মা কখনও চোখে হারাতেন না তাঁদের। কিন্তু এমনও দিন আসে, যেদিন দীর্ঘশ্বাস নেওয়া ছাড়া আর কিছুই অবশিষ্ট থাকে না। ১৯৮১ সালের কথা। পৃথিবীর মায়া ত্যাগ করে চলে গেলেন তাঁদের মা। যে মানুষটি চোখে হারাতেন না তাঁর সন্তানদের, তাঁকে চিরতরে হারিয়ে ফেললেন সন্তানরাই! সেই যে লড়াই শুরু, তা আর থেমে থাকেনি। বলা হচ্ছে অনামিকা সেনের কথা। যিনি ফিফা মহিলা সহকারী রেফারি হয়েছিলেন। পুরুষদের বিশ্বকাপে (FIFA World Cup 2026) টোরি পেনসোকে দেখে আপ্লুত তিনি।
ইতিমধ্যেই নজির গড়েছেন পেনসো। চেক রিপাবলিক বনাম দক্ষিণ আফ্রিকা ম্যাচে। প্রথম মার্কিন রেফারি হিসাবে পুরুষদের বিশ্বকাপে ম্যাচ পরিচালনার কৃতিত্ব অর্জন করেছেন। একেবারে শক্ত হাতে সামলালেন। কখনও বোঝার উপায় ছিল না, পুরুষদের বিশ্বকাপে এটা তাঁর প্রথম ম্যাচ। এমনকী দুই সহকারী রেফারিও ছিলেন মহিলা। যার নেতৃত্বে ৩৯ বছরের টোরি। পুরুষদের ফিফা বিশ্বকাপের ইতিহাসে দ্বিতীয় মহিলা রেফারি হিসাবে ম্যাচ পরিচালনা করার নজির এখন তাঁর নামে। কেমন লেগেছে গ্রেটেস্ট শো অন আর্থে তাঁর ম্যাচ পরিচালনা? 'সংবাদ প্রতিদিন ডিজিটাল'-কে শুনিয়েছেন রেফারি অনামিকা সেন।
কড়া হাতে ম্যাচ পরিচালনা টোরি পেনসো। ছবি সংগৃহীত।
আজ থেকে ১৫ বছর আগের কথা। কলকাতা লিগে মোহনবাগান বনাম উয়াড়ি ম্যাচে চতুর্থ রেফারির দায়িত্ব সামলেছিলেন অনামিকা। পরবর্তীতে দেশের বিভিন্ন লিগে পুরুষদের ম্যাচ পরিচালনার অভিজ্ঞতা রয়েছে তাঁর। বলছেন, "যখন দেখলাম বিশ্বকাপের ম্যাচে তিনজন মেয়ে পোস্টেড, ভীষণ গর্ববোধ হয়েছে। কারণ মেয়েদের নানান ক্ষেত্রে পিছিয়ে রাখা হয়। তাই বিশ্বকাপ মানের খেলায় মেয়েদের এমন সম্মান দেওয়া হচ্ছে দেখে খুব ভালো লাগছে। টোরি অত্যন্ত দক্ষ হাতে খেলিয়েছে। পেনাল্টি দিতেও পিছপা হননি। আমিও একদিন মোহনবাগান মাঠে খেলিয়েছি। সেদিন কানায় কানায় ভরে উঠেছিল মাঠ। ওই ম্যাচে ব্যারেটোও খেলেছিল। দক্ষিণ আফ্রিকা বনাম চেকিয়া ম্যাচ দেখতে দেখতে অতীতের সেই দিনটার কথা মনে পড়ছিল।"
তিনি আরও বলেন, "ভারতীয় ফেডারেশনেরও উচিত এখান থেকে শেখা। মেয়েদের এগিয়ে দিলে আগামী দিন তাঁদের জন্য সম্ভাবনাময় হয়ে উঠবে। আরও সুযোগ তৈরি হবে। এখন অনেক মেয়ে উঠেছে গোটা দেশে। কর্নাটক, তামিলনাড়ু, গুজরাটের মেয়েরা এগিয়ে আসছে। রচনা কামানি ফিফা রেফারির স্বীকৃতি পেয়েছে। ভারতের দ্বিতীয় মহিলা রেফারি হিসাবে বিরল এই আন্তর্জাতিক সম্মান অর্জন। রচনাই প্রথম ভারতের প্রথম মহিলা রেফারি, যে এএফসি রেফারিস অ্যাকাডেমির অংশ। অনূর্ধ্ব-২০ সাফ উইমেনস চ্যাম্পিয়নশিপের মতো টুর্নামেন্টেও দায়িত্ব সামলেছে ও। কিন্তু আফসোস হল, জঙ্গলমহলের মেয়ে কুসুম মাণ্ডিকে ফিফা ব্যাজ দেওয়া হয়নি বলে। ও কিন্তু এএফসি অ্যাকাডেমির মেয়ে। দারুণ খেলাচ্ছিল। জানি না ওকে ব্যাজ দেওয়া হল না! ২০১১ সাল থেকে রেফারিং শুরু করে। পরবর্তীতে 'খেলো ইন্ডিয়া ইউনিভার্সিটি গেমস' ও জাতীয় পর্যায়ের একাধিক গেমসে সফলভাবে ম্যাচ পরিচালনা করেছে। রাজনীতির জন্যই ডুবছে বাংলার ফুটবল। আমরাও ক্রমশ পিছিয়ে পড়ছি। এর ঊর্ধ্বে উঠে কাজ করতে হবে সকলকে। তাহলেই ভবিষ্যতে আলো জ্বলে উঠবে।"
