেরার্ড পিকে, সেস ফ্যাব্রেগাসরা স্পেনে সুযোগ পেয়ে যান। তখন এগিয়ে আসেন লা মাসিয়ার কোচ অ্যালেক্স গার্সিয়া। স্পেনের যুব দলের তৎকালীন ডিরেক্টর গিনেস মেলেন্দেজকে তিনি বলেন, "আমাদের এখানে একটি ছেলে আছে। আর্জেন্টিনার হলেও সেখান থেকে এখনও ডাক আসেনি। মনে হয়, একটু চেষ্টা করলে সে স্পেনের হয়ে খেলতে পারবে। কিন্তু আর্জেন্টিনার ফেডারেশনকে চটানো যাবে না। আপনার উচিত ওর সঙ্গে কথা বলা।"
লা মাসিয়ার হয়ে মেসি। ফাইল ছবি
এই মুহূর্তে দাঁড়িয়ে কী করা উচিত? মেলেন্দেজের পরামর্শ ছিল, "আমি জানি না। ওকে অপহরণ করা যাক। যাতে আর্জেন্টিনা ওকে খুঁজে না পায়। আর ও স্পেনের হয়ে খেলতে পারে।" এদিকে আর্জেন্টিনা থেকে ডাক আসছে না। কিছুটা বাধ্য হয়েই মেসির বাবা জর্জে যোগাযোগ করেন তাঁদের এজেন্ট হোরাসিও গাজ্জিওলির সঙ্গে। কিছুই কী করা যায় না, যাতে মেসি আর্জেন্টিনার নির্বাচকদের চোখে পড়ে। সেই সময় গাজ্জিওলি একটি ভিডিও ক্যাসেট তৈরি করেন। যেখানে লা মাসিয়ায় মেসির খেলার বিভিন্ন ফুটেজ ছিল। সেই সময় আর্জেন্টিনার কোচ ছিলেন মার্সেলো বিয়েলসা। তিনি দল নিয়ে কিছুদিনের জন্য বার্সেলোনায় গিয়েছিলেন। তখন গাজ্জিওলি গিয়ে বিয়েলসার হাতে সেই ক্যাসেটটি তুলে দেন। বিয়েলসা জিজ্ঞেস করেন, "ছেলেটা কী ভালো খেলে?" জবাবে গাজ্জিওলি বলেন। "অবিশ্বাস্য খেলে।" এরপর ভিডিও চালাতেই বিয়েলসা বলেন, "আরে স্বাভাবিক গতিতে খেলা চালাও।" গাজ্জিওলি জবাব দেন, "এটা ওই ছেলেটার স্বাভাবিক গতি।"
অনূর্ধ্ব-২০ বিশ্বকাপে মেসি। ফাইল ছবি
বিয়েলসা বাকরুদ্ধ। তবে তখন আর্জেন্টিনার অনূর্ধ্ব-১৭ বিশ্বকাপের দল বেছে নেওয়া হয়েছিল। তাই বাদ পড়ল মেসি। ঘটনাচক্রে সেই টুর্নামেন্ট আর্জেন্টিনা স্পেনের কাছেই হেরেছিল। টুর্নামেন্ট শেষ হতেই ওই দলের কোচ তোকাল্লি ঠিক করেন, যেভাবেই হোক মেসিকে খেলাতেই হবে। বাধ্য হয়ে দ্রুত একটা বয়স ভিত্তিক প্রীতি ম্যাচের আয়োজন করা হয়। তখন নিয়ম ছিল, বয়স ভিত্তিক ফুটবলে একবার খেলে ফেললে আর দেশবদল করা যায়। তড়িঘড়ি অনূর্ধ্ব-২০ দল তৈরি করে মেসির নাম ফিফায় পাঠানো হল। ইতিমধ্যে আর্জেন্টিনার কোচের পদে জোসে পেকারম্যান এসেছেন। তাঁর মনে হয়েছিল, মেসিই পারবেন দিয়েগো মারাদোনার পথ অনুসরণ করতে।
কোচ জোসে পেকেরম্যানের সঙ্গে মেসি। ফাইল ছবি
অবশেষে ২০০৪ সালের ২৯ জুন। অনূর্ধ্ব-২০ ম্যাচে প্যারাগুয়েকে ৮-০ গোলে হারায় আর্জেন্টিনা। হাফটাইমে বদলি হিসেবে নামেন মেসি। একটি গোল ও একটি অ্যাসিস্ট করেন। নীল-সাদা জার্সির সঙ্গে চিরকাল গাঁটছড়া বেঁধে ফেললেন মেসি। ২০১০ সালে বিশ্বকাপ জিতেছিল স্পেন। ২০০৮ ও ২০১২-র ইউরো। অন্যদিকে ২০১৪-য় আর্জেন্টিনা বিশ্বকাপ ফাইনালে হারে। মেসিকে অপেক্ষা করতে হল ২০২২ পর্যন্ত। এবার সেই স্পেনের বিরুদ্ধেই দ্বিতীয়বার বিশ্বকাপ জেতার সুযোগ লা পুলগার কাছে।
