স্টাফ রিপোর্টার: এমনটা আই লিগের দশ বছরে কখনও হয়নি! তারও আগে এগারো বারের জাতীয় লিগও দেখেনি এরকম রক্তচাপ বাড়িয়ে তোলা সিচুয়েশন। লিগের শেষ দিনে চারটে দলের যে কেউ চ্যাম্পিয়ন হতে পারে। আই লিগ ট্রফি নিয়ে টাগ অব ওয়ার চলেছে চার-চারটে টিমের মধ্যে!
মিনার্ভা। নেরোকা। মোহনবাগান। ইস্টবঙ্গল। বৃহস্পতিবারের বারবেলা চার দলের যে কোনও কারও কাছে শুভক্ষণ হয়ে উঠতে পারে! তিনটেই আই লিগের সম্ভাব্য চ্যাম্পিয়নশিপ ম্যাচ বলে ফেডারেশন আজ একই সময় তিনটে খেলা শুরু করছে। দুপুর তিনটেয়।
তিনটে ম্যাচের লাইভ কভারেজ চলবে একসঙ্গে। ইস্টবেঙ্গল ভার্সেস নেরোকা স্টার স্পোর্টস ১-এ। মিনার্ভা-চার্চিল স্টার স্পোর্টস ২-এ। হটস্টার-এ দেখা যাবে মোহনবাগান বনাম গোকুলাম ম্যাচ। উত্তেজনার মাত্রা এতটাই মারাত্মক যে, বঙ্গ ফুটবল, পাঞ্জাব বা মণিপুরের ঘরে ঘরে আজ একটার বদলে এক জোড়া টিভি আর সঙ্গে মোবাইল-ল্যাপটপ যেন মাস্ট! আরে লাল-হলুদ সমর্থককে তো একইসঙ্গে সবুজ-মেরুনের টাটকা স্কোরলাইনেরও প্রতি মুহূর্তে খোঁজ রাখতে হবে। ঠিক যেমন এর উল্টোটাও একদম সত্যি। তেমনি মিনার্ভা পাঞ্জাব সমর্থকরাও কি আর প্রতি মিনিটে কলকাতায় নেরোকা ম্যাচের টাটটা রেজাল্টের খোঁজ নেবে না? কিংবা আই লিগে নবাগত নেরোকার কোনও মণিপুরী সাপোর্টার যে কোঝিকোড়ে মোহনবাগান এগিয়ে না পিছিয়ে তার মুহুর্মুহু খোঁজ করবে সেটা তাকে জিজ্ঞেস না করেই লিখে দেওয়া যায়।
[লক্ষ্মীবারে আই লিগের ক্লাইম্যাক্স, তার আগে টেনশনে ঘুম উড়েছে চার কোচের]
৮ মার্চ, ২০১৮-ভারতীয় ফুটবলে এক অভূতপূর্ব দিন। চারটে দল চ্যাম্পিয়নশিপের লাস্ট ল্যাপে দৌড়চ্ছে। ফটোফিনিশের পরিস্থিতি। আই লিগে এমনটা আগে দেখা যায়ইনি। বিখ্যাত ইউরোপিয়ান লিগগুলোতেও এমন নজির খুঁজে বার করতে দীর্ঘক্ষণ গুগল সার্চের দরকার। প্রিমিয়ার লিগের শেষ দিন ম্যাঞ্চেস্টার ইউনাইটেড, চেলসি, ম্যাঞ্চেস্টার সিটি, লিভারপুলের যে কেউ চ্যাম্পিয়ন হতে পারে- এমন উদাহরণ সম্ভবত নেই। কিংবা লা লিগা চ্যাম্পিয়নশিপের দরজায় একসঙ্গে ধাক্কা মারছে বার্সেলোনা, রিয়াল মাদ্রিদ, আটলেটিকো মাদ্রিদ, ভ্যালেন্সিয়া! উঁহু, চট করে মনে পড়ছে না। সিরি এ খেতাবের লাস্ট ল্যাপে পাশাপাশি দৌড়চ্ছে এসি মিলান, ইন্টার, জুভেন্তাস, নাপোলি-এমন দৃশ্যও বিরল।