অনামিকা সেনের বাড়ি বেহালায়। একদিন পাড়ার বকুলতলার দত্তের মাঠে দেখেছিলেন ছেলেমেয়েরা অ্যাথলেটিক্স প্র্যাকটিস করছে। তারা ফার্স্ট ডিভিশন মিট-এ যাবে। তখন মোহনবাগান, এরিয়ান্স, ইস্টবেঙ্গলের অ্যাথলেটিক্স মিট হত। তাদের দলে ভিড়ে মনের আনন্দে তাল মিলিয়েছিলেন অনামিকাও। অদ্ভুতভাবে, এই মিট-এ অংশ নিয়ে প্রাইজও পান। তারপরেই ধীরে ধীরে ফুটবল, হ্যান্ডবল ইত্যাদি খেলা শুরু। সকালে মাঠে খেলতেন। তারপর স্কুল করে ফিরে আবার ছুটতেন মাঠে। পড়াশোনা ও খেলাধুলা, দুই-ই ছিল পরিপূরক। বুঝেছিলেন, একমাত্র খেলার মাঠই পেটে ভাত জোগাতে পারে। আর এই কাজটি সফল করবার জন্য সমান দক্ষতায় পড়াশোনাটাও জরুরি। যদিও ‘মেয়েছেলে’ হয়ে খেলাধুলা করায় পাড়া-প্রতিবেশীর অনেক শ্লেষও শুনতে হয়েছিল। ‘মা-মরা মেয়ে বখে যাচ্ছে’ - অসংখ্য শ্লেষের মধ্যে এটা ছিল ভদ্রভাষার ‘আদর’। দমে যাননি। পরে যখন ফুটবল, হ্যান্ডবল আর হকিতে ন্যাশনাল খেলা শুরু করলেন, যখন কাগজে ছবি ছাপল, সবাই বুঝল, এতদিন ধরে তিনি কী করেছেন। শুনতে শুনতে সেই মাকড়সার গল্পটার কথা মনে পড়ছিল। জীবনে সফল হতে গেলে অধ্যবসায়ের কোনও বিকল্প নেই। এমনটা কিন্তু লেখক উপলব্ধি করেছিলেন মাকড়সার জাল বোনা দেখে। জাল বুনতে গিয়ে মাকড়সাটি মাঝেমাঝেই যেমন পড়ে গিয়ে ফের উঠছিল, তেমনই জীবন অনামিকা সেনের। তাঁর কথায়, "এতটা পথ একলাই লড়াই করেছি। হেরেছি। আবার ফিরে এসে লড়াই করেছি। ওঠা-নামাকে ভালোবাসতে হয়। একে অতিক্রম করতে হয়। নাহলে বেঁচে থাকায় আনন্দ নেই। কিন্তু আমার জীবনে সরলতা ছিল না। একসময় তো বুঝে উঠতে পারছিলাম না, কী করব, কোথায় যাব! শান্তিদির (শান্তি মল্লিক) সঙ্গে আলাপ হল। তিনি আমার পথপ্রদর্শক। আমার সিনিয়র ফুটবলার ছিলেন শান্তিদি। একদিন ওনার সঙ্গে আলোচনা করছিলাম আমার ভবিষ্যতের বিষয়ে। সেখান থেকেই জানতে পারলাম, ফিফা রেফারি প্রদীপ নাগ মহিলা রেফারিদের নিয়ে ট্রেনিং ক্লাস শুরু করবেন। শান্তিদির পরামর্শে প্রদীপদার কাছে ফুটবলের আইন নিয়ে ক্লাস শুরু করলাম। বাবার অমত ছিল। ‘হ্যাকেল্ড’ হওয়ার ভয়ে আমাকে পিছিয়ে আসতে বলেছিলেন তিনি। কিন্তু নিয়মিত ক্লাসগুলো অ্যাটেন্ড করতে থাকি আমি। আর এতটাই আগ্রহ পেয়ে যাই যে, ক্লাস ছাড়া অন্যকিছু ভাবতেই পারতাম না। প্রদীপদাও খুব উৎসাহ দিতেন। কিন্তু এসবের মধ্যে আবারও অঘটন। ২৩ অক্টোবর, ১৯৯৩-এ বাবা মারা গেলেন!"
