জীবাশ্ম জ্বালানির গেরো কাটিয়ে পরমাণু বিদ্যুৎ উৎপাদনে বিরাট সাফল্য ভারতের। সম্পূর্ণ দেশীয় প্রযুক্তিতে তৈরি ভারতের পরমাণু চুল্লিতে নিয়ন্ত্রিত পরিবেশে স্বয়ংক্রিয়ভাবে চেন রিঅ্যাকশনে সফল দেশের বিজ্ঞানীরা। যা জ্বালানি উৎপাদনে এক বিরাট মাইলফলক। নয়া এই প্রযুক্তি জ্বালানির তুলনায় অধিক বিদ্যুৎ উৎপাদনে সক্ষম। তামিলনাড়ুর কল্পাক্কামে প্রোটোটাইপ ফার্স্ট ব্রিডার রিঅ্যাক্টর (পিএফবিআর)-এর এই সাফল্যের কথা প্রকাশ্যে এনেছেন খোদ প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। জানা যাচ্ছে, রাশিয়ার পর দ্বিতীয় দেশ হিসেবে এই সাফল্য পেয়েছে ভারত।
ভারতের এই বিরাট সাফল্যের কথা প্রকাশ্যে এনে মঙ্গলবার এক্স হ্যান্ডেলে প্রধানমন্ত্রী লিখেছেন, 'বেসামরিক পারমাণবিক যাত্রায় এক যুগান্তকারী সাফল্য অর্জন করেছে ভারত। কল্পাক্কামে পিএফবিআর-এর সাফল্যের জেরে দেশের পারমাণবিক কর্মসূচির দ্বিতীয় পর্যায়ে পৌঁছে গিয়েছে। এই রিঅ্যাক্টর ব্যবহৃত জ্বালানির তুলনায় অধিক পরিমাণে শক্তি উৎপাদন করতে সক্ষম। যা পরমাণু বিজ্ঞানের জগতে এক অসামান্য কীর্তি। এই সাফল্য ভারতের জন্য এক গর্বের মুহূর্ত। আমাদের বিজ্ঞানীদের অভিনন্দন। এই কর্মসূচির তৃতীয় ধাপে আমাদের লক্ষ্য ভারতের বিশাল থোরিয়ামের ভাণ্ডারকে কাজে লাগানো।'
কী এই বিশেষ পারমাণবিক চুল্লি?
এই বিষয়ে ব্যাখ্যা করার আগে পরমাণু শক্তির বিষয়ে জানা প্রয়োজন। পরমাণু হল যে কোনও কিছুর ক্ষুদ্রতম সাংগঠনিক একক যার কেন্দ্রে থাকে নিউক্লিয়াস নামের এক গোলক। অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে এতে বিস্ফোরণ ঘটালে প্রচুর পরিমাণে তাপশক্তি উৎপন্ন করে। যা জলকে বাষ্পে পরিণত করে সেই বাষ্পের মাধ্যমে ঘোরানো হয় টারবাইন। এখান থেকে যে বিদ্যুৎ উৎপাদন করা হয় তাকেই বলে পারমাণবিক শক্তি। যা পরিবেশ বান্ধব। ভারতের এই বিশেষ পারমাণবিক চুল্লি পিএফবিআর পৌঁছে গিয়েছে এক বিশেষ পর্যায়ে যাকে বলা হচ্ছে 'ক্রিটিক্যালিটি'।
নয়া এই প্রযুক্তি জ্বালানির তুলনায় অধিক বিদ্যুৎ উৎপাদনে সক্ষম।
কী এই পর্যায়?
