বহু বছর ধরে নারীদের এক পরিচিত হরমোনজনিত সমস্যার নাম পিসিওএস (PCOS) বা পলিসিস্টিক ওভারি সিনড্রোম। কিন্তু এবার সেই নাম বদলে নতুন নাম প্রস্তাব করলেন বিশেষজ্ঞরা। পিএমওএস (PMOS) বা পলিএন্ডোক্রাইন মেটাবলিক ওভারিয়ান সিনড্রোম। চিকিৎসকদের মতে, এটি শুধু নাম পরিবর্তন নয়, বরং নারীদের শরীর নিয়ে দীর্ঘদিনের ভুল ধারণা ভাঙার একটি বড় পদক্ষেপ।
বিশ্বজুড়ে প্রায় ১৭ কোটি নারী এই সমস্যায় ভুগছেন। অথচ এখনও অধিকাংশ ক্ষেত্রেই রোগটিকে শুধুমাত্র 'ওভারি বা সিস্টের সমস্যা' হিসেবেই দেখা হয়। বিশেষজ্ঞদের দাবি, এই ধারণাই বহু নারীকে সঠিক চিকিৎসা থেকে দূরে সরিয়ে রেখেছে।
বিশ্বে প্রায় ১৭ কোটি নারী ভুগছেন পিসিওএস-এর সমস্যায়। ছবি: সংগৃহীত
কেন পিসিওএস নাম নিয়ে আপত্তি?
'পলিসিস্টিক ওভারি' শব্দটি শুনলেই অনেকের মনে ভয় তৈরি হয়, ডিম্বাশয়ে সিস্ট হয়েছে, হয়তো অস্ত্রোপচার লাগবে, সন্তানধারণে সমস্যা হবে। কিন্তু বাস্তব চিত্র অনেকটাই আলাদা।
চিকিৎসকদের মতে, পিসিওএস-এ আক্রান্ত বহু নারীর ডিম্বাশয়ে কোনও সিস্টই থাকে না। আবার এই রোগের প্রভাব শুধু প্রজনন স্বাস্থ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। শরীরের হরমোন, মেটাবলিজম, ওজন, মানসিক স্বাস্থ্য, এমনকী হৃদরোগ ও ডায়াবেটিসের ঝুঁকির সঙ্গেও এর গভীর সম্পর্ক রয়েছে।
স্ত্রীরোগ বিশেষজ্ঞদের কথায়, পিসিওএস শুনে তরুণীদের প্রথম প্রশ্নই আসে, সিস্ট কি অপারেশন করতে হবে? অথচ আসল সমস্যা থাকে শরীরের হরমোন ও বিপাকক্রিয়ার ভারসাম্যহীনতায়।
পিএমওএস নামের মধ্যে কী বার্তা লুকিয়ে?
বিশেষজ্ঞদের মতে, নতুন নামটি রোগটির আসল চেহারা তুলে ধরে। 'পলিএন্ডোক্রাইন' বোঝাচ্ছে শরীরের একাধিক হরমোন নিয়ন্ত্রণকারী গ্রন্থি এতে প্রভাবিত হয়। 'মেটাবলিক' শব্দটি তুলে ধরছে ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্স, ওজন বৃদ্ধি, ডায়াবেটিস, কোলেস্টেরল ও হৃদরোগের মতো বিপজ্জনক সমস্যাগুলিকে। আর 'ওভারিয়ান' শব্দটি থাকছে কারণ ডিম্বাশয় ও প্রজনন স্বাস্থ্য এই রোগের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। অর্থাৎ, এটি শুধুই 'সিস্টের রোগ' নয়, বরং পুরো শরীরের হরমোন ও মেটাবলিক সিস্টেমকে প্রভাবিত করা একটি জটিল অবস্থা।
শুধু সিস্টের সমস্যা নয়, সমস্যা আরও গভীরে। ছবি: সংগৃহীত
যে লক্ষণগুলোকে অনেকেই অবহেলা করেন
বিশেষজ্ঞদের মতে, পিএমওএস বা পিসিওএস-এর সবচেয়ে বড় সমস্যা হল সচেতনতার অভাব। অনেক নারী বছরের পর বছর নানা উপসর্গ সহ্য করলেও বুঝতে পারেন না এগুলো একই রোগের অংশ। সাধারণ লক্ষণগুলির মধ্যে রয়েছে-
- অনিয়মিত মাসিক
- হঠাৎ ওজন বেড়ে যাওয়া
- ওজন কমতে না চাওয়া
- মুখে ব্রণ বা অতিরিক্ত তৈলাক্ত ত্বক
- মুখ বা শরীরে অতিরিক্ত লোম
- চুল পাতলা হয়ে যাওয়া
- অতিরিক্ত ক্লান্তি
- মুড সুইং, উদ্বেগ বা হতাশা
- গর্ভধারণে সমস্যা
চিকিৎসকদের সতর্কবার্তা, দীর্ঘদিন এই সমস্যা অবহেলা করলে টাইপ-২ ডায়াবেটিস, হৃদরোগ, স্লিপ অ্যাপনিয়া, উদ্বেগ ও ডিপ্রেশনের ঝুঁকি কয়েকগুণ বাড়তে পারে।
কেন গুরুত্বপূর্ণ এই নাম বদল?
স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, পিসিওএস শব্দটি রোগটিকে ঠিকভাবে বোঝাতে পারছে না। ফলে অনেক ক্ষেত্রেই চিকিৎসা সীমাবদ্ধ থেকেছে শুধু মাসিক ঠিক করা বা সন্তানধারণের সমস্যার মধ্যেই। কিন্তু পিএমওএস নামটি সামনে এলে রোগটিকে সম্পূর্ণ শরীরের মেটাবলিক ও হরমোনজনিত সমস্যা হিসেবে গুরুত্ব দেওয়া হবে। এতে রোগ নির্ণয় দ্রুত হতে পারে, পাশাপাশি একজন নারী একইসঙ্গে এন্ডোক্রাইনোলজিস্ট, নিউট্রিশনিস্ট, ডার্মাটোলজিস্ট ও মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞের পরামর্শও পেতে পারেন।
নাম বদলে চিকিৎসা হবে আরও সহজ? ছবি: সংগৃহীত
বিশেষজ্ঞদের আশা, এই নাম পরিবর্তন নারীদের মধ্যে সচেতনতা বাড়াবে, অকারণ ভয় কমাবে এবং গবেষণা ও উন্নত চিকিৎসার পথও আরও খুলে দেবে।
নারীদের স্বাস্থ্য নিয়ে নতুন বার্তা পিসিওএস থেকে পিএমওএস- এই পরিবর্তন এখনও আন্তর্জাতিক স্তরে আলোচনার পর্যায়ে থাকলেও চিকিৎসকরা এটিকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলেই মনে করছেন। কারণ, এটি নারীদের শরীরকে শুধু প্রজননের দৃষ্টিতে নয়, সামগ্রিক স্বাস্থ্যের দৃষ্টিতে দেখার বার্তা দিচ্ছে।
যে লক্ষ লক্ষ নারী এতদিন ক্লান্তি, ওজন বৃদ্ধি, অনিয়মিত মাসিক বা মানসিক সমস্যাকে 'স্বাভাবিক' ভেবে চুপ করে থেকেছেন, তাঁদের জন্য এই নতুন নাম হয়তো একটি বড় সতর্কবার্তা- শরীরের ছোট ছোট পরিবর্তনও কখনও বড় হরমোনাল সমস্যার ইঙ্গিত হতে পারে।
