দিল্লির যন্তর মন্তরে অনির্দিষ্টকালের অনশনে পরিবেশকর্মী সোনম ওয়াংচুক (Sonam Wangchuk)। সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, টানা ১৯ দিনের অনশনে তাঁর ওজন কমেছে ৯ কেজিরও বেশি। চিকিৎসকেরা জানিয়েছেন, আপাতত তিনি শারীরিকভাবে স্থিতিশীল এবং মানসিকভাবে সম্পূর্ণ সচেতন। তবে দীর্ঘ সময় না খেয়ে থাকার ফলে শরীরে যে পরিবর্তনগুলি ঘটে, তা যে কোনও সময় জটিল আকার নিতে পারে বলেও সতর্ক করেছেন তাঁরা।
দীর্ঘ উপবাসে শরীরের ভেতরে কী ঘটে?
খাবার বন্ধ হওয়ার প্রথম ২৪ ঘণ্টা পর্যন্ত শরীর লিভার ও পেশিতে জমে থাকা গ্লাইকোজেন ব্যবহার করে শক্তির চাহিদা মেটায়। এই মজুত শেষ হয়ে গেলে শরীর শক্তির উৎস হিসেবে সঞ্চিত চর্বিকে ব্যবহার করতে শুরু করে। সেই সময় চর্বি ভেঙে তৈরি হয় কিটোন, যা মস্তিষ্ক-সহ শরীরের বিভিন্ন অঙ্গের বিকল্প জ্বালানি হিসেবে কাজ করে। এই অবস্থাকে বলা হয় কিটোসিস।
কিন্তু উপবাস দীর্ঘায়িত হলে শুধু চর্বি নয়, শরীর ধীরে ধীরে পেশিও ভাঙতে শুরু করে। কারণ শরীরের গুরুত্বপূর্ণ কাজ চালিয়ে যেতে প্রয়োজনীয় অ্যামাইনো অ্যাসিডের জোগান দিতে তখন পেশির উপরই নির্ভর করতে হয়। এর ফলেই বাড়তে থাকে দুর্বলতা, কমতে থাকে পেশিশক্তি এবং শারীরিক সক্ষমতা।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ওয়াংচুকের প্রস্রাবে কিটোনের উপস্থিতি ধরা পড়েছে। অর্থাৎ, তাঁর শরীর ইতিমধ্যেই কার্বোহাইড্রেটের পরিবর্তে চর্বি ভেঙে শক্তি উৎপাদনের পর্যায়ে পৌঁছে গিয়েছে।
অনশনরত সোনম ওয়াংচুক। ছবি: সংগৃহীত
১৯ দিনে ৯ কেজি ওজন কমা কতটা উদ্বেগের?
বিশেষজ্ঞদের মতে, এত অল্প সময়ে ৯ কেজি ওজন কমে যাওয়া স্বাভাবিক নয়। প্রথম দিকে শরীর থেকে জল ও গ্লাইকোজেন কমে যাওয়ার কারণে ওজন দ্রুত হ্রাস পায়। কিন্তু উপবাস চলতে থাকলে চর্বির পাশাপাশি পেশিও ক্ষয় হতে থাকে। তখন ক্লান্তি, দুর্বলতা, কর্মক্ষমতা হ্রাস, পুষ্টির ঘাটতি, রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যাওয়া এবং শরীরের হরমোনের ভারসাম্যে পরিবর্তনের মতো সমস্যা দেখা দিতে পারে।
একই সঙ্গে পেশি ভাঙার ফলে রক্তে ইউরিক অ্যাসিডের মাত্রাও বেড়ে যেতে পারে, যা ভবিষ্যতে গাউট বা কিডনির জটিলতার ঝুঁকি বাড়ায়।
কিটোন ও ইউরিক অ্যাসিড কেন গুরুত্বপূর্ণ?
