shono
Advertisement
France Football Team

থ্রি মাস্কেটিয়ার্স! কন্ট্রোলার ওলিস, এমবাপে-দেম্বেলেদের নিয়ে ছুটছে ফ্রান্সের এক্সপ্রেস

এই বিশ্বকাপে ফ্রান্সের অশ্বমেধের ঘোড়া ছোটানোর পিছনে আসল মস্তিষ্ক নাকি মিডফিল্ডার ওলিসের।
Published By: Arpan DasPosted: 02:29 PM Jul 12, 2026Updated: 05:18 PM Jul 12, 2026

ফ্রান্সে দ্রুতগতির ট্রেনকে বলা হয় ‘টিভিজি’। বিশ্বব্যাপী এর পরিচিতি শুধুমাত্র তীব্র গতির জন্য। সেটা যদি তিন ট্রেনের সমাহার হয়?

Advertisement

বুঝলেন না তো? এতদিন শুধুই ‘এমবাপে...এমবাপে...’ কোরাস ফরাসি গ্যালারিতে। যা নিয়ে শুরু থেকে প্রবল আপত্তি ফরাসি কোচ দিদিয়ের দেশঁর। ব্যালন ডি’অর পাওয়া উসমান দেম্বেলের সঙ্গে শুরু থেকে এমবাপের একটা হালকা ইগোর লড়াই, নজর এড়ায়নি কোচের। বাধ্য হয়ে মরক্কোর বিরুদ্ধে কোয়ার্টার ফাইনাল ম্যাচ খেলতে নামার আগে ড্রেসিংরুমকে সতর্ক করে দেন দেশঁ– “তারকা নির্ভরতা ছাড়তে হবে। খেলতে হবে দল হিসেবে।” এই বল্গাহীন ঝোড়ো গতির দুই ট্রেনের ইঞ্জিনকে সামালাবে কে? কন্ট্রোল রুমে বসে কোন কে ঠিক করবেন–এমবাপে আর দেম্বেলে কে কখন দ্রুত গতিতে প্রতিপক্ষর বক্সে বল নিয়ে ঢুকে পড়বেন?

অনেক ভাবনা-চিন্তা করে কোচ দেশঁ পিছন থেকে মাইকেল ওলিসের হাতে দায়িত্ব তুলে দিলেন এই ট্রেন কন্ট্রোলারের। অনেকে বলছেন, এই বিশ্বকাপে (FIFA World Cup 2026) ফ্রান্সের (France Football Team) অশ্বমেধের ঘোড়া ছোটানোর পিছনে আসল মস্তিষ্ক নাকি মিডফিল্ডার ওলিসের।

এমবাপে-দেম্বেলে-ওলিস। ফ্রান্সের ব্রহ্মা-বিষ্ণু-মহেশ্বরকে ফরাসি মিডিয়া আদর করে নাম দিয়েছে, ‘লে ট্রায়াঙ্গেল টিভিজি।’ এমবাপেকে যখন প্রতিপক্ষ একসঙ্গে দু’জন মিলে মার্ক করছেন, তখন ডানদিকে দেম্বেলের উদ্দেশ্যে পাস বাড়ান ওলিস। প্রতিপক্ষ পড়ে যাচ্ছে ধাঁধায়। ফিফার টেকনিক্যাল কমিটিতে থাকায় বিশ্বকাপের প্রতি ভেন্যু ঘুরে বেড়ানো আর্সেন ওয়েঙ্গার বলছিলেন, “এমবাপে-দেম্বেলের পিনে ওসিলকে ফিট করাটাই হচ্ছে কোচ দেশঁর মাস্টারস্ট্রোক।”

গোলের পর সতীর্থদের সঙ্গে উচ্ছ্বসিত এমবাপে। ছবি সংগৃহীত।

এমবাপে ঝড়ের গতিতে প্রতিপক্ষ ডিফেন্ডারদের দুমড়ে-মুচড়ে শেষ করে দিতে পারেন। দেম্বেলে যে কোন পায়ের ড্রিবলার, তা বুঝে ওঠার আগেই প্রতিপক্ষ ধরাশায়ী। এক সাংবাদিক দেম্বেলেকে জিজ্ঞাসা করেছিলেন, তিনি কোন পায়ে খেলতে স্বচ্ছন্দ্য বোধ করেন? দেম্বেলে হেসে উত্তর দিয়েছিলেন, তিনি বাঁ পায়ে ড্রিবল করেন। আর পেনাল্টি মারেন ডান পায়ে।