এই বিশেষ পর্যায়কে একটি গাড়ির সঙ্গে তুলনা করা যেতে পারে। উদাহরণ স্বরূপ, আপনি চাবি ঘুরিয়ে একটি গাড়ির ইঞ্জিন চালু করলেন। ইঞ্জিন চালু হয়ে গেলে সেটি একটানা চলতে শুরু করল। একইভাবে পারমাণবিক চুল্লিতে শক্তি উৎপন্ন করার জন্য একটি শৃঙ্খল বিক্রিয়া শুরু করতে হয়, যখন এই বিক্রিয়া কোনও বাহ্যিক সহায়তা ছাড়া নিয়ন্ত্রিতভাবে, একটানা চলতে থাকে, তখন বিজ্ঞানের ভাষায় একে বলা হয় 'ক্রিটিক্যালিটি'। যার কাজ জ্বালানির তুলনায় বেশি পরিমাণে শক্তি উৎপাদন করা। ধরুন আপনি আপনার গাড়িতে ১ লিটার পেট্রোল ভরলেন, সারাদিন গাড়ি চালানোর পর আপনি দেখলেন তাতে ১.৫ লিটার পেট্রোল। অর্থাৎ প্রোটোটাইপ ফার্স্ট ব্রিডার রিঅ্যাক্টরের কাজই হল, এটি যতটা জ্বালানি ব্যবহার করবে তার চেয়ে বেশি উৎপাদন করবে।
বিরাট জনসংখ্যার কারণে ভারতে বিদ্যুতের চাহিদা ব্যাপক। কেন্দ্রের লক্ষ্য দেশের পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের উৎপাদন ক্ষমতাকে ৮ গিগাওয়াট থেকে বাড়িয়ে ১০০ গিগাওয়াটে নিয়ে যাওয়া। সেই লক্ষ্যপূরণে দেশের বিজ্ঞানীরা পরমাণু কর্মসূচির তৃতীয় ধাপ অর্থাৎ ইউরেনিয়ামের পরিবর্তে থোরিয়ামকে কাজে লাগাতে চাইছেন। ভারতের উপকূলীয় রাজ্যগুলি, বিশেষ করে কেরল, তামিলনাড়ু, অন্ধ্রপ্রদেশ এবং ওড়িশা থোরিয়ামে সমৃদ্ধ। বৈশ্বিক থোরিয়াম রিজার্ভের প্রায় ২৫% ভারতেই রয়েছে। এক টন থোরিয়াম ইউরেনিয়ামের চেয়ে অনেক বেশি শক্তি উত্পন্ন করার ক্ষমতা রাখে। এক কেজি থোরিয়াম থেকে ৮০ থেকে ৯০ লক্ষ কিলোওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন করা সম্ভব, যা হাজারটি বাড়িতে বিদ্যুৎ সরবরাহ করার জন্য যথেষ্ট। ভারতের পরমাণু শক্তি এই ধাপে উন্নীত হলে জ্বালানির ও বিদ্যুতের জন্য ভারতকে আর আরও উপর নির্ভরশীল থাকতে হবে না।
রাশিয়ার পর দ্বিতীয় দেশ হিসেবে এই সাফল্য পেয়েছে ভারত।
তবে পরমাণু ক্ষেত্রে সাফল্যের পাশাপাশি রয়েছে বিপদের ঝুঁকিও। এই ধরনের চুল্লি থেকে নির্গত জল ও ছাই অত্যন্ত তেজস্ক্রিয়। যা প্রকৃতিতে মিশে বিপদ বাড়ানোর ঝুঁকি রয়েছে। এইসব তেজস্ক্রিয় পদার্থ জলে বাতাসে মিশলে এবং মানুষ এর সংস্পর্শে এলে ক্যানসার-সহ নানা ধরনের জটিল অসুখে পড়ে মৃত্যু অনিবার্য। পারমাণবিক তেজস্ক্রিয়তা কতখানি ভয়াবহ হতে পারে তা আগেও দেখেছে ভারত। দেশের প্রধান ইউরেনিয়াম খনি ঝাড়খণ্ডের জাদুগোড়া আজও বহন করছে এই মহাশক্তির অভিশাপ। এক সমীক্ষার রিপোর্টে জানা যায়, এই অঞ্চলের ২৫ শতাংশ শিশু আজও কোনও না কোনও শারীরিক বিকলাঙ্গতা নিয়ে জন্ম নেয়। ৬৭ শতাংশ মানুষ মারা যান ৬০ বছর বা তারও আগে।
