এমবাপে বনাম ইয়ামাল? ফ্রান্সের আক্রমণ বনাম স্পেনের রক্ষণ (Spain vs France)? একেবারেই নয়। মাঝখান থেকে উঠে এসেছে একটা নাম। তিনি মিকেল মেরিনো। অবশ্য মাঝখান থেকে উঠে এসেছেন বলাটা ভুল হল। ইউরোতেও তিনি ছিলেন। সেই একই 'সুপার-সাব' হিসেবে বিশ্বকাপেও (FIFA World Cup 2026) গোল করছেন। ছাত্রের কীর্তিতে একেবারেই অবাক নন কিবু ভিকুনা। স্প্যানিশ গুরু ভালোমতোই জানেন, গোল করে খেলা ঘুরিয়ে দিতে পারেন মেরিনো। এটা ঠিক যে, ফ্রান্স এই মুহূর্তে সামান্য এগিয়ে আছে। তবে মোহনবাগানের প্রাক্তন কোচ এটাও মনে করিয়ে দিলেন, দু'দলের শেষ ১০ সাক্ষাতে স্পেন ৭টা ম্যাচ জিতেছে। এবারও কি তাই হবে? পার্থক্য গড়ে দেবে কোন ফ্যাক্টর? বিশ্বকাপ সেমিফাইনালে স্পেন-ফ্রান্স দ্বৈরথ নিয়ে সংবাদ প্রতিদিন ডিজিটাল-এ বিশ্লেষণে কিবু ভিকুনা।
ফ্রান্সের থ্রি মাসকেটিয়ার্স- দেম্বেলে, এমবাপে, ওলিসে
ডালাস স্টেডিয়ামে বল গড়ানোর অনেক আগে থেকেই কথার ফুলঝুরি শুরু হয়ে গিয়েছে। স্পেনের তরুণ তুর্কি ইয়ামাল যেমন হুঙ্কার দিয়েছেন, ফ্রান্সের বিরুদ্ধে জয়ের হ্যাটট্রিক করবেন। সেখানে ফরাসি ডিফেন্ডার দায়োত উপামেকানো আবার ইয়ামালকে 'বিনয়ী' হওয়ার পাঠ দিচ্ছেন। যিনি সদ্য ১৯ বছরে পা দিয়েছেন। পরিসংখ্যান দেখলে কিন্তু ইয়ামালদের এগিয়ে রাখতে হয়। আবার অনেকে বলছেন, এই মুহূর্তে ধারে-ভারে কিছুটা এগিয়ে ফ্রান্সই। তাই কি? কিবু বলছেন, "এই বিশ্বকাপের এখনও পর্যন্ত সবচেয়ে ভালো দল ফ্রান্সই। তবে তাদের সামনে সবচেয়ে কঠিন প্রতিপক্ষ ছিল মরক্কো। সেখানে স্পেন ফিফা র্যাঙ্কিংয়ের সেরা দশের দু'টো দলের বিরুদ্ধে খেলেছে- পর্তুগাল (৭) ও বেলজিয়াম (৮)।" সঙ্গে মনে করিয়ে দিলেন, "ফ্রান্সের বিরুদ্ধে গত ১০ ম্যাচের মধ্যে স্পেন ৭টা জিতেছে।"
অত পিছিয়ে যাওয়ার দরকার নেই। গত তিনবছরের তথ্যের নিরিখে স্প্যানিশ আমার্ডায় বারবার ফরাসি বিপ্লব থমকে গিয়েছে। গতবছর নেশনস লিগ, তার আগের বছর ইউরো। দু'ক্ষেত্রেই লামিনে ইয়ামাল নামে এক কিশোরের কাছে পরাস্ত হয়েছেন কিলিয়ান এমবাপেরা। বার্সেলোনা-রিয়াল মাদ্রিদের আন্তর্জাতিক 'এল ক্লাসিকো'য় এগিয়ে ইয়ামালই। তবে কিবু জানেন, ম্যাচটা দু'জনের নয়। দু'দলের। তিনি জানালেন, "ম্যাচটা একেবারেই এমবাপে বনাম ইয়ামাল হচ্ছে না। হবে ফ্রান্স বনাম স্পেন। দু'জন অন্য পজিশনে খেলে। এটা ঠিক যে, এমবাপে এই মুহূর্তে তুলনামূলক ভালো ফর্মে আছে। তবে দিনের শেষে যে দল ভালো খেলবে, সে জিতবে।"
কীভাবে সেই কাজটা করা যায়? দিদিয়ের দেশঁ যেমন বহুবছর ধরে ফরাসি দলের দায়িত্ব সামলাচ্ছেন। অন্যদিকে লুইস দে লা ফুয়েন্তের হাতে পড়ে স্প্যানিশ দল অনেক বদলে গিয়েছে। সেই তিকিতাকার যুগ আর নেই। পাসিং ফুটবল আছে ঠিকই। তবে অনেক দ্রুত, আগ্রাসী। স্পেনের এই নতুন ঘরানার ফুটবল নিয়ে কিবুর বক্তব্য, "এটা চিরাচরিত তিকিতাকা নয়। স্পেন এখন পজেশনাল ফুটবল খেলছে। রক্ষণভাগও খুব ভালো। বিশেষ করে ট্রান্সজিশনে৷ সংঘবদ্ধ ফুটবল খেলছে। আসলে ফুটবলের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ জায়গা হল আক্রমণ ও রক্ষণের মধ্যে যোগাযোগের মাধ্যম তৈরি করা।"