ফলে যা হওয়ার তা-ই হচ্ছে।
ফেসবুক-হোয়াটসঅ্যাপের যুগে এখন আর বিশেষ দিনে চিংড়ি-ইলিশের দাম বাড়ে না। তবু আজ ভারতীয় ফুটবলমহল জুড়ে টানটান উত্তেজনা। আই লিগ তো নয়। সাসপেন্স থ্রিলার! চার দলের ৫৬ ফুটবলারের কেউ জানে না আজ কপালে কী আছে? সৌরভ গঙ্গোপাধ্যায় বেশ ক’বার বলেছেন, “আমাদের মতো পেশাদার পারফর্মাররা জানি না সকালে যে মেজাজ নিয়ে ঘুম থেকে উঠেছি, রাতে ঘুমোতে যাওয়ার আগে সেই মেজাজটা থাকবে কি না!” ইস্টবেঙ্গল-মিনার্ভা-মোহনবাগান-নেরোকা ফুটবলারদেরও আজ সেই অবস্থা! কেউ জানে না বৃহস্পতিবার সকালে যে মেজাজ নিয়ে ঘুম থেকে উঠবে, দুপুর তিনটের পর সেই মেজাজে থাকতে পারবে কি না! শুধু কি খেতাবি লড়াইয়ের লাস্ট রাউন্ডে রিংয়ে থাকা চার দলের ফুটবলাররা? ফেডারেশনও বুঝতে পারছে না কী করবে। যুবভারতী, না পঞ্চকুলার স্টেডিয়াম, নাকি কোঝিকোড়ের মাঠ- কোথায় আই লিগের ট্রফি পাঠাবে? ইস্টবেঙ্গল, না মিনার্ভা, নাকি মোহনবাগান ম্যাচ- কোনটায় আজ সশরীরে উপস্থিত থাকবেন ফেডারেশন সচিব কুশল দাস, কিংবা আই লিগের সিইও সুনন্দ ধর। ফোনে দু’জনেরই দ্বিধাগ্রস্ত গলা। “যে স্টেডিয়ামে ট্রফি পাঠাব অন্য ভেনুর অফিশিয়ালরা তখন বলতে পারেন, ফেডারেশন কী করে জানল যে ওখানে খেলা ক্লাবই চ্যাম্পিয়ন হবে!” মিনার্ভা ম্যাচ দেখতে হরিয়ানার মুখ্যমন্ত্রী আমন্ত্রণ জানিয়েছেন ফেডারেশন সচিবকে। কিন্তু এই অবস্থায় সেই আমন্ত্রণেও সাড়া দিলে কোনও বিতর্ক বাঁধবে কি না বুঝে উঠতে পারছেন না শীর্ষ ফেডারেশন কর্তা! বাকি ছিল ম্যাচ গড়াপেটার অভিযোগ। সেটাও নাটকীয় ভাবে ইস্টবেঙ্গলের বিরুদ্ধে তুলে হাওয়া প্রবল গরম করে দিয়েছে মিনার্ভা।
[চ্যাম্পিয়ন হতে মিনার্ভাকে টাকার টোপ, ইস্টবেঙ্গলের বিরুদ্ধে উঠল গড়াপেটার অভিযোগ]
ক্লাবকর্তা থেকে প্রিয় টিমের গোঁড়া সমর্থক- জ্যোতিষীর দ্বারস্থ হওয়াও কারও বাদ পড়ছে না এরকম টানটান টেনশনে। ময়দানের পরিচিত জ্যোতিষী কার্তিক চট্টোপাধ্যায় চার ক্লাবের গ্রহ নক্ষত্র বিচার করে মিনার্ভাকে এগিয়ে রাখছেন। “মিনার্ভার একশোয় নিরানব্বই পার্সেন্ট চ্যাম্পিয়ন হওয়ার সম্ভাবনা। বাকিটুকু ইস্টবেঙ্গলের চান্স। মোহনবাগানের কোনও সুযোগ দেখছি না আমি।” বললেন তিনি। ফুটবলমহলও গোলোকধাঁধায়! অনেক বিখ্যাত প্রাক্তন আবার সাসপেন্স থ্রিলারে পরিণত আই