সামান্য জ্বর, গলা ব্যথা বা সংক্রমণ হলেই অ্যান্টিবায়োটিক খাওয়ার প্রবণতা ভারতে নতুন নয়। কিন্তু এই অভ্যাসই ভবিষ্যতে ভয়াবহ স্বাস্থ্য সংকট ডেকে আনতে পারে বলে সতর্ক করল বিশ্বের অন্যতম স্বনামধন্য চিকিৎসাবিজ্ঞান সাময়িকী 'দ্য ল্যানসেট পাবলিক হেলথ'।
নতুন গবেষণায় উঠে এসেছে, ভারতে প্রয়োজনের তুলনায় অনেক বেশি ব্যবহার করা হচ্ছে শক্তিশালী 'ওয়াচ' শ্রেণির অ্যান্টিবায়োটিক। এর ফলে দ্রুত বাড়ছে অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্স, অর্থাৎ, এমন জীবাণুর সংখ্যা, যাদের বিরুদ্ধে প্রচলিত অ্যান্টিবায়োটিক আর কার্যকর থাকে না।
কেন উদ্বেগ বাড়ছে?
অ্যান্টিবায়োটিক সব সংক্রমণের জন্য নয়। ভাইরাসজনিত জ্বর, সর্দি বা ফ্লুতে এই ওষুধ কাজই করে না। তবু অনেক ক্ষেত্রেই প্রয়োজন না থাকলেও অ্যান্টিবায়োটিক দেওয়া বা খাওয়ার প্রবণতা দেখা যায়। এর ফলেই ব্যাকটেরিয়া ধীরে ধীরে ওষুধের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলে। তখন সাধারণ সংক্রমণও কঠিন হয়ে ওঠে এবং চিকিৎসা জটিল হয়ে যায়।
চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া নয়। ছবি: সংগৃহীত
অ্যান্টিবায়োটিকের সঠিক ব্যবহারে হু-র নির্দেশিকা?
অ্যান্টিবায়োটিকের সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করতে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (হু) এগুলিকে তিন ভাগে ভাগ করেছে।
অ্যাকসেস: সাধারণ ব্যাকটেরিয়াজনিত সংক্রমণের চিকিৎসায় প্রথম পছন্দের ওষুধ।
ওয়াচ: শক্তিশালী ও বিস্তৃত কার্যক্ষমতার অ্যান্টিবায়োটিক। নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে প্রয়োজন হলেই ব্যবহার করা উচিত।
রিজার্ভ: শেষ ভরসার অ্যান্টিবায়োটিক। বহু ওষুধে কাজ না করা সংক্রমণের ক্ষেত্রেই এগুলি ব্যবহার করা হয়।
ভারত নিয়ে কী বলছে গবেষণা?
গবেষকদের মতে, ভারতে প্রতি ১,০০০ জন মানুষের জন্য প্রতিদিন আদর্শ অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহারের পরিমাণ হওয়া উচিত ১৪.৭ ডিফাইন্ড ডেইলি ডোজ (ডিআইডি)। কিন্তু বর্তমানে ব্যবহার হচ্ছে ১৮.৩ ডিআইডি।
সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয়, প্রথম সারির অ্যাকসেস অ্যান্টিবায়োটিক যেখানে মোট ব্যবহারের প্রায় ৫২ শতাংশ হওয়া উচিত, সেখানে বাস্তবে তা মাত্র ২৭ শতাংশ। অন্যদিকে, প্রয়োজনের তুলনায় অনেক বেশি ব্যবহার হচ্ছে ওয়াচ শ্রেণির শক্তিশালী অ্যান্টিবায়োটিক।
গবেষকদের মতে, এর অর্থ অনেক ক্ষেত্রেই রোগীরা প্রয়োজনের তুলনায় বেশি শক্তিশালী ওষুধ পাচ্ছেন।
গবেষণা রিপোর্টে উদ্বেগ। ছবি: সংগৃহীত
কেন বিপজ্জনক এই প্রবণতা?
অতিরিক্ত ও অপ্রয়োজনীয় অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহারের ফলে জীবাণু ওষুধের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলে। এর পরিণতিতে—
- সাধারণ সংক্রমণও কঠিন হয়ে উঠতে পারে
- হাসপাতালে দীর্ঘদিন ভর্তি থাকতে হতে পারে
- চিকিৎসার খরচ বেড়ে যায়
- কার্যকর ওষুধের বিকল্প কমে আসে
- মৃত্যুঝুঁকিও বাড়ে
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বহুদিন ধরেই অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্সকে বিশ্ব জনস্বাস্থ্যের অন্যতম বড় হুমকি হিসেবে চিহ্নিত করেছে।
শুধু ভারত নয়, উদ্বেগ গোটা বিশ্বে
১৮৬টি দেশ ও অঞ্চলের তথ্য বিশ্লেষণ করে গবেষকরা দেখেছেন, প্রায় ৭২ শতাংশ দেশ প্রয়োজনের তুলনায় বেশি অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহার করছে। আবার ৯৯ শতাংশ দেশে এমন অ্যান্টিবায়োটিকের অতিরিক্ত ব্যবহার হচ্ছে, যা ওষুধ-প্রতিরোধী জীবাণু তৈরির ঝুঁকি সবচেয়ে বেশি বাড়ায়।
অন্যদিকে, বিশ্বের বহু মানুষ এখনও প্রয়োজনীয় অ্যান্টিবায়োটিকই পান না। অর্থাৎ, একদিকে অতিরিক্ত ব্যবহার, অন্যদিকে প্রয়োজনীয় ওষুধের অভাব, দুই সমস্যাই একসঙ্গে বিদ্যমান।
অপব্যবহারে বাড়ছে বিপদ। ছবি: সংগৃহীত
ভারতে প্রেসক্রিপশন নিয়েও প্রশ্ন
ন্যাশনাল সেন্টার ফর ডিজিজ কন্ট্রোল (এনসিডিসি)-এর একটি সমীক্ষা অনুযায়ী, হাসপাতালে ভর্তি হওয়া প্রায় চার জনের মধ্যে তিন জনকেই অ্যান্টিবায়োটিক দেওয়া হয়েছিল। অথচ মাত্র ৬ শতাংশ ক্ষেত্রে জীবাণু শনাক্ত করার পরীক্ষার ভিত্তিতে সেই ওষুধ দেওয়া হয়েছিল।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ওয়াচ শ্রেণির অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহারে আরও সতর্ক হওয়া প্রয়োজন। আর রিজার্ভ শ্রেণির অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহার করা উচিত শুধুমাত্র বহু ওষুধে কাজ না করা সংক্রমণের ক্ষেত্রেই।
কী বলছেন বিশেষজ্ঞরা?
বিশেষজ্ঞদের মতে, অ্যান্টিবায়োটিক কখনও নিজের ইচ্ছামতো খাওয়া উচিত নয়। চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া অ্যান্টিবায়োটিক শুরু করা, মাঝপথে বন্ধ করে দেওয়া বা একই প্রেসক্রিপশন বারবার ব্যবহার করা ভবিষ্যতে শুধু ব্যক্তির নয়, গোটা সমাজের জন্যই বড় বিপদ ডেকে আনতে পারে।
