স্বৈরশাসকদের নিয়ে নানান কথা শোনা যায়। তার কোনটি সত্য আর কোনটি গুজব, বোঝা কঠিন। উত্তর কোরিয়া এমন একটি দেশ, যেখানে কী ঘটছে, তার সঠিক হদিশ সহজে পাওয়া কঠিন। কিন্তু মাঝেমাঝে এমন কিছু খবর ছড়ায়, যা আমাদের অবাক করে। স্পেনের কাছে হেরে বিশ্বকাপে (FIFA World Cup 2026) গ্রুপ পর্ব থেকে বিদায় নেওয়ার পর কেড়ে নেওয়া হয়েছে উরুগুয়ে ফুটবলারদের চার্টার্ড বিমান। অবস্থা এতটাই সঙ্গীন, নিজেদের গাঁটের কড়ি খরচ করে দেশে ফিরতে হচ্ছে ডারউইন নুনেজ, রদ্রিগো আগুয়িরেদের। সেদেশের ফুটবলের কর্তাদের এমন 'স্বৈরাচারী' মনোভাবের সঙ্গে অনেকেই মিল পাচ্ছেন উত্তর কোরিয়ার শীর্ষনেতা কিম জং উনের। কিন্তু কেন?
অবস্থা এতটাই সঙ্গীন, নিজেদের গাঁটের কড়ি খরচ করে দেশে ফিরতে হচ্ছে ফুটবলারদের।
২০২২ সালের পর ২০২৬ বিশ্বকাপেও গ্রুপ পর্ব থেকেই বিদায় নিতে হয়েছে উরুগুয়েকে। প্রথম দু’টো ম্যাচে ড্র। স্পেনের বিরুদ্ধে মরণ-বাঁচন যুদ্ধ ছিল উরুগুয়ের। ড্র করলেও তারা নকআউটে চলে যেত। কিন্তু স্পেনের কাছে হেরে নিজেদের বিদায় নিশ্চিত করে ফেলে তারা। টানা দুই বিশ্বকাপে এমন হতাশাজনক পারফরম্যান্সে ক্ষুব্ধ সেদেশের ফুটবলপ্রেমীরা। ক্ষোভের সেই গনগনে আঁচ ছড়িয়ে পড়ে উরুগুয়ে ফুটবল ফেডারেশনেও।
উরুগুয়ের বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের দাবি, বিশ্বকাপে দলের যাতায়াতের মেক্সিকোর প্লায়া দেল কারমেনের অনুশীলন শিবির থেকে মন্টেভিডিও পর্যন্ত নির্ধারিত চার্টার্ড ফ্লাইট বাতিল করে দেয় ফেডারেশন। ফুটবলারদের নিজ নিজ উদ্যোগে বাণিজ্যিক ফ্লাইটে দেশে ফিরতে বলা হয়। ফলে ফুটবলারদের নিজেদের খরচে আলাদা আলাদা ফ্লাইটে দেশে ফিরতে হয়েছে। পুরো দল একসঙ্গে দেশে ফিরতে পারেনি। এই আবহে যে বিয়েলসাকে ঘিরে নতুন করে স্বপ্ন দেখা শুরু করেছিল উরুগুয়ে ফুটবল, তাঁর বিদায় মোটামুটি নিশ্চিত।
দলের যাতায়াতের মেক্সিকোর প্লায়া দেল কারমেনের অনুশীলন শিবির থেকে মন্টেভিডিও পর্যন্ত নির্ধারিত চার্টার্ড ফ্লাইট বাতিল করে দেয় ফেডারেশন।
