গলা বসে যাওয়া বা কণ্ঠস্বর ভেঙে যাওয়া খুবই পরিচিত এক সমস্যা। ঠান্ডা লাগা, ভাইরাল সংক্রমণ, বেশি চিৎকার করে কথা বলা বা গলায় চাপ পড়লে এমনটা হতেই পারে। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই কয়েক দিনের মধ্যে সমস্যা সেরে যায়। কিন্তু সেই গলা ভাঙা যদি দু-সপ্তাহ পেরিয়েও না সারে, তাহলে আর দেরি করা উচিত নয়। কারণ এটি হতে পারে ল্যারিঞ্জিয়াল ক্যানসার (Laryngeal Cancer ), অর্থাৎ স্বরযন্ত্রের ক্যানসারের প্রথম সতর্কবার্তা।
এই ক্যানসারের ঝুঁকি ধূমপায়ী, তামাক ব্যবহারকারী ও অতিরিক্ত মদ্যপানকারীদের মধ্যে বেশি হলেও, ধূমপান করেন না এমন মানুষেরও এতে আক্রান্ত হতে পারেন। তাই শুধু ঝুঁকির কারণ নয়, উপসর্গের দিকেও সমান গুরুত্ব দেওয়া জরুরি।
ল্যারিঞ্জিয়াল ক্যানসার কী?
লারিংক্স বা স্বরযন্ত্র আমাদের শরীরের এমন একটি গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ, যা কথা বলা, শ্বাস নেওয়া এবং খাবার গিলতে সাহায্য করে। এই অংশের কোষে অস্বাভাবিক বৃদ্ধি শুরু হলে তাকে ল্যারিঞ্জিয়াল ক্যানসার বলা হয়। অনেক সময় ক্যানসার ভোকাল কর্ড থেকেই শুরু হয়। ফলে খুব ছোট টিউমারও কণ্ঠস্বর বদলে দিতে পারে।
তবে আশার খবর, রোগটি প্রাথমিক পর্যায়ে ধরা পড়লে চিকিৎসার সাফল্যের হার অনেক বেশি। অনেক রোগীই চিকিৎসার পর স্বাভাবিকভাবে কথা বলতে ও খাবার খেতে পারেন।
গলা বসা হতে পারে বড় বিপদের ইঙ্গিত। ছবি: সংগৃহীত
কোন লক্ষণগুলোকে গুরুত্ব দেবেন?
দু-সপ্তাহের বেশি সময় ধরে গলা ভাঙা বা বসা এই রোগের সবচেয়ে সাধারণ এবং গুরুত্বপূর্ণ লক্ষণ। এর পাশাপাশি আরও কিছু উপসর্গ দেখা দিতে পারে। যেমন-
- গলায় দীর্ঘদিন ব্যথা
- খাবার গিলতে সমস্যা
- ঘাড়ে গাঁট বা ফোলা
- দীর্ঘস্থায়ী কাশি
- কানে ব্যথা
- শ্বাস নিতে কষ্ট
- অকারণে দ্রুত ওজন কমে যাওয়া
এই লক্ষণগুলির কোনওটি দীর্ঘদিন ধরে থাকলে নাক-কান-গলা বিশেষজ্ঞ, অর্থাৎ, হেড অ্যান্ড নেক ক্যানসার বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
কীভাবে ধরা পড়ে এই ক্যানসার?
প্রথমে চিকিৎসক রোগীর উপসর্গ ও গলা-ঘাড় পরীক্ষা করেন। এরপর লারিঙ্গোস্কোপি করা হয়। এতে একটি সরু ক্যামেরাযুক্ত নল দিয়ে স্বরযন্ত্রের ভেতর দেখা হয়। সন্দেহজনক অংশ পাওয়া গেলে বায়োপসি করে নিশ্চিত হওয়া হয় ক্যানসার রয়েছে কি না। রোগ কতটা ছড়িয়েছে, তা জানার জন্য প্রয়োজন হতে পারে সিটি স্ক্যান, এমআরআই বা পেট-সিটি স্ক্যান।
জরুরি দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ। ছবি: সংগৃহীত
চিকিৎসা না হলে কী হতে পারে?
অবহেলায় টিউমার ধীরে ধীরে বড় হতে থাকে এবং ভোকাল কর্ডের ক্ষতি করে। ফলে কণ্ঠস্বর আরও কর্কশ হয়ে যায়, কথা বলতে ও খাবার গিলতে সমস্যা হয়, এমনকী শ্বাস নেওয়াও কঠিন হয়ে উঠতে পারে। অনেক ক্ষেত্রে রোগী স্থায়ীভাবে কণ্ঠস্বর হারানোর ঝুঁকিতেও পড়েন।
তবে চিকিৎসকেরা জোর দিয়ে বলছেন, প্রাথমিক পর্যায়ে রোগ ধরা পড়লে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই কণ্ঠস্বর রক্ষা করা সম্ভব।
কী কী চিকিৎসা রয়েছে?
রোগের পর্যায় অনুযায়ী চিকিৎসার ধরন নির্ধারণ করা হয়। প্রাথমিক পর্যায়ে রেডিওথেরাপি বা মিনিম্যালি ইনভেসিভ সার্জারি করেই ভালো ফল পাওয়া যায়। এতে স্বরযন্ত্রও অনেকাংশে অক্ষত থাকে।
ক্যানসার যদি ছড়িয়ে পড়ে, তাহলে অস্ত্রোপচারের পাশাপাশি কেমোথেরাপি, রেডিওথেরাপি, টার্গেটেড থেরাপি বা ইমিউনোথেরাপির প্রয়োজন হতে পারে। চিকিৎসার পরে অনেক রোগীকেই স্পিচ ও সোয়ালো থেরাপির মাধ্যমে স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনা হয়।
রোগ দ্রুত ধরা পড়লে বাড়ে সুস্থ হওয়ার সম্ভাবনা। ছবি: সংগৃহীত
ঝুঁকি কমাতে কী করবেন?
ধূমপান ও তামাক বর্জন, অতিরিক্ত মদ্যপান এড়ানো, স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস বজায় রাখা এবং মুখের পরিচ্ছন্নতা রক্ষা করলে এই ক্যানসারের ঝুঁকি অনেকটাই কমানো যায়। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল, দু-সপ্তাহের বেশি গলা বসা থাকলে নিজে থেকে ওষুধ খেয়ে সময় নষ্ট না করে দ্রুত চিকিৎসকের কাছে যান।
গলা বসে যাওয়া সব সময় তুচ্ছ সমস্যা নয়। অনেক সময় শরীর এভাবেই বড় বিপদের ইঙ্গিত দেয়। তাই দু-সপ্তাহ পেরিয়েও যদি কণ্ঠস্বর স্বাভাবিক না হয়, সেটিকে অবহেলা করবেন না। সময়মতো পরীক্ষা ও চিকিৎসাই পারে আপনার কণ্ঠস্বর এবং জীবন, দুই সুরক্ষিত রাখতে।
