‘এস্তয় লিস্তো, ভামোস আর্জেন্টিনা।’ অর্থাৎ ‘আমি তৈরি। এগিয়ে চলো আর্জেন্টিনা।’ ২০২২ বিশ্বকাপ ফাইনালে নামার ঠিক আগে সোশাল মিডিয়ায় এমনটাই জানিয়েছিলেন লিওনেল মেসি। বরাবরই তিনি এভাবে নিজেকে তৈরি রেখে লড়তে নামেন। চূড়ান্ত লড়াইয়ের আগে মাথাটাকে ডিপ ফ্রিজ বানিয়ে রাখাই তাঁর আসল গেমপ্ল্যান। আমাদের জানা নেই, এবারের ফাইনালে (FIFA World Cup 2026 Final) স্পেনের বিরুদ্ধে নামার আগে ডিপ ফ্রিজে রাখা সেই মগজে কোন নীল নকশা ছিল! এতদূরে এসেও থেমে যেতে হল তাঁদের। তবে পরপর দু'বার বিশ্বজয় না হলেও এলএম১০ কি অনেক আগেই চিরবিজয়ী হয়ে যাননি? এবারের বিশ্বকাপ কখনওই তাঁর কাছে নতুন কিছু প্রমাণের মঞ্চ ছিল না।
কবে শুরু হয়েছিল তাঁর যুদ্ধ? তখন বয়স মাত্র ১৩। আর্জেন্টিনা ছেড়েছেন। ততদিনে সকলেই বুঝতে পেরেছেন ঠিকমতো প্রশিক্ষণ পেলে এই ছেলে অনেক দূর যাবে। কিন্তু এত প্রতিভা সত্ত্বেও তাঁর শারীরিক বৃদ্ধি ততটা হচ্ছিল না। আর তাই নিয়মিত বৃদ্ধির হরমোন ইনজেক্ট করাতে হচ্ছিল শরীরে। এফসি বার্সেলোনা সেই খরচ বহন করেছিল। এরপর ২০০৫ সালের মধ্যে বার্সার প্রথম দলে ঢুকে পড়েন। আর অনূর্ধ্ব ২০ বিশ্বকাপে দেশকে কাপ এনে দিয়ে হয়ে ওঠেন জাতীয় তারকা। সেই শুরু। সেই থেকেই প্রত্যাশার পারদ তাঁকে ঘিরে আকাশ ছুঁয়েছে। কিন্তু সেই প্রত্যাশাকে চাপ হয়ে উঠতে দেননি মেসি। বরং সেটাকেই উদ্দীপনার অস্ত্র করে দ্রুত পেরতে থাকেন একের পর এক মাইলফলক। মাত্র কয়েক বছর- বলা যায় ২০১১ সালের মধ্যেই তিনি বিশ্বের সর্বকালের সেরা ফুটবলারদের সরু গলির বাসিন্দা। মারাদোনা-পেলের সঙ্গে তুলনীয়। খোদ মারাদোনাও স্বীকৃতি দিয়েছিলেন স্বদেশীয় এই জিনিয়াসকে।
মেসির দল হেরেছে হয়তো। কিন্তু এলএম১০ কি অনেক আগেই চিরবিজয়ী হয়ে যাননি? এবারের বিশ্বকাপ কখনওই তাঁর কাছে নতুন কিছু প্রমাণের মঞ্চ ছিল না।
যদিও তখনও প্রমাণ করার অনেক কিছুই ছিল। আসলে একটা বড়সড় প্রশ্নচিহ্ন ঝুলেই ছিল বহুদিন। সেটা বিশ্বকাপ না জেতাতে পারার জন্য নয়। সেটা ‘দেশভক্তি’ সংক্রান্ত সংশয়। বিশ্বের ধনীতম ক্লাবে খেলেছেন। কিন্তু স্বদেশীয় ক্লাবে খেলেননি। এমনকী, খেলা শুরুর আগে জাতীয় সঙ্গীতও নাকি গাইতে দেখা যায় না তাঁকে! এমন গুরুতর অভিযোগও রয়েছে। কেউ ভেবেও দেখেনি, এমন অভিযোগে বিদ্ধ হয়ে কতটা কষ্ট পেয়েছেন মেসি (Lionel Messi)। ক্লাবের হয়ে যতটা মনোযোগী, ততটা দেশের জন্য নন- এই অপবাদ ডোডোপাখির মতোই বিলুপ্ত হয়ে গিয়েছে গত বিশ্বকাপে।
মেসি এখন ৩৯। কেরিয়ারের শুরুতে তাঁর বিস্ময়কর গতি চোখ ধাঁধিয়ে দিত। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে গতি কমবেই। স্বাভাবিকতাকে মেনে নিয়ে মেসি নিজেকে ক্রমশ সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বদলে নিয়েছেন। শরীরের ভারসাম্য, পেশিশক্তি, ফ্লেক্সিবিলিটি বা নমনীয়তা এবং নিখুঁত মুভমেন্টের উপর জোর দিয়েছেন। পাশাপাশি খাওয়াদাওয়ায় কড়াকড়ি, সঠিক অনুশীলনের মধ্যে দিয়ে বয়সকে তুড়ি মেরে মাঠের ভিতরে এক হালকা পালকের মতো ভেসে বেড়ানোর অবিশ্বাস্য জাদু। যেন বল তাঁর পোষ্য।
