হার্ট অ্যাটাকের পর প্রথম ১০ মিনিট। সময়টা খুবই কম। কিন্তু এই কয়েক মিনিটই ঠিক করে দিতে পারে একজন মানুষ দ্রুত সুস্থ হয়ে উঠবেন, নাকি তাঁর হৃদযন্ত্র স্থায়ীভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে। তাই হৃদরোগ বিশেষজ্ঞদের কাছে একটি কথাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, ‘টাইম ইজ মাসল’। অর্থাৎ, যত বেশি সময় হৃদ্যন্ত্রে রক্ত চলাচল বন্ধ থাকবে, তত বেশি হৃদপেশি নষ্ট হতে থাকবে।
হৃদরোগ বিশেষজ্ঞদের কথায়, হার্ট অ্যাটাকের লক্ষণ দ্রুত চিনে হাসপাতালে পৌঁছানোর আগেই সঠিক পদক্ষেপ নিতে পারলে মৃত্যুঝুঁকি যেমন কমে, তেমনই হৃদ্যন্ত্রের ক্ষতিও অনেকাংশে এড়ানো সম্ভব।
কেন এত গুরুত্বপূর্ণ প্রথম ১০ মিনিট?
হার্ট অ্যাটাকের সময় হৃদযন্ত্রে রক্ত পৌঁছে দেয় যে করোনারি ধমনিগুলি, তার কোনও একটি হঠাৎ বন্ধ হয়ে যায়। ফলে অক্সিজেনের অভাবে হৃদপেশি ক্ষতিগ্রস্ত হতে শুরু করে। এই ক্ষতি যত দীর্ঘস্থায়ী হয়, ততই জটিলতা বাড়ে।
তাই যত দ্রুত রক্তপ্রবাহ স্বাভাবিক করা যায়, তত বেশি হৃদপেশি বাঁচানো সম্ভব। এর জন্য দরকার দ্রুত অ্যাঞ্জিওপ্লাস্টির মাধ্যমে বন্ধ ধমনি খুলে দেওয়া। কিন্তু এই চিকিৎসার সাফল্য অনেকটাই নির্ভর করে রোগী কত দ্রুত হাসপাতালে পৌঁছাতে পারছেন তার উপর।
উপসর্গ অবহেলা নয়। ছবি: সংগৃহীত
হার্ট অ্যাটাকের লক্ষণ সব সময় একই রকম নয়
বেশিরভাগ মানুষ মনে করেন, তীব্র বুকব্যথাই হার্ট অ্যাটাকের একমাত্র লক্ষণ। বাস্তবে বিষয়টি তেমন নয়। অনেকের ক্ষেত্রে বুকের মাঝখানে চাপ বা চাপ ধরার অনুভূতি দিয়ে শুরু হয়। সেই অস্বস্তি এক বা দু-হাত, কাঁধ, ঘাড়, চোয়াল বা পিঠেও ছড়িয়ে পড়তে পারে। এর সঙ্গে শ্বাসকষ্ট, অতিরিক্ত ঘাম, বমি বমি ভাব, মাথা ঘোরা বা হঠাৎ অকারণ অস্বস্তিও দেখা দিতে পারে।
বিশেষ করে মহিলা, প্রবীণ এবং ডায়াবেটিসে আক্রান্ত ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে লক্ষণ আরও অস্পষ্ট হতে পারে। অস্বাভাবিক ক্লান্তি, বদহজমের মতো অস্বস্তি, পিঠ বা চোয়ালে ব্যথা, এমনকী সামান্য বুকের অস্বস্তিও হার্ট অ্যাটাকের ইঙ্গিত হতে পারে। অনেকেই এগুলোকে গ্যাস, অম্বল বা অতিরিক্ত ক্লান্তি ভেবে এড়িয়ে যান। আর সেই ভুলেই মূল্যবান সময় নষ্ট হয়ে যায়।
হার্ট অ্যাটাক সন্দেহ হলে কী করবেন?