গোলের পর সেলিব্রেশন স্পেনের মিকেল মেরিনোর।
সেখানে নিঃসন্দেহে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে স্পেনের মিডফিল্ড। প্রথম একাদশে না থেকেও থাকবেন মিকেল মেরিনো। ৩০ বছর বয়সি আর্সেনালের মিডফিল্ডার যেন স্পেনের 'চিটকোড'। বদলি হিসেবে মাঠে নামা মানেই গোল। পর্তুগালের পর বেলজিয়ামের বিরুদ্ধেও গোল। অনেকে তো তাঁকে বিশ্বকাপের ইতিহাসে সর্বকালের সেরা 'সুপার-সাব' বলছেন। কিবু যখন স্পেনের ক্লাব সিএ ওসাসুনার সহকারী কোচ, তখন সিনিয়র দলে ডাক পেয়েছিলেন মেরিনো। বছর বারো আগে মেরিনোকে তুলে আনার ক্ষেত্রে অনেকটাই ভূমিকা রয়েছে কিবুর। স্প্যানিশ মিডফিল্ডারকে নিয়ে আই লিগ জয়ী কোচ বলছেন, "মিকেল মেরিনো শুধু একজন সুপার-সাব নয়। স্পেন বা আর্সেনাল ক্লাবের হয়ে প্রচুর ম্যাচ জিতেছে, ট্রফি পেয়েছে। স্পেনের অনূর্ধ্ব-১৯, অনূর্ধ্ব-২০, তিনবছর আগে নেশনস লিগ, দু'বছর আগে ইউরো সব জিতেছে। গতবার নেশনস লিগের ফাইনালেও উঠেছিল। ও ভার্সেটাইল ফুটবলার। বিভিন্ন জায়গায় খেলতে পারে। নম্বর ৬, নম্বর ৮-এ খেলতে পারে। সেটপিসে খুব ভালো। গোলটা চেনে। বেলজিয়ামের বিরুদ্ধে গোলটার কথা বলা যাক। অফসাইড পজিশন থেকে নিজেকে সময়মতো পিছিয়ে এনেছে। তারপর যখন কুবারসি শট নিল, তখন সবার আগে গোলের কাছে গিয়েছে।"
মেরিনো প্রথম দলে থাকবেন কি না, সেটা সময়ই বলবে। কিন্তু খেলার গতি নির্ধারিত হবে মাঝমাঠেই। দু'দলই পজেশন নির্ভর ফুটবল খেলতে পছন্দ করে। সেখানে স্পেন দলে কিছু দুর্বলতা আছে। সেসব মেনে নিচ্ছেন কিবু। তাঁর বক্তব্য, "ফ্রান্সের আক্রমণ নিঃসন্দেহে সেরা। এমবাপে-দেম্বেলেরা ফর্মে আছে। অন্যদিকে স্পেনকে যারা ইউরো জিতিয়েছিল, তারা কিন্তু সেভাবে ছন্দে নেই। লামিনে ইয়ামাল চোট সারিয়ে ফিরেছে। বার্সেলোনার হয়ে পেদ্রি যে খেলাটা খেলছে, সেটা এখানে পাওয়া যাচ্ছে না। ও অসাধারণ প্লেয়ার বলে সেই দুর্বলতা ঢাকা পড়ে যাচ্ছে। বিশ্বের অন্যতম সেরা মিডফিল্ডার। নিজের সেরাটা দিতে না পারলেও অনেকের থেকে ভালো। নিকো উইলিয়ামস খেলতে পারছে না। আমার মতে, লড়াইটা হবে কে বলের পজেশন নিতে পারছে। ফ্রান্স দল এখনও পর্যন্ত সবচেয়ে বেশি পজেশন রেখেছে। আর স্পেনের মিডফিল্ডই খেলা তৈরি করবে।"
ফরাসি দলকে অনেকে এগিয়ে রাখলেও কিবু মনে করছেন ম্যাচ তুল্যমূল্য হবে। অতীত ইতিহাস স্পেনের পক্ষে। আবার ফ্রান্সের আক্রমণভাগ ভয়ানক। জিতবে কে? কিবুর ভবিষ্যদ্বাণী, "প্রতিটা ম্যাচ আলাদা। আমার ধারণা, ম্যাচটা কঠিন হবে। ফ্রান্স হয়তো একটু এগিয়ে থাকবে। কিন্তু এটা সেমিফাইনাল। দু'দলেই ভালো প্লেয়ার আছে। ম্যাচটা উপভোগ্য হবে।"