মেসি এখন ৩৯। কেরিয়ারের শুরুতে তাঁর বিস্ময়কর গতি চোখ ধাঁধিয়ে দিত। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে গতি কমবেই। স্বাভাবিকতাকে মেনে নিয়ে মেসি নিজেকে ক্রমশ সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বদলে নিয়েছেন।
ফাইনালে মেসি। ফাইল ছবি।
অনেকেরই ধারণা ছিল, মেসি আর পরের বিশ্বকাপ পর্যন্ত টানবেন না। তার আগেই যতিচিহ্ন টানবেন এক মহৎ কেরিয়ারের। কিন্তু 'হরিপদ কেরানি'র মতো করে পিএফ-গ্র্যাচুইটির নিশ্চিত জীবন চান না চ্যাম্পিয়নরা। তাছাড়া ফুটবল মাঠে নেমে পড়াটা মেসির কাছে কোনও 'দায়' নয়। পাখির কাছে আকাশের বুকে ভেসে যাওয়া কি কোনও 'ডিউটি'? এবারের বিশ্বকাপে মেসি সত্যিই নেমেছিলেন মুক্ত বিহঙ্গের মতো। গতবার প্রথম ম্যাচে সৌদি আরবের সঙ্গে হারতে হয়েছিল। শুরুতে মেসি (Lionel Messi) গোল করলেও দ্বিতীয়ার্ধের খেলা শুরু হওয়ার পরে মাত্র পাঁচ মিনিটে জোড়া গোল খেতে হয়েছিল। এবারের শুরুটা ছিল স্বপ্নের মতো। প্রথম ম্যাচেই হ্যাটট্রিক। পরেরটাতেও জোড়া গোল। গ্রুপ লিগের শেষ ম্যাচে মাঠে নামলেন ৬০ মিনিটে। কিন্তু মাত্র কুড়ি মিনিটের মধ্যেই ফ্রি কিকের সেই অনবদ্য গোল। এই পারফরম্যান্স বুঝিয়ে দিচ্ছিল মেসি রয়েছেন এক আশ্চর্য মৌতাতে। প্রথম তিন ম্যাচে প্রতিপক্ষকে উড়িয়ে দেওয়ার পর শুরু হয় আসল লড়াই। 'দুর্বল' কেপ ভার্দে কিন্তু চমৎকার লড়েছিল। শেষপর্যন্ত 'পচা শামুকে পা কাটতে কাটতে' কাটেনি। নেপথ্যে মেসির 'মিডাস টাচ'কে অস্বীকার করা যাবে না। মিশর ম্যাচে ২-০ গোলে হারতে হচ্ছিল। বারো মিনিটে তিনটে গোল শোধ করে শেষ আটে পৌঁছন মেসিরা। এই তিন গোলের মধ্যে একটা গোল মেসির। এরপর সুইজারল্যান্ডে ম্যাচেও তাঁর অ্যাসিস্ট থেকেই গোল। বোতলবন্দি করার সব প্রয়াস ব্যর্থ হয়। আর সেমিতে ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধেও তাঁরই অ্য়াসিস্টে খেলা বের করে নেয় আর্জেন্টিনা। অথচ ফাইনালে হল না। ১২০ মিনিটের লড়াইয়ের দীর্ঘক্ষণ খেলতে হল ৩০ মিনিটে। স্প্যানিশ পাসিংয়ের জাঁতাকলে যেমন গোটা আর্জেন্টিনা দল আটকে গেল, তেমনই আটকে গেলেন তিনিইও।
বলা যায় 'ওয়ান ব্যাড ডে ইন অফিস'। কিন্তু এই একটা খারাপ দিন মুছে যাবে অচিরেই। আর্জেন্টিনার সমর্থকদের চোখের জল নিশ্চয়ই শুকিয়ে যাবে। বিশ্বচ্যাম্পিয়ন তকমা ধরে রাখা না গেলেও মারাদোনা-মেসির দেশ ফুটবলের নক্ষত্রই থেকে যাবে। আর মেসি থেকে যাবেন চিরবিজয়ী হয়েই। আকাশ ছুঁয়ে ফেলার পর আর কি কিছু ছোঁয়ার থাকে! অনন্তের মালিকানা থেকে যাবে মেসির নামেই। একটা বিশ্বকাপের বিদায়ী মুহূর্ত সেই গৌরবে আঁচড়ও কাড়তে পারবে না।