দীর্ঘ উপবাসে প্রস্রাবে কিটোন পাওয়া অস্বাভাবিক নয়। বরং এটি ইঙ্গিত দেয় যে শরীর এখন চর্বি ভেঙে শক্তি তৈরি করছে। তবে কিটোনের মাত্রা অনেক বেড়ে গেলে এবং তার সঙ্গে যদি জলশূন্যতা যোগ হয়, তাহলে কিডনির উপর অতিরিক্ত চাপ পড়তে পারে।
চিকিৎসকেরা আরও জানিয়েছেন, ওয়াংচুকের ইউরিক অ্যাসিডের মাত্রাও বেড়েছে। যদিও এখনও পর্যন্ত তাঁর কিডনির কার্যকারিতা স্বাভাবিক রয়েছে, তবু দীর্ঘদিন অনশন চলতে থাকলে পরিস্থিতি দ্রুত বদলে যেতে পারে।
কেন চিকিৎসকদের নিবিড় নজরদারি প্রয়োজন?
দীর্ঘ অনশনে থাকা কোনও ব্যক্তিকে শুধু বাইরে থেকে দেখে তাঁর শারীরিক অবস্থা বোঝা সম্ভব নয়। তাই চিকিৎসকেরা নিয়মিত রক্তচাপ, রক্তে শর্করার মাত্রা, নাড়ির গতি, শরীরের ওজন, শরীরে জলের পরিমাণ, কিডনির কার্যকারিতা, ইলেকট্রোলাইটের ভারসাম্য এবং হৃদ্যন্ত্রের কার্যকলাপ পরীক্ষা করে চলেন। এই পর্যবেক্ষণের উদ্দেশ্য হল, গুরুতর জটিলতা দেখা দেওয়ার আগেই সতর্ক সংকেত চিহ্নিত করা।
শারীরিক অবস্থা উদ্বেগজনক। ছবি: সংগৃহীত
দীর্ঘ অনশনের ঝুঁকি কতটা?
বিশেষজ্ঞদের মতে, উপবাস যত দীর্ঘ হয়, ঝুঁকিও তত বাড়তে থাকে। শরীরে মারাত্মক জলশূন্যতা তৈরি হতে পারে, রক্তচাপ বিপজ্জনকভাবে নেমে যেতে পারে, ইলেকট্রোলাইটের ভারসাম্য নষ্ট হওয়ায় হৃদ্যন্ত্রের ছন্দে সমস্যা দেখা দিতে পারে। পাশাপাশি পেশির ক্ষয়, ভিটামিন ও খনিজের ঘাটতি, রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যাওয়া এবং কিডনির ক্ষতির মতো জটিলতাও তৈরি হতে পারে।
আপাতত স্থিতিশীল, তবু সতর্ক চিকিৎসকেরা
চিকিৎসকদের দাবি, সোনম ওয়াংচুক এখনও শারীরিকভাবে স্থিতিশীল এবং মানসিকভাবে সম্পূর্ণ সচেতন। কিন্তু দীর্ঘ উপবাসের ক্ষেত্রে এই স্থিতিশীলতা যে কোনও সময় বদলে যেতে পারে। প্রয়োজন হলে রোগীর সম্মতি নিয়ে শিরার মাধ্যমে তরল, গ্লুকোজ ও ইলেকট্রোলাইট দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হতে পারে, যাতে প্রাণঘাতী জটিলতার ঝুঁকি এড়ানো যায়।
ওয়াংচুকের অনশন মনে করিয়ে দিচ্ছে, দীর্ঘ উপবাস শুধু ওজন কমায় না, শরীরের বিপাকক্রিয়া, পেশি, কিডনি এবং হৃদ্যন্ত্রের উপরও গভীর প্রভাব ফেলে। তাই এমন পরিস্থিতিতে নিয়মিত চিকিৎসা পর্যবেক্ষণ ছাড়া দীর্ঘ সময় উপবাসে থাকা কখনওই নিরাপদ নয়।
