রাস্তায় দাঁড়িয়ে রয়েছেন একজন। চোখ খোলা, অথচ আশপাশের কিছুই যেন বুঝতে পারছেন না। শরীরের নড়াচড়া অত্যন্ত ধীর, কথায় সাড়া নেই, হাঁটার ক্ষমতাও প্রায় হারিয়ে ফেলেছেন। দূর থেকে দেখলে মনে হতে পারে, মানুষটি যেন হঠাৎ ‘জম্বি’ হয়ে গিয়েছেন। সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া এমনই একাধিক ভিডিওকে ঘিরে সম্প্রতি আলোচনায় এসেছে ‘জম্বি ড্রাগ’।
‘জম্বি ড্রাগ’ নামে কি কোনও নির্দিষ্ট মাদক আছে?
‘জম্বি ড্রাগ’ কোনও চিকিৎসাবিজ্ঞানের পরিভাষা নয়। সংবাদমাধ্যম এবং সামাজিক মাধ্যমে এমন কিছু মাদক বা মাদকের সংমিশ্রণকে বোঝাতে এই শব্দটি ব্যবহার করা হয়, যার প্রভাবে মানুষের চেতনা, হাঁটাচলা এবং সাড়া দেওয়ার ক্ষমতা মারাত্মকভাবে কমে যেতে পারে।
সাম্প্রতিক সময়ে এই শব্দটির সঙ্গে সবচেয়ে বেশি আলোচিত হয়েছে জাইলাজিন। এটি মূলত পশুচিকিৎসায় ব্যবহৃত একটি সেডেটিভ বা ঘুমপাড়ানি ওষুধ। অবৈধ মাদকের সরবরাহে জাইলাজিন পাওয়া গিয়েছে এবং অনেক ক্ষেত্রে এটি ফেন্টানিলের মতো ওপিওয়েডের সঙ্গে মেশানো হয়।
জাইলাজিন কেন্দ্রীয় স্নায়ুতন্ত্রের কার্যকলাপ কমিয়ে দেয়। ফলে দেখা দিতে পারে প্রবল তন্দ্রা, ঝিমুনি, শরীরের ভারসাম্য নষ্ট হওয়া, হাঁটাচলা ধীর হয়ে যাওয়া এবং আশপাশের মানুষের সঙ্গে স্বাভাবিকভাবে যোগাযোগের ক্ষমতা কমে যাওয়া।
আচরণে জম্বি! ছবি: সংগৃহীত
কেন মানুষকে ‘জম্বির মতো’ দেখায়?
‘জম্বির মতো’ আচরণের পিছনে আসলে রয়েছে মস্তিষ্ক ও স্নায়ুতন্ত্রের উপর মাদকের গভীর প্রভাব। ব্যক্তি হয়তো দাঁড়িয়ে আছেন বা বসে আছেন, কিন্তু তাঁর শরীরের নড়াচড়া অত্যন্ত ধীর। চোখ খোলা থাকলেও চারপাশ সম্পর্কে সচেতনতা কমে যেতে পারে। প্রশ্ন করলে উত্তর দিতে দেরি হতে পারে, হাঁটতে গেলে ভারসাম্য হারাতে পারেন। কখনও আবার এতটাই তন্দ্রাচ্ছন্ন হয়ে পড়েন যে প্রায় অজ্ঞান বলে মনে হয়।
এই অবস্থার তীব্রতা নির্ভর করে কোন মাদক নেওয়া হয়েছে, কতটা নেওয়া হয়েছে, অন্য কোনও মাদকের সঙ্গে তা মেশানো হয়েছে কি না এবং ব্যক্তির শারীরিক অবস্থার উপর।
তাই কাউকে এমন অবস্থায় দেখলে ‘নেশা করে ঘুমিয়ে পড়েছেন’ ভেবে বিষয়টি এড়িয়ে যাওয়া বিপজ্জনক। চেতনা কমে যাওয়া বা সাড়া না দেওয়া কখনও কখনও প্রাণঘাতী ওভারডোজের লক্ষণ হতে পারে।
নেশার সঙ্গে অ্যালকোহল মিশলে বিপদ আরও বাড়ে
ঝুঁকি সবচেয়ে বেশি বাড়তে পারে যখন এই ধরনের মাদকের সঙ্গে ওপিওয়েড, অ্যালকোহল, ঘুমের ওষুধ বা অন্য কোনও সেডেটিভ নেওয়া হয়। গুরুতর ওভারডোজে শ্বাস অত্যন্ত ধীর হয়ে যেতে পারে। শরীরে অক্সিজেনের মাত্রা কমে যেতে পারে, রক্তচাপ হঠাৎ নেমে যেতে পারে, হৃদ্স্পন্দনে অস্বাভাবিকতা দেখা দিতে পারে। এমনকী কোমা বা মৃত্যু পর্যন্ত হতে পারে।