লক্ষণ দেখা দিলে অপেক্ষা করবেন না। যত দ্রুত সম্ভব অ্যাম্বুল্যান্স ডাকুন বা জরুরি চিকিৎসা পরিষেবার সঙ্গে যোগাযোগ করুন। রোগীকে আধশোয়া অবস্থায় বসিয়ে শান্ত রাখুন এবং টাইট পোশাক ঢিলে করে দিন, যাতে শ্বাস নিতে সুবিধা হয়।
যাঁদের চিকিৎসক আগে থেকেই নাইট্রোগ্লিসারিন ব্যবহারের পরামর্শ দিয়েছেন, শুধু তাঁরাই ওষুধটি ব্যবহার করবেন। একইভাবে রোগীর অ্যাসপিরিনে অ্যালার্জি বা অতিরিক্ত রক্তক্ষরণের ইতিহাস না থাকলে এবং তিনি সচেতন থাকলে একটি সাধারণ অ্যাসপিরিন চিবিয়ে খাওয়ানো যেতে পারে। তবে মনে রাখতে হবে, অ্যাসপিরিন খাওয়ানোর জন্য কখনও অ্যাম্বুল্যান্স ডাকতে দেরি করা যাবে না।
সিপিআর বাঁচায় প্রাণ। ছবি: সংগৃহীত
হার্ট অ্যাটাক আর কার্ডিয়াক অ্যারেস্ট এক নয়
অনেকেই এই দুই অবস্থাকে গুলিয়ে ফেলেন। অথচ দুটির মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য রয়েছে। হার্ট অ্যাটাকের সময় হৃদযন্ত্রে রক্তপ্রবাহ বাধাপ্রাপ্ত হলেও রোগী সাধারণত সচেতন থাকেন এবং কথা বলতে পারেন। কিন্তু কার্ডিয়াক অ্যারেস্টে হৃদযন্ত্র হঠাৎ স্পন্দন বন্ধ করে দেয়। রোগী অজ্ঞান হয়ে যান, কোনও সাড়া দেন না এবং শ্বাসপ্রশ্বাসও বন্ধ হয়ে যেতে পারে।
এমন পরিস্থিতিতে এক মুহূর্ত দেরি না করে অ্যাম্বুল্যান্স ডাকতে হবে। সিপিআর জানা থাকলে তা শুরু করতে হবে এবং আশপাশে অটোমেটেড এক্সটার্নাল ডিফিব্রিলেটর (এইডি) থাকলে যত দ্রুত সম্ভব ব্যবহার করতে হবে।
সবচেয়ে বড় ভুল, নিজে গাড়ি চালিয়ে হাসপাতালে যাওয়া
অনেকেই ভাবেন, অ্যাম্বুল্যান্সের জন্য অপেক্ষা না করে নিজেই গাড়ি চালিয়ে হাসপাতালে চলে গেলে সময় বাঁচবে। কিন্তু চিকিৎসকদের মতে, এটাই সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ সিদ্ধান্তগুলির একটি। কারণ, পথেই রোগীর অবস্থা হঠাৎ খারাপ হতে পারে। অ্যাম্বুল্যান্সে থাকা প্রশিক্ষিত স্বাস্থ্যকর্মীরা প্রয়োজনীয় প্রাথমিক চিকিৎসা শুরু করতে পারেন এবং হাসপাতালে আগেই খবর পৌঁছে দেন। ফলে রোগী পৌঁছানোর সঙ্গে সঙ্গেই চিকিৎসা শুরু করা সম্ভব হয়।
জরুরি দ্রুত অ্যাঞ্জিওপ্লাস্টি। ছবি: সংগৃহীত
যে ভুলগুলো প্রাণঘাতী হতে পারে
হার্ট অ্যাটাকের সময় অনেকেই জল, কফি বা লেবুর রস খাওয়ানো, ঘরোয়া টোটকার আশ্রয় নেওয়া, ব্যথা কমবে ভেবে হাঁটাচলা করা, জোরে জোরে কাশি বা কিছুক্ষণ অপেক্ষা করে দেখার মতো ভুল করেন। চিকিৎসকদের মতে, এগুলোর কোনওটিই হার্ট অ্যাটাকের চিকিৎসা নয়। বরং এগুলো মূল্যবান সময় নষ্ট করে এবং হৃদযন্ত্রের ক্ষতি আরও বাড়িয়ে দিতে পারে।
প্রতিটি মিনিটই অমূল্য
বর্তমানে হার্ট অ্যাটাকের চিকিৎসায় উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে। সময়মতো হাসপাতালে পৌঁছাতে পারলে জরুরি অ্যাঞ্জিওপ্লাস্টির মাধ্যমে রক্তপ্রবাহ স্বাভাবিক করে হৃদযন্ত্রের ক্ষতি অনেকটাই কমানো সম্ভব। তাই বুকে অস্বস্তি বা হার্ট অ্যাটাকের সামান্য সন্দেহ হলেও দেরি না করে দ্রুত নিকটবর্তী চিকিৎসাকেন্দ্রে যান। কারণ, হার্ট অ্যাটাকের ক্ষেত্রে প্রতিটি মিনিটই জীবন বাঁচানোর সুযোগ।