ফ্রান্স দলের দুই প্রান্ত বরাবর এই ঝোড়ো গতিকে নির্দিষ্ট কক্ষপথে পরিচালনার স্টিয়ারিং এখন ওলিসের কাছে। তাঁর ‘ওভার দ্য হেড’ ধরে কাট করে বক্সে ঢুকে পড়ছেন এমবাপে। পাস দিচ্ছেন দেম্বেলেকে। সেখান থেকে গোল। এই ত্রিভুজই কি বিশ্ব ফুটবলের সেরা? আলোচনাটা কিন্তু শুরু হয়ে গিয়েছে। এই আলোচনায় অবশ্যই ঢুকে পড়েছেন ফুটবলের সবেচেয়ে আলোচিত ত্রিভুজ। ২০০২ বিশ্বকাপের ‘রোনাল্ডো-রিভাল্ডো-রোনাল্ডিনহো।’

গোলের পর দেম্বলের উচ্ছ্বাস।

২০০২ বিশ্বকাপের ঠিক আগে কোচ লুই ফিলিপ স্কোলারি বাদ দিয়েছিলেন রোমারিওকে। সেই নিয়ে কম অশান্তি পোহাতে হয়নি তাঁকে। রোনাল্ডোও সবে চোট সারিয়ে দলে ফিরেছেন। রোনাল্ডো-রিভাল্ডো-রোনাল্ডিনহো। এই তারকা ত্রিভুজকে স্কোলারি একদিন বাড়িতে ডাকেন। বলেছিলেন, “মনের আনন্দে খেলো। ডিফেন্স নিয়ে ভাবতে হবে না।” বাকিটা ইতিহাস। সাম্বার জাদুতে বিশ্ব ফুটবলকে পাগল করে দিয়েছিলেন ত্রয়ী। ২০২৬-এ এসে এমবাপে-দেম্বেলে-ওলিস ত্রিভুজ যেন অনেক বেশি সিস্টেমেটিক। আবেগের আনন্দে সব কিছু ছেড়ে আক্রমণের বদলে, কার্যকরী ফুটবল দৃশ্যমান।

স্বাভাবিক ভাবেই তুলনায় আসছে, গুলিট-বাস্তেন-রাইকার্ড জুটির প্রসঙ্গও। ফ্রান্স দলের ওলিসের ভূমিকা অনেকটা রাইকার্ডের মতো। ইউরো জেতা সেই নেদারল্যান্ডসে ডিফেন্ডারদের উপরে পেন্ডুলামের মতো দুলতেন রাইকার্ড। দলটার ইঞ্জিন হয়ে সারা মাঠে চষে বেড়াতেন গুলিট। বক্সের মধ্যে বাস্তেন ছিলেন গোলক্ষুধা নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়া স্ট্রাইকার। সেবারও এই জুটি গড়ে উঠত না, যদি না ডাচ কোচ রেনেস মিশেল ক্লাব ফুটবলে সেন্ট্রাল ডিফেন্সে খেলা রাইকার্ডকে জাতীয় দলে সেন্ট্রাল মিডফিল্ডে না খেলাতেন।

যদি স্পানিশ ত্রিমূর্তি জাভি-ইনিয়েস্তা-বুসকেটসকে ধরি, সেটা পুরোপুরি অন্য দর্শনের ফুটবল। যার সঙ্গে এমবাপে-দেম্বেলে-ওলিসের দর্শন ধারে কাছে আসে না। স্প্যানিশ ত্রয়ীরা মাঝমাঠের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে শেষ করে দিতেন প্রতিপক্ষকে। সেখানে ওলিসে-এমবাপে-দেম্বেলে অধিক আগ্রাসী। বক্সের মধ্যে আক্রমণের বুলডোজার চালানোয় বিশ্বাসী। তিন ফুটবলারের তিন ধরনের খেলার বৈচিত্রে, ফরাসি আক্রমণের ধারাও অনেক বেশি বৈচিত্র্যময়। যা একমাত্র ব্রাজিলের তিন ‘আর’ জুটির সঙ্গে মেলানো যায়।

