এ লেখার শিরোনাম হতে পারত রবি ঠাকুরের গান দিয়ে। ‘তোমার হল শুরু আমার হল সারা...’। কিংবা ‘ঈশ্বর’ বনাম ‘ঈশ্বরের বরপুত্রে’র দ্বৈরথ নিয়ে। কিন্তু সেই সব অ আ ক খ ছেড়ে মনে পড়ছে জুলিয়াস সিজার। গ্যালিক যুদ্ধের সময় যিনি তাঁর সেনাবাহিনীর মনোবল ভেঙে পড়তে দেখেছিলেন। সিজারের বীরপুঙ্গবরা একটা সময় ভবিষ্যতের অজানা বিপদ নিয়ে আশঙ্কায় ছিলেন। শত্রুর অচেনা কৌশল কেমন হবে, তা নিয়ে দুরুদুরু বুকে দিন কাটাতেন তাঁরা। সিজার তাঁদের বোঝান। যে বিপদ আসেনি, তা নিয়ে চিন্তা কেন? এতে আত্মবিশ্বাস কমে যায়। বরং সামনে যা আছে, তার মোকাবিলা করো। এই মানসিক দৃঢ়তাই শেষ পর্যন্ত টানা আট বছরের রক্তক্ষয়ী গ্যালিক যুদ্ধে জয় এনে দেয়। এই গল্প কি জানা মুনির নাসরাউই এবং শিলা এবানা গিনির? ধরে নেওয়া যাক, এর উত্তর ‘হ্যাঁ’। নাহলে ভবিষ্যতের অজানা বিপদ তাঁদের গ্রাস করতই। আর হারকে ভয় পাওয়া মানে তো একপ্রকার ভয়ই। হয়তো সিজারের জীবন থেকে উদ্বুদ্ধ হয়েছিলেন তাঁরা। যে দু‘জনের নাম বলা হল, তাঁরা পরিচয়ে ইয়ামালের বাবা-মা। বিশ্বফুটবলে ইয়ামালের তারকা হয়ে ওঠার নেপথ্যে এই দু’জন। তাঁদের অবদান না থাকলে, হয়তো বিশ্বের কোটি কোটি দরিদ্র শিশুর মতো ইয়ামালের স্বপ্নও অকালে ঝরে যেত। ফুটবলার হওয়ার স্বপ্ন হয়তো বাস্তবের মুখই দেখত না। তাঁদের অবদানেই বছর উনিশের ইয়ামালের (Lamine Yamal) প্রথম বিশ্বজয়। কিন্তু এই যাত্রায় ছিলেন আরও দুই অজ্ঞাতনামা।
অথচ আজও প্রচারের আলো থেকে বহু যোজন দূরে তাঁরা। ইয়ামালের পুরো নাম লামিনে ইয়ামাল নাসরাউই এবানা। স্পেনের নামকরণের রীতি অনুযায়ী, একজন সন্তানের নামের শেষের দু’টি অংশ আসে বাবা ও মায়ের পদবি থেকে। সেই সূত্রেই ‘নাসরাউই’ এসেছে তাঁর বাবার পরিবার থেকে, আর ‘এবানা’ মায়ের বংশপরিচয়ের স্মারক। নামের প্রথম অংশেও লুকিয়ে বিশেষ তাৎপর্য। ‘লামিনে’ শব্দটির উৎস আরবি ‘আল-আমিন’, যার অর্থ ‘সৎ’ বা ‘বিশ্বস্ত’। আর ‘ইয়ামাল’ এসেছে আরবি ‘জামাল’ শব্দের রূপান্তর থেকে, যার অর্থ ‘সৌন্দর্য’ বা ‘সুন্দর’। তাঁর বাবা মুনির নাসরাউই মরক্কোর এবং মা শিলা এবানা গিনির মানুষ। ইয়ামালের জন্মের সময় মা-বাবা দু’জনেই চরম আর্থিক সমস্যায়। সংসার চালাতেই হিমশিম অবস্থা। এর মধ্যে প্রথম সন্তানের জন্ম তাঁদের উদ্বেগ আরও বাড়িয়ে দেয়। ঠিক সেই সময় পাশে দাঁড়ান দুই ঘনিষ্ঠ বন্ধু– লামিনে ও ইয়ামাল। আর্থিকভাবে সাহায্য করেন। মানসিক ভরসাও জোগান। তাঁদের অবদানকে স্বীকৃতি দিতেই বাবা-মা তাঁদের প্রথম সন্তানের নাম রাখেন দুই বন্ধুর নাম মিলিয়ে ‘লামিনে ইয়ামাল’।
এর পর থেকেই রূপকথার মতো বদলে যায় খুদে তারকার জীবন। জন্মের পাঁচ মাস পরই লিওনেল মেসির কোলে ওঠেন। যে ছবি ক’দিন ধরেই ভাইরাল। কিন্তু জীবন মাঝেমাঝেই বড় বিষম! ছোটবেলাতেই লামিন ইয়ামালের বাবা-মায়ের বিচ্ছেদ হয়। মায়ের সঙ্গে বড় হলেও ফুটবলের প্রতি ভালোবাসার বীজ বুনে দিয়েছিলেন তাঁর বাবা মুনির। তবে চরম আর্থিক সংকটের কারণে ছেলের জন্য এক জোড়া ফুটবল বুটও কিনতে পারেননি তিনি। দিনমজুরের