বিশেষ করে অবৈধ মাদকের ক্ষেত্রে একটি বড় সমস্যা হল, তাতে আসলে কী কী পদার্থ কতটা পরিমাণে রয়েছে, তা ব্যবহারকারী নিজেও অনেক সময় জানেন না। ফলে একই পরিমাণ মাদক একেকজনের শরীরে একেক রকম প্রতিক্রিয়া তৈরি করতে পারে।
নেশায় কাবু। ছবি: সংগৃহীত
এই লক্ষণগুলি দেখলে বুঝবেন বিপদ গুরুতর
- অনেক ডাকাডাকিতেও জাগানো যাচ্ছে না
- শ্বাস খুব ধীর বা অনিয়মিত
- ঠোঁট বা ত্বক নীলচে, ধূসর বা অস্বাভাবিক ফ্যাকাশে
- তীব্র বিভ্রান্তি বা দিশেহারা ভাব
- খুব ধীর হৃদ্স্পন্দন বা দুর্বল নাড়ি
- অচেতন হয়ে যাওয়া
- খিঁচুনি
- দ্রুত শারীরিক অবস্থার অবনতি
কাউকে এমন অবস্থায় দেখলে কী করবেন?
আক্রান্ত ব্যক্তিকে ‘ঘুমিয়ে নিক, ঠিক হয়ে যাবে’ বলে একা রেখে দেওয়া যাবে না। তিনি অচেতন হলেও যদি স্বাভাবিকভাবে শ্বাস নেন, তাহলে তাঁকে পাশ ফিরিয়ে রিকভারি পজিশনে রাখতে হবে। এতে বমি হলে শ্বাসনালিতে ঢুকে যাওয়ার ঝুঁকি কমে।
আর যদি স্বাভাবিক শ্বাস না থাকে বা শুধু হাঁপানোর মতো শ্বাস নিতে থাকেন, প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত কেউ থাকলে সিপিআর শুরু করতে হবে। কাছে এইডি (AED) থাকলে সেটিও ব্যবহার করা যেতে পারে। প্রয়োজনে দ্রুত হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া জরুরি।
কোনও অসুখের সতর্কবার্তাও হতে পারে। ছবি: সংগৃহীত
ভুলেও যা করবেন না
- বমি করানোর চেষ্টা করবেন না। অচেতন বা অত্যন্ত তন্দ্রাচ্ছন্ন ব্যক্তির মুখে জল, খাবার, কফি বা কোনও ওষুধ দেবেন না। শ্বাসনালিতে ঢুকে তা শ্বাসরোধ করতে পারে।
- তাঁকে জোর করে হাঁটানোর চেষ্টা করবেন না। একা ছেড়ে দেবেন না। আর অস্বাভাবিক নাক ডাকার মতো শব্দ বা খুব ধীর শ্বাসকে ‘গভীর ঘুম’ বলে ধরে নেবেন না।
‘জম্বি ড্রাগ’ নিয়ে সবচেয়ে বড় ভুল ধারণা
‘জম্বি ড্রাগ’ শুনে অনেকেই মনে করেন, এটি একটি নির্দিষ্ট নতুন মাদক। আসলে তা নয়। এটি একটি প্রচলিত নাম, কোনও একটি নির্দিষ্ট রাসায়নিকের নাম নয়। ‘জম্বির মতো’ আচরণের পিছনে একাধিক মাদক বা মাদকের সংমিশ্রণ থাকতে পারে। সঠিক কারণ জানতে প্রয়োজন হলে চিকিৎসকের শারীরিক পরীক্ষা এবং টক্সিকোলজি পরীক্ষা করতে হতে পারে।
তাই কাউকে অস্বাভাবিক ভাবে ধীর, ঘুমন্ত, বিভ্রান্ত বা সাড়াহীন অবস্থায় দেখলে তাকে নিয়ে ভিডিয়ো করার আগে সাহায্য করুন। কারণ ‘জম্বির মতো’ দেখালেও বিষয়টি নিছক নেশা নাও হতে পারে, কখনও সেটিই হতে পারে প্রাণ বাঁচানোর শেষ সতর্কবার্তা।
