হিসেব কষে দেখা যাচ্ছে, তাঁর ফুটবল কেরিয়ারের ২২টি জন্মদিনের মধ্যে ১৩টি জন্মদিন কাটিয়েছেন জাতীয় শিবিরে। আসলে ২৪ জুন, দিনটাই এমন যে, হয় এই সময় বিশ্বকাপ (FIFA World Cup 2026), না হলে কোপা আমেরিকা অথবা কোনও আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতা লেগেই রয়েছে। ফলে গত ২২ বছর ধরে লিওনেল মেসির (Lionel Messi) জন্মদিনের মুহূর্তগুলি বেশিরভাগই কেটেছে জাতীয় শিবিরে সতীর্থদের সঙ্গে। তবে বারে বারে বদলে গিয়েছে, জাতীয় শিবিরে কেক কাটার মুহূর্তে টেবিলের উলটোদিকের মুখগুলি।
নেদারল্যান্ডসে অনূর্ধ্ব-২০ বিশ্বকাপে সেই প্রথম। মেসি তখন ১৮। দেশকে প্রতিযোগিতায় শুধু চ্যাম্পিয়ন করাই নয়, সর্বোচ্চ গোলদাতা, সেরা ফুটবলার, সব তাঁর পকেটে। সতীর্থ রিকেলমে’র জন্মদিনও এই ২৪ জুন। সেবার অনূর্ধ-২০ বিশ্বকাপের শিবিরে, দুই বন্ধু গলা জড়িয়ে, ছবি তুলে একসঙ্গে কেক কেটেছিলেন। কোথায় আজ রিকেলমে? এভাবেই জাতীয় শিবিরে বারেবারে বদলে গিয়েছে মেসির জন্মদিন পালনের বন্ধু, সতীর্থরা। রয়ে গিয়েছেন শুধু মেসি। আর এখন জাতীয় শিবিরে মেসির সঙ্গে কেক কাটছেন ডি’পল, এনজো ফার্নান্ডেজরা।
ছবি সংগৃহীত।
সবকিছু ঠিকঠাক থাকলে নকআউটের প্রথম ম্যাচটা খেলার জন্য ২ জুলাই মায়ামি চলে আসবেন মেসিরা। সেখানে নেইমারের ব্রাজিল ইতিমধ্যেই খেলে ফেলেছে। গ্রুপের শেষ ম্যাচ খেলতে আসছে রোনাল্ডোর পর্তুগাল। আর তারপরেই মেসিরা। ফলে মায়ামির বিচগুলিতে এখন আর শুধুই হলুদ নয়। ভিড় জমিয়েছেন পর্তুগালের লাল-সবুজের পাশাপাশি নীল-সাদা জার্সির সমর্থকরাও। আর সেখানে তাঁদের প্রিয় লিও-র ৩৯তম জন্মদিন। কী করে চুপ করে বসে থাকতে পারেন তাঁরা?
আর্জেন্টিনার জনপ্রিয় টেলিভিশন চ্যানেল, নোঙর রোদোলফো বারিলি। ফুটবল রাজপুত্রর জন্মদিন পালন নিয়ে তারা এক অভিনব পন্থা নিয়েছিল। হ্যাশট্যাগ দিয়ে তারা একটা প্রচার শুরু করে। বিশ্বের যেখানে যত মেসির ফ্যান রয়েছেন, সকাল ১০টা থেকে টানা ১২ ঘণ্টা মেসির জন্মদিনে গান গাইবেন। তারপর সোশাল মিডিয়ায় পোস্ট করবেন। মায়ামি, ক্র্যান্ডন পার্ক, হাউলোভার বিচগুলোয় এদিন পা ফেলার জায়গা নেই। নীল-সাদা জার্সি পরে সকলে মেসির উদ্দেশ্যে গান গাইছেন। আর মেসি নিজে কী করলেন?