জানা গিয়েছে ড্রেসিংরুমে টিমের উপর থেকে ধীরে ধীরে নিয়ন্ত্রণ হারাতে শুরু করেছিলেন কোচ মার্সেলো বিয়েলসা। তাঁর কোচিং পদ্ধতি নিয়ে প্রশ্ন তুলতে শুরু করেন ফুটবলাররা। কোচকে পরিষ্কার বুঝিয়ে দেওয়া হয়, তাঁর ট্রেনিংয়ের রকম একেবারেই পছন্দ হচ্ছে না টিমের। উরুগুয়ের এক প্রচারমাধ্যমের দাবি, স্পেনের বিরুদ্ধে মহাগুরুত্বপূর্ণ ম্যাচে নামার আগেই কয়েকজন ফুটবলারদের সঙ্গে বিয়েলসার অশান্তি হয়। উত্তপ্ত এই পরিস্থিতির প্রভাব ম্যাচেও পড়ে। স্পেনের বিরুদ্ধে হেরে বিদায় নিতে হয় উরুগুয়েকে।
বিশ্বকাপ থেকে ছিটকে যাওয়ার পর হতাশা গোপন করেননি কোচ মার্সেলো বিয়েলসাও। আর্জেন্টাইন এই কোচ বলেন, "উরুগুয়ের ফুটবলকে কিছুই দিয়ে যেতে পারলাম না। তিন বছর কোচ হিসাবে কাজ করেছি। যত সমর্থনই পাই না কেন, ফলাফল দিতে না পারলে কোচের কোনও মূল্য থাকে না। কোপা আমেরিকায় তৃতীয় স্থানও মূল্যহীন। বিশ্বকাপের ফল নিয়েও কিছু বলার নেই। আমি কিছুই করতে পারলাম না।" কিন্তু সেসব ছাপিয়ে চর্চায় ফুটবলারদের দেওয়া উরুগুয়ে ফেডারেশনের কড়া শাস্তি। যার সঙ্গে কিমের মিল পেয়েছেন অনেকে।
উরুগুয়ে ফেডারেশনের কড়া শাস্তির সঙ্গে অনেকে মিল পেয়েছেন উত্তর কোরিয়ার শীর্ষনেতা কিমের। কথিত আছে, তিনি নাকি অলিম্পিক ফেরত পদকহীন অ্যাথলিটদের কঠিন শাস্তি দেন।
কিমের স্বৈরাচারী মনোভাব নিয়ে এ যাবৎ আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে নানান খবর হয়েছে। তার অন্যতম, তিনি নাকি অলিম্পিক পদকজয়ীদের বড় ধরনের পুরস্কার দেন। টাকাপয়সা, বাড়ি-গাড়ি কিছু বাদ যায় না। ঠিক যেমন ২০১২ সালের লন্ডন অলিম্পিকে স্বর্ণপদক জয়ীদের জমকাল অভ্যর্থনা জানানো হয়েছিল। নদীবক্ষে তাঁদের বিলাসবহুল অ্যাপার্টমেন্টের পাশাপাশি গাড়িও দিয়েছিলেন কিম। কিন্তু যাঁরা খালি হাতে ফিরেছেন? তাঁদের? তাঁদের জন্য অপেক্ষা করেছে কড়া শাস্তি! ২০১৬ সালের রিও অলিম্পিকে প্রত্যাশিত সাফল্য পায়নি উত্তর কোরিয়া। সেই সময় কোরিয়ান টাইমস, দ্য সানের রিপোর্টে বলা হয়েছিল, খালি হাতে ফেরা অ্যাথলিটদের বস্তিতে থাকতে হয়েছিল। এমনকী কয়েকদিন তাঁদের কয়লা খনিতে কাজও করতে বলা হয়। যদিও এসব কিসসা সত্য কি না, তা নিশ্চিত নয়। উত্তর কোরিয়াও এ নিয়ে কখনও সরকারিভাবে কিছু ঘোষণা করেনি। তাই অলিম্পিকে খারাপ ফল করা অ্যাথলিটদের কঠোর শাস্তি দেওয়ার যেসব গল্প ভাইরাল, সেগুলোকে 'শোনা কথা' হিসাবেই দেখা উচিত। যাই হোক, উরুগুয়ে ফুটবল দলের চার্টার্ড বিমান বাতিলের খবর প্রকাশের পর, কিমের স্বৈরাচারী মনোভাব নিয়ে দীর্ঘদিনের নানা আলোচিত গল্প আবারও নতুন করে চর্চায়।
