গরমের দিনে আইসক্রিম যেন মুহূর্তে মন ভালো করে দেয়। কিন্তু আপনি যে আইসক্রিম খাচ্ছেন, তা কি সত্যিই দুধ, ক্রিম ও মিল্ক ফ্যাট দিয়ে তৈরি? নাকি তার বড় অংশ জুড়ে রয়েছে পাম অয়েল?
সম্প্রতি আইক্রিমের এক জনপ্রিয় ব্র্যান্ড ঘোষণা করেছে যে তারা ধাপে ধাপে তাদের ফ্রোজেন ডেজার্টে ব্যবহৃত পাম অয়েলের পরিবর্তে দুগ্ধজাত উপাদান ব্যবহার করবে। এই সিদ্ধান্ত নতুন করে আলোচনায় এনেছে এমন একটি বিষয়, যা নিয়ে অধিকাংশ ক্রেতাই সচেতন নন— বাজারে পাওয়া সব 'আইসক্রিম' আসলে আইসক্রিম নয়।
কেনার আগে লেবেল দেখে কিনুন। ছবি: সংগৃহীত
আইসক্রিম আর ফ্রোজেন ডেজার্ট— এক নয়
অনেকেই ভাবেন, ফ্রিজে রাখা ও ঠান্ডা অবস্থায় খাওয়া মিষ্টি-জাতীয় খাবারই আইসক্রিম। বাস্তবে বিষয়টি ভিন্ন। ভারতের খাদ্য নিরাপত্তা ও মান নিয়ন্ত্রণ সংস্থা (এফএসএসএআই)-র নিয়ম অনুযায়ী, আইসক্রিমে নির্দিষ্ট পরিমাণ মিল্ক ফ্যাট থাকা বাধ্যতামূলক। এই মিল্ক ফ্যাটই আইসক্রিমে এনে দেয় তার স্বাভাবিক স্বাদ ও ঘনত্ব।
অন্যদিকে ফ্রোজেন ডেজার্টে মিল্ক ফ্যাটের বদলে ব্যবহার করা হয় বিভিন্ন ধরনের উদ্ভিজ্জ তেল, বিশেষ করে পাম অয়েল। উৎপাদন খরচ কম হওয়ায় বহু সংস্থা এই উপাদান ব্যবহার করে থাকে। তাই প্যাকেটের গায়ে আইসক্রিম (Ice Cream) না লিখে ফ্রোজেন ডেজার্ট (Frozen Dessert) লেখা থাকে।
আইসক্রিমে পাম অয়েল! ছবি: সংগৃহীত
আসল সত্য লুকিয়ে থাকে লেবেলে
বিজ্ঞাপনের চকচকে দাবি বা প্যাকেটের আকর্ষণীয় ছবির চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হল উপাদানের তালিকা। যদি সেখানে দুধ, ক্রিম, বাটার বা মিল্ক ফ্যাটের উল্লেখ থাকে, তাহলে সেটি প্রকৃত দুগ্ধজাত আইসক্রিম হওয়ার সম্ভাবনা বেশি।
কিন্তু যদি লেখা থাকে পাম তেল (Palm Oil), পাম কার্নেল তেল (Palm Kernel Oil), পাম ওলিন (Palm Olein), হাইড্রোজেনেটেড উদ্ভিজ্জ তেল (Hydrogenated Vegetable Oil) বা ভোজ্য উদ্ভিজ্জ ফ্যাট (Edible Vegetable Fat) তাহলে বুঝতে হবে সেখানে উদ্ভিজ্জ তেলের উপস্থিতি রয়েছে।
খাদ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, লেবেল পড়ার অভ্যাসই একজন সচেতন ক্রেতার সবচেয়ে বড় অস্ত্র।
ঘরেই করতে পারেন সহজ পরীক্ষা
এক স্কুপ আইসক্রিম ঘরের তাপমাত্রায় রেখে দিন। খাঁটি দুগ্ধজাত আইসক্রিম সাধারণত ধীরে ধীরে গলে একটি মসৃণ, ক্রিমি তরলে পরিণত হয়। অন্যদিকে, উদ্ভিজ্জ তেলযুক্ত ফ্রোজেন ডেজার্ট দ্রুত গলতে পারে এবং অনেক সময় তার গঠন ভেঙে পাতলা হয়ে যায়।
আরও নিশ্চিত হতে, গলে যাওয়া অংশটি গরম জলের সঙ্গে মিশিয়ে দেখা যেতে পারে। দুধভিত্তিক আইসক্রিম সহজে মিশে গেলেও তেলযুক্ত পণ্যে অনেক সময় উপরে তেলের আস্তরণ দেখা যায়।
তবে বিশেষজ্ঞরা মনে করিয়ে দেন, এসব পরীক্ষা কৌতূহল মেটাতে সাহায্য করলেও সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য তথ্য পাওয়া যায় প্যাকেটের লেবেল থেকেই।
গরমে মন ভালো করে। ছবি: সংগৃহীত
পাম অয়েল নিয়ে এত উদ্বেগ কেন?
পাম অয়েল বিশ্বের সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত ভোজ্য তেলগুলোর মধ্যে অন্যতম। এটি সস্তা, সহজলভ্য এবং দীর্ঘদিন খাবারের গুণগত মান বজায় রাখতে সাহায্য করে। এই কারণেই বিস্কুট, চিপস, ইনস্ট্যান্ট নুডলস, কেক, চকোলেট, পেস্ট্রি থেকে শুরু করে বহু ফ্রোজেন ডেজার্টে এর ব্যবহার দেখা যায়।
সমস্যা হল, পাম অয়েলে স্যাচুরেটেড ফ্যাটের পরিমাণ তুলনামূলক বেশি। অতিরিক্ত ও নিয়মিত গ্রহণের ফলে রক্তে খারাপ কোলেস্টেরলের মাত্রা বাড়তে পারে, যা দীর্ঘমেয়াদে হৃদরোগের ঝুঁকি বাড়াতে পারে। এছাড়া অতিরিক্ত প্রক্রিয়াজাতকরণ বা উচ্চ তাপমাত্রায় ব্যবহারের ফলে কিছু ক্ষতিকর রাসায়নিক যৌগও তৈরি হতে পারে বলে বিভিন্ন গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছে।
সচেতনতার সময় এখনই
পাম অয়েলযুক্ত কোনও খাবার মাঝে মাঝে খেলে তাৎক্ষণিক ক্ষতির আশঙ্কা সাধারণত থাকে না। কিন্তু সমস্যা তৈরি হয় যখন এই ধরনের উপাদান রোজের খাদ্যাভ্যাসের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে ওঠে।
তাই পরের বার আইসক্রিম কিনতে গেলে শুধু স্বাদ বা অফারের দিকে নজর না দিয়ে, কয়েক সেকেন্ড সময় নিয়ে প্যাকেটের লেবেল পড়ুন। কারণ আপনার হাতে ধরা কাপ বা কোনের ভেতরে সত্যিই আইসক্রিম রয়েছে, নাকি জমাট বাঁধা উদ্ভিজ্জ তেলের মিষ্টি সংস্করণ— সেই উত্তর লেখা রয়েছে সেখানেই।
