অনুভূতিকে চেপে রাখা শুধু মন নয়, শরীরের উপরও প্রভাব ফেলে। বিশেষজ্ঞদের মতে, নিজের অনুভূতি প্রকাশ করলে মানসিক চাপ কমে, মন শান্ত হয় এবং সামগ্রিক সুস্থতা বাড়ে।
আমরা অনেক সময় নীরবতাকেই শক্তি বলে মনে করি। নিজের কষ্ট নিজে সামলানো, অন্যকে 'বিরক্ত' না করা, এসব যেন দায়িত্বশীলতার লক্ষণ। কিন্তু এই নীরবতাই ধীরে ধীরে আমাদের ক্ষতি করে। মনোবিদদের মতে, নিজের সমস্যার কথা না বলা আপনাকে মানসিকভাবে শক্তিশালী করে না, বরং আরও ভঙ্গুর করে তোলে।
নীরবতা নয়, প্রকাশেই সুস্থতা। ছবি: সংগৃহীত
কেন মানুষ চুপ করে কষ্ট সহ্য করেন?
আমাদের চারপাশেই বহু মানুষ আছেন, যারা চুপচাপ উদ্বেগ, দুঃখ আর চাপ বয়ে নিয়ে চলেন। অনেকেই সরাসরি মানসিক সমস্যার কথা বলেন না। তারা মাথাব্যথা, ক্লান্তি বা ঘুমের সমস্যার কথা বলেন, কিন্তু এর আড়ালে থাকে জমে থাকা মানসিক চাপ, দুঃখ বা উদ্বেগ।
পরিসংখ্যান উপেক্ষা করার মতো নয়
বিশ্বজুড়ে প্রতি ৮ জনে ১ জন কোনও না কোনও মানসিক সমস্যায় ভোগেন। ভারতে প্রায় ১০.৬% প্রাপ্তবয়স্ক এই সমস্যার শিকার এবং প্রায় ১৫% মানুষের জীবনের কোনও না কোনও সময়ে চিকিৎসার প্রয়োজন হয়। তবুও, প্রায় ৮০% মানুষই সঠিক চিকিৎসা পান না।
কথা বললে মস্তিষ্কে কী ঘটে
অনুভূতি প্রকাশ করা শুধু আবেগের বিষয় নয়, এটি বৈজ্ঞানিকও। যখন আপনি নিজের অনুভূতিকে শব্দে প্রকাশ করেন, তখন মস্তিষ্কের ‘অ্যামিগডালা’-র কার্যকলাপ কমে যায়, যা ভয় ও চাপের সঙ্গে জড়িত।
সহজভাবে বললে, কথা বলা আপনার মস্তিষ্ককে শান্ত করে। এতে ‘অক্সিটোসিন’ নামের একটি হরমোন নিঃসৃত হয়, যা নিরাপত্তা, বিশ্বাস এবং সংযোগের অনুভূতি বাড়ায়, উদ্বেগ কমায়। তাই কারও সঙ্গে মনের কথা বলার পর যে স্বস্তি আসে, তার পেছনে রয়েছে বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা।
চেপে রাখা নয়, বলা জরুরি। ছবি: সংগৃহীত
নীরবতা ক্ষতিকর
অনুভূতি এড়িয়ে গেলে বা চেপে রাখলে সমস্যাটা মুছে যায় না। বরং শরীর-মন আরও চাপের মধ্যে পড়ে। দীর্ঘমেয়াদে এটি মানসিক ও আবেগজনিত সমস্যাকে বাড়িয়ে দিতে পারে। নীরবতা শক্তি নয়, অনেক সময় এটি ক্ষতিকরও হতে পারে।
কথা বলা এত কঠিন কেন
জানার পরও অনেকেই মুখ খুলতে পারেন না। বিচার হওয়ার ভয়, নিজেকে দুর্বল মনে হওয়া, সামাজিক কলঙ্ক- এসবই বাধা হয়ে দাঁড়ায়। কিন্তু নিজের অনুভূতি ভাগ করে নেওয়া মানে দুর্বলতা নয়, বরং মানবিকতা।
কথাতেই মানসিক শান্তি। ছবি: সংগৃহীত
কীভাবে শুরু করবেন?
- সবকিছু একসঙ্গে বলতে হবে না। ছোট করে শুরু করুন। যেমন, 'কিছুদিন ধরে ভালো লাগছে না', এই একটি বাক্যই হতে পারে প্রথম পদক্ষেপ।
- বিশ্বাসযোগ্য কাউকে বেছে নিন, যিনি বিচার না করে শুনবেন।
- কথা বলতে অসুবিধা হলে লিখেও শুরু করতে পারেন। গবেষণায় দেখা গেছে, লিখে বা বলে অনুভূতি প্রকাশ করলে মস্তিষ্ক একইভাবে সাড়া দেয়।
- যদি দু-সপ্তাহের বেশি সময় ধরে মন খারাপ, ক্লান্তি বা অন্য উপসর্গ থাকে, তাহলে বিশেষজ্ঞের সাহায্য নেওয়া জরুরি।
সমস্যা হয়তো সঙ্গে সঙ্গে মিটবে না, কিন্তু আপনি আর একা থাকবেন না, এটাই সবচেয়ে বড় পরিবর্তন। কারণ, মনের কথা বলা শুধু শেয়ার করা নয়, এটি নিজের প্রতি যত্ন নেওয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ উপায়।