লিগের লাস্ট ল্যাপকে বাংলা বনাম পাঞ্জাবের সেই সত্তর-আশির দশকের মহাযুদ্ধ হিসেবে দেখছেন। চুনী গোস্বামী যেমন বললেন, “কে চ্যাম্পিয়ন হবে বলা সত্যিই মুশকিল। মিনার্ভা জিতে গেলে অন্য কথা। কিন্তু ওরা আটকে গেলে প্রচুর অঙ্ক। অসংখ্য হিসেবনিকেশ। আমি তো গুলিয়ে ফেলছি। তবে মোহনবাগান-ইস্টবেঙ্গলের সঙ্গে একটা সময় যেমন জেসিটির প্রচণ্ড লড়াই হত, সেটা এবার কলকাতার দু’টো বড় দলের সঙ্গে পাঞ্জাবের মিনার্ভার হতে দেখছি। বাংলা বনাম পাঞ্জাবের পুরনো লড়াই ফিরে এলে আখেরে ভারতীয় ফুটবলেরই লাভ।”
উদ্বোধনী জাতীয় লিগ চ্যাম্পিয়ন জেসিটি দলের কোচ সুখবিন্দর সিং বললেন, “চার দলের যে-ই চ্যাম্পিয়ন হোক, তাদের আমার আগাম অভিনন্দন রইল। তবে মিনার্ভা জিতলে বেশি খুশি হব। পাঞ্জাব ফুটবলের জন্যই মিনার্ভার আই লিগ পাওয়াটা দরকার। তা হলে জেসিটির একটা সত্যিকারের বিকল্প টিম হবে পাঞ্জাব ফুটবলে। আর বাংলার মতো পাঞ্জাবের ফুটবল শক্তিশালী হলে ভারতীয় ফুটবলেরই মঙ্গল।” প্রসূন বন্দ্যোপাধ্যায় তো রীতিমতো উত্তেজিত! তাঁদের আমলে টুর্নামেন্টের এমন রোমাঞ্চকর পরিস্থিতি তৈরি হলে যেভাবে বেঙ্গল বা বাগান ভিন রাজ্যের চ্যালেঞ্জকে উড়িয়ে দিত সেটাই ২০১৮-র ৮ মার্চ সাংসদ-ফুটবলার দেখতে চাইছেন ডিকা-আক্রম কিংবা ডুডুদের থেকে। “এরকম অবস্থাতেই তো মোহনবাগান-ইস্টবেঙ্গল বাকিদের বোঝাবে কেন তারা ভারতীয় ফুটবলে দুই চিরশ্রেষ্ঠ দল। সেভেন্টিজে একবার ডুরান্ডে গ্রুপে মোহনবাগান-জেসিটি শেষ ম্যাচের আগে সমান পয়েন্ট। যে কোনও একটা টিম সেমিফাইনাল যাবে। একই দিনে ম্যাচ। পাঞ্জাব পুলিশের সঙ্গে গটআপ করে জেসিটি তিন গোলে জিতল। আমরা মনে মনে বললাম, ও তাই! বলে টাইটানিয়ামকে পাঁচ গোল দিলাম। আকবর হ্যাটট্রিক। বৃহস্পতিবার মোহনবাগান, ইস্টবেঙ্গলের থেকে ঠিক ওইরকম মানসিকতা দেখতে চাই। উড়িয়ে দাও নেরোকা-ফেরোকাকে।” একটানা বলে থামলেন প্রসূন।
এখন দেখার অনেক বছর বাদে বাংলা বনাম পাঞ্জাব, ভারতীয় ফুটবলের শ্রেষ্ঠত্বের চূড়ান্ত লড়াইয়ে শেষ হাসি কে হাসে? ইস্টবেঙ্গল-মোহনবাগানের কেউ? না মিনার্ভা? নাকি সবাইকে টপকে আই লিগ উড়ে যাবে পাহাড়ে। মণিপুরে নেরোকা তাঁবুতে!
The post এমন ফয়সালার মুখে আগে পড়েনি আই লিগ, ফটো ফিনিশের অপেক্ষায় ফুটবলমহল appeared first on Sangbad Pratidin.