ফ্রান্সের এই ত্রিভুজকে একসূত্রে বেঁধেছে কোচ দিদিয়ের দেশঁর ‘বাঙ্কার ট্যাকটিক্স।’ বিশ্বকাপে ফ্রান্সের খেলার সিস্টেমকে সে’দেশের সাংবাদিকরা এই নামেই ডাকছেন। যে ট্যাকটিক্সে শিল্পের থেকে প্রয়োজনীয়তা গুরুত্বপূর্ণ। যাতে তারকার থেকে দলগত ট্যাকটিক্সের প্রভাব বেশি। এই ট্যাকটিক্স থেকেই ‘পোস্টার বয়’ হিসেবে উঠে এসেছেন ওলিস। যাঁকে কিনা অনেকে বলছেন, আতোয়াঁ গ্রিজম্যানের খাঁটি উত্তরসূরি।

ফ্রান্সের এই ত্রিভুজকে একসূত্রে বেঁধেছে কোচ দিদিয়ের দেশঁর ‘বাঙ্কার ট্যাকটিক্স।’ বিশ্বকাপে ফ্রান্সের খেলার সিস্টেমকে সে’দেশের সাংবাদিকরা এই নামেই ডাকছেন। যে ট্যাকটিক্সে শিল্পের থেকে প্রয়োজনীয়তা গুরুত্বপূর্ণ।

এমবাপে আর দেম্বেলে সেই ছোট থেকেই ফরাসি যুব দলের হয়ে একসঙ্গে ড্রেসিংরুম শেয়ার করছেন। ফরাসি সাংবাদিকরা বলেন, ড্রেসিংরুমের সবচেয়ে হাসি-খুশি ফুটবলার এই দু’জন। এঁদের সঙ্গে যখনই যুক্ত হচ্ছেন ওলিসে, ড্রেসিংরুমের আবহটাই বদলে যাচ্ছে। তিনি ভীষণ চুপচাপ। পারলে কথাই বলেন না। গ্রুপে প্রথম ম্যাচের পর এমবাপে মিক্সড জোনে এসে মজা করে বলেছিলেন, “মাঠের ভিতর ওলিসে যত পাস দেয়, তার থেকে সারাদিনে আমাদের সঙ্গে কম কথা বলে।” দুই আক্রমণাত্মক ক্ষেপণাস্ত্রকে টার্গেটে ব্যবহার করার জন্য পিছন থেকে ধীর-স্থির-শীতল মস্তিষ্কের ওলিসের থেকে ভালো কন্ট্রোলার কোথায় পাবেন কোচ দেশঁ?

মাইকেল ওলিসে

করিম বেঞ্জেমা এবং অলিভিয়ের জিরুর সঙ্গে কিলিয়ান এমবাপের অহি-নকুল সম্পর্ক দেখেছে ফরাসি ফুটবল। সেখানে এই এমবাপে-দেম্বেলে-ওলিসে যেন জলতরঙ্গের একই সুর। পরস্পরের প্রতি শ্রদ্ধা আর বন্ধুত্ব ফ্রান্স দলের বরাবরের ‘ইগো’ দূরে সরিয়ে রেখেছে।

তবে ফাঁক এক জায়গায় এখনও আছে। ব্রাজিলের যে ‘আর’ জুটির সঙ্গে তুলনা টানা হচ্ছে এই ফরাসি ত্রয়ীর, সেই ত্রিভুজ জুটির কিন্তু একটা বিশ্বকাপ আছে। এই এমবাপে-দেম্বেলে-ওলিসে তখনই জুটির অমরত্ব পাবে, ১৯ জুলাই মেটলাইফ স্টেডিয়ামে বিশ্বকাপটা মঞ্চে উঠে এঁরা তুলে ধরেতে পারেন যদি। ততক্ষণ পর্যন্ত না হয় ‘দারুণ জুটি’ হিসেবেই থাকলেন তিন তারকা।

Sangbad Pratidin News App

খবরের টাটকা আপডেট পেতে ডাউনলোড করুন সংবাদ প্রতিদিন অ্যাপ

হাইলাইটস

Highlights Heading
Advertisement