অনামিকা সেন। ফাইল ছবি।
সেই বছরই নভেম্বরে কলকাতায় মেয়েদের লিগ শুরু হয়। প্রখ্যাত রেফারি প্রদীপ নাগ ভেবেই রেখেছিলেন, সেখানে মেয়েদের দিয়েই রেফারিং করাবেন। তাঁর হাতে অনামিকা সেন-সহ ন’জন মেয়ে তৈরি হয়েছিলেন। সেই প্রথম অফিসিয়াল আইএফএ-র লিগ শুরু হয় রবীন্দ্র সরোবর স্টেডিয়ামে। এরপর এআইএফএফের আন্ডারে ভারতীয় মহিলা ফুটবল ফিফা স্বীকৃতি পেল। রঞ্জিত গুপ্ত এবং এবং মন্টু ঘোষ ছিলেন তৎকালীন আইএফএফ সেক্রেটরি। তাঁরা তো অনামিকা সেনদের রেফারিং দেখে অবাক! এরপরেই ছড়িয়ে পড়ল তাঁদের জনপ্রিয়তা। সেই শুরু, এরপর আর পিছনে তাকাতে হয়নি। এহেন অনামিকা গর্বিত মার্কিন রেফারি টোরি পেনসোকে দেখে। জানালেন, পুরুষদের বিশ্বকাপে প্রথম মহিলা রেফারির নাম ফ্রান্সের স্টেফানি ফ্রাপার্ট। ২০২২ কাতার বিশ্বকাপে ইতিহাস গড়েছিলেন। এবার সেই তালিকায় যুক্ত হল পেনসোর নাম। ২০২৩ সালে মহিলা বিশ্বকাপ ফাইনালে স্পেন ও ইংল্যান্ডের ম্যাচ পরিচালনা করেছিলেন তিনি। ২০২৩ ও ২০২৫ ফিফা ক্লাব বিশ্বকাপেও দেখা গিয়েছে তাঁকে। ২০২১ বিশ্বকাপ বাছাইপর্ব এবং অনূর্ধ্ব-২০ মহিলা বিশ্বকাপেও দায়িত্ব সামলেছেন। এমএলএস, এনডব্লিউএসএল, ইউএসএল চ্যাম্পিয়নশিপে নিয়মিত রেফারিংয়ের দায়িত্ব পালন করেন।
টোরি পেনসোর সহকারী ছিলেন ব্রুক মেয়ো ও ক্যাথরিন নেসবিট। তিনজনেই আমেরিকার। নজির হল বিশ্বকাপের মঞ্চে পুরুষদের কোনও ম্যাচে প্রথমবারের মতো অল-ফিমেল ম্যাচ অফিশিয়াল দল হিসাবে তাঁরা এই দায়িত্ব পালন করেন। এই কারণেই ফুটবল নিছক ফুটবল নয়। এই কারণেই বিশ্বকাপ নিয়ে হাজারো রূপকথার জন্ম হয়। তেমনই কোনও রূপকথা একে মনে হতে পারে ডেভিস গুগেনহেইম পরিচালিত 'গ্রেসি'র কথা। ’৭৮-এর আমেরিকার পটভূমিতে তৈরি। ছবির প্রধান চরিত্র গ্রেসি নামের এক ১৫ বছরের কিশোরী। ভাইয়ের মৃত্যুশোককে শক্তিতে পরিণত করে। ধূসর হয়ে যাওয়া সময়ে হাই স্কুলের ছেলেদের ফুটবল দলে সুযোগ পাওয়ার জন্য সমাজের স্টিরিওটাইপ ধারণার বিরুদ্ধে তাঁর লড়াই মনে রাখার মতো। আর চেকিয়া-দক্ষিণ আফ্রিকা ম্যাচে মহিলা রেফারিরাই কেন্দ্রীয় চরিত্র। অনামিকার গল্পও অনেকটা তেমনই। মায়ের মৃত্যুকে শক্তিতে পরিণত করেছিলেন। কে বলে ফুটবল কেবল পুরুষালি খেলা? বিশ্বকাপের দিকে তাকান। ৯০ মিনিট পুরুষ ফুটবলারদের সঙ্গে সমান তালে দৌড়লেন টোরি পেনসোরাও। ফুটবলারদের শাসনও করলেন। সংসার ও তিন সন্তানের মা হওয়ার দায়িত্ব সামলে শীর্ষে পৌঁছেছেন পেনসো। তবে ‘সবথেকে উঁচু ফ্ল্যাট বাড়ি’টা ছোঁয়ার স্বপ্ন দেখা শুরু হয়েছিল মাত্র ১৪ বছর বয়সে। ফ্লোরিডায় অতিরিক্ত আয়ের জন্য শুরু করেছিলেন রেফারিং। কে জানত, সেটাই একদিন এভাবে মহীরুহ হয়ে যাবে।
