পরিবেশ আন্দোলনের অন্যতম পরিচিত মুখ সোনম ওয়াংচুকের হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার ঘটনা শুধু রাজনৈতিক বা প্রশাসনিক বিতর্কই তৈরি করেনি, নতুন করে আলোচনায় এনেছে রোগীর অধিকার। একজন মানুষ হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার পর তাঁর চিকিৎসা, ব্যক্তিগত তথ্য এবং সিদ্ধান্ত নেওয়ার স্বাধীনতা কতটা সুরক্ষিত? এই প্রশ্নই এখন উঠে আসছে বিভিন্ন মহলে।
সম্প্রতি সফদরজং হাসপাতাল ও বর্ধমান মহাবীর মেডিক্যাল কলেজের (ভিএমএমসি) রেসিডেন্ট ডক্টরস অ্যাসোসিয়েশন (আরডিএ) রাষ্ট্রপতি দ্রৌপদী মুর্মুর কাছে আবেদন জানিয়ে বলেছে, হাসপাতালে ভর্তি প্রত্যেক রোগীর মর্যাদা, মানবিক আচরণ এবং আইনসম্মত চিকিৎসা নিশ্চিত করা উচিত। পরে দিল্লি হাইকোর্ট নির্দেশ দেয়, সোনম ওয়াংচুককে মেদান্ত হাসপাতালে স্থানান্তর করা যাবে এবং তাঁর সমস্ত চিকিৎসা-সংক্রান্ত নথি সেখানকার চিকিৎসকদের হাতে তুলে দিতে হবে।
এই ঘটনার পরই সামনে এসেছে একটি গুরুত্বপূর্ণ বাস্তবতা। ভারতে অধিকাংশ মানুষই জানেন না, হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার পর তাঁদের কী কী অধিকার রয়েছে। অথচ এই অধিকারগুলি জানলে চিকিৎসা নিয়ে সচেতন সিদ্ধান্ত নেওয়া যেমন সহজ হয়, তেমনই অপ্রয়োজনীয় হয়রানি বা বিভ্রান্তি থেকেও রক্ষা পাওয়া যায়।
আইনজীবীদের মতে, ভারতীয় আইনে রোগীদের জন্য একাধিক গুরুত্বপূর্ণ সুরক্ষা রয়েছে। তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য পাঁচটি অধিকার সম্পর্কে জেনে রাখা জরুরি।
সোনম ওয়াংচুক। ছবি: সংগৃহীত
১. নিজের চিকিৎসার নথি পাওয়ার অধিকার
হাসপাতালে চিকিৎসা করালেই সমস্ত রিপোর্ট বা কেস হিস্ট্রি হাসপাতালের সম্পত্তি হয়ে যায়, এমন ধারণা ভুল। রোগী চাইলে প্রেসক্রিপশন, পরীক্ষার রিপোর্ট, ডিসচার্জ সামারি-সহ প্রয়োজনীয় সমস্ত চিকিৎসা-সংক্রান্ত নথির কপি পেতে পারেন। নিয়ম অনুযায়ী, ভর্তি হওয়ার ২৪ ঘণ্টার মধ্যে প্রয়োজনীয় পরীক্ষার রিপোর্ট এবং হাসপাতাল থেকে ছাড়া পাওয়ার ৭২ ঘণ্টার মধ্যে ডিসচার্জ সামারি দেওয়ার কথা।
২. দ্বিতীয় চিকিৎসকের মতামত নেওয়ার অধিকার
চিকিৎসকের পরামর্শ নিয়ে কোনও সন্দেহ বা সংশয় থাকলে অন্য বিশেষজ্ঞের মতামত নেওয়া রোগীর সম্পূর্ণ অধিকার। হাসপাতাল প্রয়োজনীয় নথি দিতে বাধ্য এবং দ্বিতীয় মতামত নেওয়ার কারণে রোগীর চিকিৎসায় কোনও ধরনের বৈষম্য করা যায় না। বিশেষ করে বড় অস্ত্রোপচার, জটিল রোগ বা ব্যয়বহুল চিকিৎসার আগে দ্বিতীয় মতামত নেওয়া অনেক ক্ষেত্রেই গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিতে সাহায্য করে।
৩. হাসপাতালের বাইরে থেকে ওষুধ বা পরীক্ষা করানোর স্বাধীনতা
অনেক হাসপাতাল নিজেদের ফার্মেসি বা ডায়াগনস্টিক সেন্টার ব্যবহারের পরামর্শ দেয়। তবে সাধারণভাবে রোগীকে সেখান থেকেই ওষুধ কিনতে বা পরীক্ষা করাতেই হবে, এমন কোনও বাধ্যবাধকতা নেই। একই ওষুধ বাইরে কম দামে পাওয়া গেলে রোগী সেখান থেকে কিনতে পারেন। আবার স্বীকৃত অন্য কোনও পরীক্ষাগার থেকেও প্রয়োজনীয় পরীক্ষা করানোর সুযোগ রয়েছে।
জানুন রোগীর অধিকার। ছবি: সংগৃহীত
৪. চিকিৎসার খরচের স্বচ্ছ হিসাব চাওয়ার অধিকার
অস্ত্রোপচার বা অন্য কোনও চিকিৎসা শুরুর আগে হাসপাতালের কাছে সম্ভাব্য খরচের বিস্তারিত হিসাব চাওয়া রোগীর অধিকার। চিকিৎসকের ফি, বিভিন্ন পরীক্ষা, অস্ত্রোপচার, বেড বা কেবিন চার্জ এবং অন্যান্য খরচ আলাদা করে জানাতে হবে। এতে রোগী ও তাঁর পরিবার আগেভাগেই আর্থিক পরিকল্পনা করতে পারেন এবং অপ্রত্যাশিত খরচের ধাক্কা এড়ানো সম্ভব হয়।
৫. ব্যক্তিগত স্বাস্থ্য তথ্যের গোপনীয়তা
ডিজিটাল পার্সোনাল ডেটা প্রোটেকশন (ডিপিডিপি) আইন কার্যকর হওয়ার পর রোগীর স্বাস্থ্য-সংক্রান্ত তথ্য সুরক্ষিত রাখা হাসপাতালের আইনি দায়িত্ব। রোগী জানতে চাইতে পারেন তাঁর তথ্য কীভাবে ব্যবহার করা হচ্ছে, কার সঙ্গে ভাগ করা হচ্ছে এবং প্রয়োজনে ভুল তথ্য সংশোধনের আবেদন বা তথ্য ভাগ করে নেওয়ার সম্মতি প্রত্যাহারও করতে পারেন।
সচেতন রোগীই নিরাপদ রোগী
সোনম ওয়াংচুকের হাসপাতাল-পর্ব আবারও মনে করিয়ে দিল, রোগীর অধিকার শুধু আইনের বিষয় নয়, এটি উন্নত ও মানবিক স্বাস্থ্য পরিষেবার অন্যতম ভিত্তি। নিজের অধিকার সম্পর্কে সচেতন থাকলে রোগী যেমন আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে চিকিৎসা সংক্রান্ত সিদ্ধান্ত নিতে পারেন, তেমনই বজায় থাকে চিকিৎসা ব্যবস্থার স্বচ্ছতাও।
