তীব্র গরমে অসুস্থ হওয়ার ঝুঁকি নিয়ে কথা উঠলেই সাধারণত স্থূলতা, অতিরিক্ত ওজন বা অনিয়ন্ত্রিত জীবনযাপনের কথাই সামনে আসে। কিন্তু চিকিৎসকদের একাংশ বলছেন, রোগা বা কম ওজনের মানুষও তাপপ্রবাহে সমানভাবে বিপদের মুখে পড়তে পারেন। বরং অনেক ক্ষেত্রে তাঁরা দ্রুত শারীরিক সমস্যার সম্মুখীন হন।
দেশের একাধিক জায়গায় তাপমাত্রা ইতিমধ্যেই ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াস পার করেছে। এই অস্বাভাবিক গরমে শরীরকে ঠান্ডা রাখা এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। আর সেখানেই সমস্যায় পড়ছেন রোগা মানুষেরা। বিশেষজ্ঞদের মতে, শরীরে পর্যাপ্ত ফ্যাট, পেশি ও জলীয় পদার্থ সঞ্চয় না থাকলে হিট এগ্জশন, ডিহাইড্রেশন এমনকী প্রাণঘাতী হিটস্ট্রোকও দ্রুত আঘাত হানতে পারে।
তাপপ্রবাহে হাঁসফাঁস দশা। ছবি: প্রতীকী
গরমে কেন ঝুঁকিতে রোগা মানুষরা?
শরীরের ফ্যাটকে অনেকেই শুধু ক্ষতিকর বলে মনে করেন। কিন্তু নির্দিষ্ট পরিমাণ চর্বি শরীরের জন্য অত্যন্ত প্রয়োজনীয়। এটি শরীরের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ, শক্তি ধরে রাখা এবং জলীয় ভারসাম্য বজায় রাখতে সাহায্য করে। অত্যন্ত রোগা মানুষদের ক্ষেত্রে সাধারণত দেখা যায়—
- শরীরে শক্তির সঞ্চয় কম
- দ্রুত ইলেকট্রোলাইটের ঘাটতি তৈরি হয়
- পেশির পরিমাণ কম থাকে
- রক্তের পরিমাণ তুলনামূলক কম হতে পারে
- অতিরিক্ত গরম সহ্য করার ক্ষমতা কমে যায়
তীব্র গরমে শরীর নিজেকে ঠান্ডা রাখতে ঘাম ঝরায় এবং রক্ত সঞ্চালন বাড়ায়। কিন্তু শরীরে পর্যাপ্ত জল, নুন বা পুষ্টি না থাকলে খুব দ্রুত ক্লান্তি, দুর্বলতা ও ডিহাইড্রেশন দেখা দিতে পারে।
পেশি কম থাকলেও বাড়তে পারে বিপদ
চিকিৎসকদের মতে, পেশি শুধু শরীরের শক্তি বাড়ায় না, রক্ত সঞ্চালন ও বিপাকক্রিয়াকেও সক্রিয় রাখে। যাঁদের শরীরে পেশির পরিমাণ কম, যেমন অতিরিক্ত ডায়েট করা ব্যক্তি, অপুষ্টিতে ভোগা মানুষ, প্রবীণ বা ইটিং ডিসঅর্ডারে আক্রান্তরা, তাঁরা দীর্ঘক্ষণ গরমে থাকলে দ্রুত অসুস্থ হয়ে পড়তে পারেন। এর ফলে দেখা দিতে পারে—
- মাথা ঘোরা
- দুর্বলতা
- অতিরিক্ত ক্লান্তি
- রক্তচাপ কমে যাওয়া
- অজ্ঞান হয়ে যাওয়া
গুরুতর ক্ষেত্রে শরীরের তাপমাত্রা বিপজ্জনকভাবে বেড়ে গিয়ে হিটস্ট্রোক পর্যন্ত হতে পারে, সঠিক সময় চিকিৎসা না পেলে তা প্রাণঘাতী হয়ে উঠতে পারে।
সুস্থ থাকতে দরকার বাড়তি সচেতনতা। ছবি: প্রতীকী
রোগা মানুষদের দ্রুত ডিহাইড্রেশন কেন হয়?
বিশেষজ্ঞদের মতে, কম ওজনের মানুষদের শরীরে জলীয় সঞ্চয়ও তুলনামূলক কম থাকে। ফলে অতিরিক্ত ঘামের কারণে খুব অল্প সময়েই শরীর থেকে সোডিয়াম, পটাশিয়ামের মতো প্রয়োজনীয় ইলেকট্রোলাইট বেরিয়ে যায়। ডিহাইড্রেশনের কিছু সাধারণ লক্ষণ হল—
- মুখ শুকিয়ে যাওয়া
- মাথাব্যথা
- পেশিতে টান ধরা
- হৃদস্পন্দন বেড়ে যাওয়া
- বমিভাব
- গাঢ় রঙের প্রস্রাব
- বিভ্রান্তি বা ঝিমুনি
ভুল ডায়েটও ডেকে আনতে পারে বিপদ
অনেকেই গরমকালে দ্রুত ওজন কমানোর জন্য কম খাওয়া, নুন এড়ানো বা অতিরিক্ত ডায়েট শুরু করেন। চিকিৎসকদের মতে, এই অভ্যাস বিপজ্জনক হতে পারে। শরীরে প্রয়োজনীয় প্রোটিন, খনিজ ও ক্যালরির ঘাটতি তৈরি হলে গরম সহ্য করার ক্ষমতা আরও কমে যায়। ফলে দেখা দিতে পারে—
- সারাক্ষণ ক্লান্ত লাগা
- মনোসংযোগে সমস্যা
- ব্রেন ফগ
- বিরক্তি
- শরীর ভেঙে পড়া
সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে প্রবীণরা। ছবি: প্রতীকী
সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে কারা?
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, যে সব প্রবীণ মানুষ রোগা, তাঁদের ক্ষেত্রে ঝুঁকি সবচেয়ে বেশি। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে শরীরের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা কমে যায়। তার উপর যদি অপুষ্টি, কম পেশি, দীর্ঘদিনের অসুখ বা ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া থাকে, তাহলে হিটস্ট্রোকের আশঙ্কা কয়েকগুণ বেড়ে যায়।
কীভাবে নিজেকে সুরক্ষিত রাখবেন?
- তেষ্টা না পেলেও নিয়মিত জল পান করুন
- ওআরএস, ডাবের জল বা ইলেকট্রোলাইটসমৃদ্ধ পানীয় পান করুন
- প্রোটিন ও পুষ্টিকর খাবার খেতে হবে নিয়ম মেনে
- গরমের সময় কঠোর ডায়েট এড়িয়ে চলুন
- দুপুরের রোদে অযথা বাইরে বেরোবেন না
- হালকা রঙের সুতির পোশাক পরুন
- মাথা ঘোরা, দুর্বলতা বা অস্বাভাবিক ক্লান্তি হলে দ্রুত বিশ্রাম নিন এবং প্রয়োজনে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।
