স্ট্রোক এমন এক অসুখ, যা কয়েক মুহূর্তের মধ্যেই একজন সুস্থ মানুষকে ঠেলে দিতে পারে মৃত্যুর মুখে বা আজীবনের জন্য অক্ষম করে দিতে পারে। বিশ্বজুড়ে মৃত্যুর অন্যতম প্রধান কারণ এই রোগ। ভারতে গত কয়েক বছরে স্ট্রোকের সংখ্যা উদ্বেগজনক হারে বেড়েছে। এর নেপথ্যে রয়েছে এক 'নীরব' শত্রু, যার উপস্থিতি অনেকেই টের পান না। সেটি হল উচ্চ রক্তচাপ বা হাইপারটেনশন।
বিশ্ব মস্তিষ্ক দিবসে (World Brain Day) বিশেষজ্ঞরা বলছেন, স্ট্রোকের সবচেয়ে বড় ঝুঁকির কারণ উচ্চ রক্তচাপ। আর এর সঙ্গে যদি হার্টের সমস্যা থাকে, তাহলে বিপদ আরও কয়েক গুণ বেড়ে যায়। ভারতে উচ্চ রক্তচাপ ও হৃদরোগের প্রকোপ ক্রমশ বাড়ছে। সেই কারণেই স্ট্রোক এখন বড় জনস্বাস্থ্য সমস্যা হয়ে উঠেছে। তবে সবচেয়ে আশাব্যঞ্জক বিষয় অধিকাংশ স্ট্রোকই প্রতিরোধ করা সম্ভব।
কেন উচ্চ রক্তচাপকে 'নীরব ঘাতক' বলা হয়?
উচ্চ রক্তচাপের সবচেয়ে বড় সমস্যা হল, এটি বছরের পর বছর শরীরের ভেতরে ক্ষতি করলেও অনেক সময় কোনও লক্ষণই দেখা দেয় না। এই সময়েই মস্তিষ্কে রক্ত বহনকারী ধমনিগুলি ধীরে ধীরে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। রক্তনালিগুলি শক্ত, সরু ও ভঙ্গুর হয়ে পড়ে। এর ফলেই স্ট্রোকের আশঙ্কা বাড়ে।
উচ্চ রক্তচাপ থেকে মূলত দু'ধরনের স্ট্রোক হতে পারে-
ইসকিমিক স্ট্রোক: রক্তের জমাট মস্তিষ্কে রক্তপ্রবাহ বন্ধ করে দেয়।
হেমোরেজিক স্ট্রোক: রক্তনালি ফেটে মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণ হয়।
বিশ্বজুড়ে প্রায় ৪০ শতাংশ স্ট্রোকের পিছনে উচ্চ রক্তচাপ দায়ী বলে বিশেষজ্ঞদের ধারণা। তাই রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে রাখা মানেই স্ট্রোকের ঝুঁকি অনেকটাই কমিয়ে ফেলা।
উচ্চ রক্তচাপকে অবহেলা নয়। ছবি: সংগৃহীত
হৃদরোগ থাকলে কেন বিপদ আরও বাড়ে?
শুধু উচ্চ রক্তচাপ নয়, হৃদরোগও স্ট্রোকের অন্যতম বড় কারণ। বিশেষ করে অ্যাট্রিয়াল ফাইব্রিলেশন, করোনারি ধমনির রোগ, হার্ট ফেলিওর, কার্ডিওমায়োপ্যাথি এবং হার্টের ভালভের রোগ থাকলে স্ট্রোকের ঝুঁকি অনেকটাই বেড়ে যায়।
অ্যাট্রিয়াল ফাইব্রিলেশনের ক্ষেত্রে অনিয়মিত হৃদস্পন্দনের কারণে হৃদযন্ত্রের ভেতরে রক্ত জমে রক্তের দলা তৈরি হতে পারে। সেই জমাট বাধা রক্ত মস্তিষ্কে পৌঁছে ধমনি আটকে দিলে মুহূর্তের মধ্যে প্রাণঘাতী স্ট্রোক হতে পারে।
কেন ভারতীয়দের আরও সতর্ক হওয়া উচিত?
ভারতে প্রায় প্রতি চারজন প্রাপ্তবয়স্কের মধ্যে একজন উচ্চ রক্তচাপে আক্রান্ত। কিন্তু তাঁদের অনেকেই জানেন না যে তাঁদের রক্তচাপ বেশি, আবার অনেকের চিকিৎসা চললেও তা নিয়ন্ত্রণে থাকে না।
উদ্বেগের বিষয়, এখন কম বয়সিদের মধ্যেও স্ট্রোকের ঘটনা বাড়ছে। ভারতে স্ট্রোকের তথ্য অনুযায়ী, প্রতি সাতজন স্ট্রোক আক্রান্তের মধ্যে একজনের বয়স ৪৫ বছরের কম। যাঁদের পরিবারে উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস, হৃদরোগ বা স্ট্রোকের ইতিহাস রয়েছে, তাঁদের ৩০ বছর বয়সের পর থেকেই নিয়মিত রক্তচাপ পরীক্ষা করা উচিত।
স্ট্রোক ঠেকাতে কী করবেন?
- নিয়মিত রক্তচাপ পরীক্ষা করুন
- চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী ওষুধ খান
- নুন কম খান এবং সুষম খাদ্যাভ্যাস বজায় রাখুন
- সপ্তাহে অন্তত ১৫০ মিনিট শরীরচর্চা করুন
- ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখুন
- ধূমপান ও তামাকজাত দ্রব্য এড়িয়ে চলুন
- ডায়াবেটিস ও কোলেস্টেরল নিয়ন্ত্রণে রাখুন
- হার্টের সমস্যা থাকলে নিয়মিত চিকিৎসকের ফলোআপে থাকুন
ঝুঁকি অনেক আগে থেকেই শরীরে তৈরি হতে থাকে। ছবি: সংগৃহীত
স্ট্রোকের এই লক্ষণগুলি দেখলে দেরি নয়
স্ট্রোকের চিকিৎসায় প্রতিটি মিনিট গুরুত্বপূর্ণ। তাই এই লক্ষণগুলির কোনওটি দেখা দিলে দ্রুত হাসপাতালে যেতে হবে-
- মুখের এক পাশ হঠাৎ বেঁকে যাওয়া
- হাত বা পায়ের এক পাশ অবশ হয়ে যাওয়া
- কথা জড়িয়ে যাওয়া বা কথা বুঝতে অসুবিধা হওয়া
- হঠাৎ দৃষ্টিশক্তি ঝাপসা হয়ে যাওয়া
- তীব্র মাথা ঘোরা বা ভারসাম্য হারানো
মনে রাখবেন, স্ট্রোক হঠাৎ হয় ঠিকই, কিন্তু তার ঝুঁকি অনেক আগে থেকেই শরীরে তৈরি হতে থাকে। তাই নিয়মিত রক্তচাপ পরীক্ষা, হার্টে সমস্যা থাকলে তার চিকিৎসা এবং স্বাস্থ্যকর জীবনযাপনই হতে পারে মস্তিষ্ককে সুরক্ষিত রাখার সবচেয়ে কার্যকর উপায়।
