ফুকেট থেকে দিল্লিগামী এয়ার ইন্ডিয়ার বিমানের এক পাইলটের মারিজুয়ানা পজিটিভ হওয়ার খবর সামনে আসার পর গাঁজা সেবনের প্রভাব নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। বিশেষ করে বিমান চালানো, গাড়ি চালানো বা যন্ত্রপাতি পরিচালনার মতো কাজে একজন মানুষের মনোযোগ, দ্রুত সিদ্ধান্ত এবং মুহূর্তের মধ্যে প্রতিক্রিয়া জানানোর ক্ষমতা কতটা গুরুত্বপূর্ণ, তা ফের সামনে এসেছে।
চিকিৎসকদের মতে, ক্যানাবিসে থাকা মনকে চনমনে রাখার উপাদান টিএইচসি মস্তিষ্কের এমন কিছু ক্ষমতাকে প্রভাবিত করতে পারে, যা নিরাপত্তা-নির্ভর কাজের জন্য অত্যন্ত জরুরি।
মস্তিষ্কে কী হয়?
চিকিৎসকদের মতে, টিএইচসি মস্তিষ্কের মনোযোগ, স্মৃতি, শরীরের সমন্বয়, প্রতিক্রিয়ার গতি এবং সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতায় প্রভাব ফেলতে পারে। অর্থাৎ, কোনও পরিস্থিতি সামনে এলে সেটি দ্রুত বুঝে নেওয়া, তথ্য ঠিকভাবে বিশ্লেষণ করা এবং নিজের পরবর্তী পদক্ষেপের ফল কী হতে পারে তা আন্দাজ করার ক্ষমতা দুর্বল হয়ে যেতে পারে।
আর এখানেই বড় বিপদ। কারণ বিমান, গাড়ি বা ভারী যন্ত্র চালানোর সময় কয়েক সেকেন্ডের ভুলও বড় দুর্ঘটনার কারণ হতে পারে।
ছবি: সংগৃহীত
সবচেয়ে বড় সমস্যা, নিজের ভুলটা বোঝা যায় না
গাঁজার প্রভাবের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হল, ব্যক্তি নিজেকে যতটা স্বাভাবিক মনে করছেন, বাস্তবে তাঁর কর্মক্ষমতা ততটা স্বাভাবিক নাও থাকতে পারে। ক্যানাবিস ব্যবহারের পর অনেকেরই পরিস্থিতি ঠিকভাবে বিচার করা, দ্রুত তথ্য গ্রহণ করা এবং নিজের কাজের পরিণতি আগে থেকে অনুমান করা কঠিন হয়ে যায়। ফলে ‘আমি তো ঠিকই আছি’, এই ধারণাটিই বিপজ্জনক হয়ে উঠতে পারে।
প্রতিক্রিয়া দিতে দেরি হতে পারে
রাস্তায় হঠাৎ সামনে কোনও গাড়ি চলে এল, বিমানের ককপিটে আচমকা কোনও সতর্কবার্তা এল বা কোনও যন্ত্রে সমস্যা দেখা দিল—এমন পরিস্থিতিতে দ্রুত প্রতিক্রিয়া জরুরি। ক্যানাবিস প্রতিক্রিয়ার গতি এবং শরীরের বিভিন্ন অঙ্গের মধ্যে সমন্বয় কমিয়ে দিতে পারে। ফলে জরুরি পরিস্থিতিতে সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে বা প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে বেশি সময় লাগতে পারে।
তবে এর প্রভাব সবার ক্ষেত্রে সমান নয়। টিএইচসি-এর মাত্রা, কতটা ক্যানাবিস নেওয়া হয়েছে, কত ঘন ঘন ব্যবহার করা হয় এবং ব্যক্তির শরীর কীভাবে প্রতিক্রিয়া জানাচ্ছে, সবই গুরুত্বপূর্ণ। অ্যালকোহলের সঙ্গে ক্যানাবিস ব্যবহার করলে এই ধরনের সমস্যা আরও বাড়তে পারে।