কানসাসে, যেখানে মেসিরা রয়েছেন, সেখানে একরকম টাইম জোন। ডালাসে যেখানে আগের ম্যাচে বিশ্বরেকর্ড করেছেন, সেখানে আরেকরকম টাইম জোন। তাহলে কোন সময়টা ধরে বলতে হবে, ‘মেসি দিবস’ শুরু হল? নিজের জন্মদিনের মুহূর্তটা শেয়ার করার জন্য মেসি নিজে বেছে নিয়েছেন আর্জেন্টিনার টাইম জোন, যা কানসাসের থেকে ২ ঘণ্টা আগে। আর্জেন্টিনার মধ্যরাতে নিজের ইনস্টাগ্রাম অ্যাকাউন্ট থেকে মেসি নিজে এমন একটা ভিডিও পোস্ট করলেন, যা বিশ্বজুড়ে আলোড়ন ফেলে দিয়েছে। কোথায় সতীর্থদের সঙ্গে কেক কাটার ছবি পোস্ট করবেন, তা না করে কানসাসের বেস ক্যাম্পের জিম সেশনের ভিডিও পোস্ট করেছেন। জন্মদিনের মুহূর্ত নিয়ে একটি শব্দও লেখেননি। কিন্তু তাতে কী, অনেক সময় কোনও শব্দ খরচ না করেও, ছবি বা মুহূর্ত অনেক কথা বলে দেয়।
ছবি সংগৃহীত।
ভিডিওতে দেখা যাচ্ছে, নিজেকে ফিট রাখার জন্য জিমে নানা ধরনের ট্রেনিং করছেন। নিজের ৩৯তম জন্মদিনের মুহূর্তে নিজের ফিটনেস ট্রেনিংয়ের মুহূর্ত প্রকাশ করে বিশ্বজুড়ে তাঁর কোটি কোটি ফ্যানদের কী বোঝাতে চাইলেন মেসি (Lionel Messi)? আসলে ঠিক এখান থেকে নতুন করে স্টান্স নিচ্ছেন সামনে এগিয়ে যাওয়ার জন্য। কিন্তু ভিডিওর ব্যাকগ্রাউন্ডে কোন সঙ্গীতের মূর্ছনা বাজছে, খেয়াল করেছেন? ‘তিয়েরা দে ক্যাম্পেওনেস’। যে গানের মানে চ্যাম্পিয়নদের দেশ। যা আর্জেন্টিনার নতুন প্রজন্মের কাছে জাতীয় সঙ্গীতের চেহারা নিয়েছে।
নতুন বছর। নতুন মুহূর্ত। আর সেই মুহূর্তে চ্যাম্পিয়নের গান নিজের ভিডিওর ব্যাকগ্রাউন্ডে ব্যবহার করে নিজের ফিটনেস ট্রেনিংয়ের মুহূর্ত প্রকাশ করেছেন মেসি। এরপর কি বলতে হবে, বিশ্বকাপের গ্রুপ পর্যায়ে শেষ ম্যাচ খেলতে নামার আগে তিনি সমর্থকদের কাছে কী বার্তা দিতে চাইছেন?
পরপর দু’টো ম্যাচ জিতে ফেলায়, গ্রুপের শেষ প্রতিপক্ষ জর্ডনের বিরুদ্ধে স্রেফ নিয়মরক্ষার ম্যাচ খেলতে নামবে আর্জেন্টিনা। পরের রাউন্ডে যাওয়া নিশ্চিত হয়ে যাওয়ার পরও সমস্যায় পড়েছেন স্কালোনি। আর এটাই এখন আর্জেন্টিনা শিবিরের মূল ভাবনা। স্কালোনি চাইছেন, গ্রুপের শেষ ম্যাচে যত বেশি সম্ভব বেঞ্চের ফুটবলারদের দেখে নিতে। তাহলে কি নকআউটে আরও ঝরঝরে মেসিকে পাওয়ার জন্য জর্ডনের বিরুদ্ধে বিশ্রাম দেওয়া হবে আর্জেন্টিনা অধিনায়ককে? এর ফল কী হবে, তা এখনও পর্যন্ত জানা যায়নি শিবির থেকে। তবে মায়ামিতে আসা আর্জেন্টিনার সাংবাদিকরা বলাবলি করছিলেন, "মেসি বোধহয় নিজেই বিশ্রাম নিতে চাইছেন না। এই যে এমবাপে গোল সংখ্যায় পিছন থেকে ধাওয়া করছে, এই বিষয়টিই বেশি করে এখন তাতাচ্ছে তাঁকে। ফলে গুরুত্বহীন, চাপহীন ম্যাচটায় খোলা মনে খেলতে চাইছেন লিও।"
ছবি সংগৃহীত।
এদিকে, সকালেই শিবিরে না এসে সোশাল মিডিয়ায় পোস্ট করেছেন মেসির স্ত্রী আন্তোনেলা রোকুজ্জো। ‘আমাদের যা কিছু প্রয়োজন, তার সব কিছুই ইতিমধ্যে আমাদের আছে। কারণ, আমাদের কাছে তুমি আছ।’ প্রত্যুত্তরে তাঁদের প্রথম সন্তান, থিয়াগোর খুব ছোটবেলার একটা ছবি পোস্ট করে মেসি লিখেছেন, ‘তখন আমরা কত ছোট ছিলাম।’ মেসির সমর্থকরাও এখন সেই ২০০৬ সালের বিশ্বকাপের ছবি পোস্ট করে লিখতেই পারেন, ‘লিও তুমি কত ছোট ছিলে।’ কিন্তু ৩৯-এ এসেও মেসির বয়স বাড়ল কোথায়? তিনি তো আর্জেন্টিনা ফুটবলের চলমান অশরীরী। ফ্যান্টম।