কাজ করা মুনির এক স্থানীয় জুতো ব্যবসায়ীর কাছে অনুরোধ করে ধার হিসাবে বুট এনে দিয়েছিলেন। বলেছিলেন, একদিন তাঁর ছেলে বড় হয়ে সেই টাকা শোধ করে দেবে। আজ এমন পরিস্থিতি, ইয়ামাল চাইলে সেই জুতো কোম্পানিই কিনে নেওয়ার সামর্থ্য রাখেন। তবু বাবার সেই ত্যাগ তিনি কখনও ভোলেননি। প্রায় সব সফরেই বাবাকে সঙ্গে রাখতেন। কিন্তু বিশ্বকাপে বাবাকে দেখা না যাওয়ায় প্রশ্ন ওঠে। পরে ইয়ামাল জানান, শারীরিক অসুস্থতার কারণে তাঁর বাবা আমেরিকা এসে এক শহর থেকে আরেক শহরে ভ্রমণ করতে পারেননি। ১২ বছর বয়সে বার্সেলোনার বিখ্যাত লা মাসিয়া অ্যাকাডেমিতে যোগ দেওয়া এই তারকা এরপর ধীরে ধীরে বিশ্বের অন্যতম জনপ্রিয় তরুণ ফুটবলার হয়ে ওঠেন। কিন্তু এত সাফল্যের পরও শিকড়কে ভুলে যাননি। তাঁর হাতের একটি আঙুলে লেখা ‘৩০৪’। যা তাঁর শৈশবের এলাকা রোকাফোন্দার পোস্টকোডের শেষ তিনটি সংখ্যা। গোল করলেও এই সংখ্যাটা দেখাতে কার্পণ্য করেন না। পূতিগন্ধময় কলোনির পথ পেরিয়ে সহস্র ওয়াটের আলোর রোশনাই এখন তাঁর গায়ে পড়ছে। হামেশাই। এতে ইয়ামাল যতটা আলোকিত হচ্ছেন, তার থেকে বেশি প্রদীপ্ত বার্সেলোনা থেকে প্রায় ৪০ কিলোমিটার দূরের মাতারে শহরের অভিবাসী কলোনি রোকাফন্ডা।
সেই মহল্লায় আজ ইয়ামালের ছবি দিয়ে পোস্টার পড়েছে। হারজিত সেখানে গৌণ। ফুটবল নামক ‘মহাগোলকে’ই হয়তো একমাত্র কোনও ধাঁধা নেই। ফুটবলই যে সীমানা ভাঙার উচ্ছ্বাস দেখিয়ে এসেছে, বারবার– সদর্পে। রোকাফোন্দার ছোট্ট মাঠে প্রতিদিনের মতো আবারও ফুটবল গড়াবে। একটু দূরে বেঞ্চে বসে সেই খেলা দেখতে দেখতে স্মৃতিমেদুর হয়ে উঠবেন ইয়ামালের দিদা ফাতিমা নাসরাউই আর তাঁর ১৫ বছরের কাকাতো ভাই রায়ান। গর্বে তাঁদেরও চোখ চিকচিক করে উঠবে। পুরনো সেই দিনের কথা মনে পড়ে যাচ্ছে তাঁদের। পোস্টকোডের শেষ তিনটি সংখ্যা আজও প্রজ্বলিত। সীমানা ভাঙার বিশ্বকাপে এটুকু আনন্দ সইতে গেলেও মনের জোর প্রবল থাকা চাই। অভিবাসী ইয়ামালের অভিভাবক হওয়াও চাট্টিখানি কথা নয় যে। ‘You may say I'm a dreamer, but I'm not the only one. I hope someday you'll join us. And the world will live as one.’ জন লেননের এই কথার বাংলা করলে দাঁড়ায়, তুমি বলতে পারো, আমি স্বপ্নদর্শী। কিন্তু আমি একা নই। আশা করি, একদিন তুমিও আমাদের সঙ্গে যোগ দেবে। আর তখন পুরো পৃথিবী এক হয়ে বাঁচবে। হয়তো আমি আপনি যে সময়টা নষ্ট করতে উপভোগ করি, তা নষ্ট করা সময় নয়। এই দর্শন থেকেই হয়তো ফুটবলকে ভালোবেসেছেন ইয়ামাল। বিশ্বকাপেও মাথায় ‘রোকাফোন্দা’ লেখা হেডব্যান্ড শোভা পেয়েছে। আর বুটে বাবা-মায়ের জন্মভূমির পতাকা পরে মাঠে নেমেছেন। এভাবেই নিজের বেড়ে ওঠাকে আপন সত্যে সর্বত্র নিয়ে সেলিব্রেট করেন ইয়ামাল। তাঁর বিশ্বাস, ভিন্ন দেশ, ভিন্ন ভাষা আর ভিন্ন সংস্কৃতির মানুষকে একসঙ্গে বেঁধে রাখার সবচেয়ে সুন্দর সেতু এই ফুটবল। যা দুঃখ কিংবা হর্ষ হেতু ফলাফলকে ডিঙিয়ে কাঁটাতার ভেঙে দেয় এক লহমায়। বিশ্বজয়ী ইয়ামাল, আপনার দুস্তর গমন পথের জীবনেতিহাস চিরপ্রণম্য।