‘এডিবল’-এর ক্ষেত্রে বিপদ অন্য জায়গায়
গাঁজা শুধু ধূমপানের মাধ্যমেই নেওয়া হয় না। বিভিন্ন খাবার বা পানীয়ের সঙ্গেও ক্যানাবিস নেওয়া হয়, যেগুলিকে সাধারণভাবে ‘এডিবল’ বলা হয়। এগুলির ক্ষেত্রে প্রভাব শুরু হতে সময় লাগতে পারে। ফলে কেউ প্রথমবার নেওয়ার পর তেমন কিছু অনুভব না করে আরও খেয়ে ফেলতে পারেন। পরে যখন প্রভাব শুরু হয়, তখন একসঙ্গে বেশি মাত্রায় নেশা বা জ্ঞানীয় সমস্যা দেখা দিতে পারে।
ছবি: সংগৃহীত
শুধু সিদ্ধান্ত নয়, মনেও পড়তে পারে প্রভাব
ক্যানাবিসের প্রভাব সবার ক্ষেত্রে এক নয়। কারও ক্ষেত্রে সাময়িক স্বস্তি বা আনন্দের অনুভূতি হতে পারে। আবার কারও ক্ষেত্রে উদ্বেগ, হঠাৎ আতঙ্ক, বিভ্রান্তি বা সন্দেহপ্রবণতা দেখা দিতে পারে। বিশেষ করে বেশি মাত্রায় বা দীর্ঘদিন নিয়মিত ক্যানাবিস ব্যবহারের ক্ষেত্রে কিছু ঝুঁকিপ্রবণ মানুষের মধ্যে সাইকোসিস-জাতীয় উপসর্গও দেখা দিতে পারে।
নিয়মিত ব্যবহারের সঙ্গে স্মৃতি, শেখার ক্ষমতা, মনোযোগ এবং জটিল সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতায় সমস্যার সম্পর্কও রয়েছে। অল্প বয়সে ব্যবহার শুরু করলে এই ঝুঁকি আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
নেশা কেটে গেলেও কি প্রভাব থাকে?
শুধু নেশার অনুভূতি চলে গিয়েছে বলেই মস্তিষ্কের সব কাজ আগের অবস্থায় ফিরে এসেছে, এমনটা ধরে নেওয়া ঠিক নয়। নিজেকে স্বাভাবিক মনে হলেও বিচার-বিবেচনা, প্রতিক্রিয়ার গতি এবং শরীরের সমন্বয় পুরোপুরি স্বাভাবিক নাও হতে পারে।
তাই ক্যানাবিস ব্যবহারের পর ‘আমি ঠিক আছি’ মনে হওয়াকে নিরাপদে গাড়ি চালানো বা অন্য কোনও ঝুঁকিপূর্ণ কাজ করার ছাড়পত্র হিসেবে দেখা ঠিক নয়।
তাহলে মূল সতর্কতা কোথায়?
ক্যানাবিসের চিকিৎসাগত ব্যবহার রয়েছে এবং নির্দিষ্ট কিছু ক্ষেত্রে চিকিৎসকের পরামর্শে ক্যানাবিস-জাতীয় ওষুধ ব্যবহার করা হয়। কিন্তু চিকিৎসকের তত্ত্বাবধানে ব্যবহার আর বিনোদনের জন্য মারিজুয়ানা নেওয়া এক বিষয় নয়। বিশেষ করে বিমান চালানো, গাড়ি চালানো, ভারী যন্ত্র পরিচালনা বা এমন কোনও কাজে যেখানে সামান্য ভুলও বড় বিপদ ডেকে আনতে পারে, সেখানে মনোযোগ ও প্রতিক্রিয়ার ক্ষমতা কমে যাওয়ার সম্ভাবনাকে হালকা করে দেখার সুযোগ নেই।
আর ফুকেট-দিল্লি বিমানের পাইলটকে ঘিরে যে রিপোর্ট সামনে এসেছে, সেটিও মনে করিয়ে দেয়, কোনও পদার্থের প্রভাব সম্পর্কে সচেতন থাকা শুধু ব্যক্তিগত স্বাস্থ্যের বিষয় নয়, অনেক সময় তা জননিরাপত্তার সঙ্গেও সরাসরি যুক্ত।
