রণে-বনে-জলে-জঙ্গলে বিপদে পড়লে যে কোনও সন্তানই সবার প্রথম মায়ের মুখখানিই মনে করে। আর মাও সন্তানের জন্য নির্দ্বিধায় নিজের সর্বস্ব ত্যাগ করতে পারে। সমস্ত রকমের বিপদের সঙ্গে লড়তে পারে একাই। সম্প্রতি এমনই এক ঘটনা জুড়ে সরগরম সোশাল মিডিয়া তথা গোটা দেশের সংবাদমাধ্যম।
জেইই (JEE) অ্যাডভান্সড পরীক্ষায় সাফল্য পেতে গেলে, সাধারণত বছরের পর বছর কঠোর পরিশ্রম করতে হয়। সঙ্গে নিয়মিত পড়াশোনা ও কোচিংয়ের ভূমিকা তো রয়েছেই। কিন্তু বিহারের সীতামঢ়ির ছাত্র গুঞ্জন কুমারের ক্ষেত্রে কাহিনি খানিক আলাদা। পরীক্ষার কয়েক মাস আগে হঠাৎই তাঁর ফুসফুসে গুরুতর সমস্যা দেখা যায়। নিউমোথোরাক্স বা collapsed lung-এর স্বীকার হয়ে, তিনি প্রায় তিন মাসের জন্য শয্যাশায়ী হয়ে পড়েন। আর এই চরমতম কঠিন সময়ে তাঁর সহযোদ্ধা হয়ে ওঠেন মা গুঞ্জাদেবী, কার্যত ছেলের ‘সহপাঠী’ হয়ে পড়াশোনা চালিয়ে যান (Mother helps son crack JEE)।
গুঞ্জন ২০২৩ সালে বিহারের সীতামঢ়ি থেকে রাজস্থানের কোটা শহরে যান জেইই পরীক্ষার প্রস্তুতি নিতে। সেখানে দুই বছর ধরে কোচিং নিয়েছিলেন। কিন্তু পরীক্ষার ঠিক আগে ভারী কিছু তোলার পর তাঁর ফুসফুসে সমস্যা দেখা দেয়। চিকিৎসকেরা জানান, তাঁর একটি ফুসফুস আংশিকভাবে বসে গিয়েছে। দীর্ঘদিন বিছানায় বিশ্রামে থাকতে হবে, ফলে নিয়মিত ক্লাসে যোগ দেওয়ার প্রশ্নই উঠছে না।
এই পরিস্থিতিতে গৃহবধূ গুঞ্জাদেবী ছেলের পড়াশোনার দায়িত্ব নিজের কাঁধে তুলে নেন। হিউম্যানিটিসের ছাত্রী ও বিএড ডিগ্রিধারী হলেও এত বছর পর নতুন করে পড়াশোনায় ফেরা নেহাত সহজ ছিল না তাঁর পক্ষে। তিনি যদিও পিছপা হননি। প্রতিদিন অনলাইন ক্লাসে বসতেন, শিক্ষকদের লেকচার মনোযোগ দিয়ে শুনে খাতায় বিস্তারিত নোট লিখতেন। পরে সেই নোট গুঞ্জনের হাতে তুলে দিতেন ও পড়া বুঝিয়ে দিতেন। অনেক সময় নিজেই বিজ্ঞান ও গণিতের নতুন বিষয় শিখে নিতেন, যাতে ছেলের শিক্ষায় কিছু বাদ না পড়ে।
শারীরিক অসুস্থতার পাশাপাশি গুঞ্জন দীর্ঘদিন ধরে গুরুতর দৃষ্টিশক্তির সমস্যায়ও ভুগছেন। প্রায় ৭০ শতাংশ দৃষ্টিশক্তিই ক্ষতিগ্রস্ত তাঁর, -৯.৫ পাওয়ারের চশমা ব্যবহার করতে হয়। এত বড় শারীরিক বাধা সত্ত্বেও, সুস্থ হওয়ার পর হাতে থাকা অল্প সময়ে তিনি আবার প্রস্তুতি শুরু করেন।
অবশেষে জেইই অ্যাডভান্সড ২০২৬ পরীক্ষায় ওবিসি ক্যাটাগরিতে ৫০তম স্থান অর্জন করেন গুঞ্জন। আইআইটি দিল্লির কম্পিউটার সায়েন্স বিভাগে ভর্তি হওয়ার সুযোগ পান। গুঞ্জন যদিও নিজের কৃতিত্বের সবটুকুই মাকে দিতে চান নির্দ্বিধায়।
গুঞ্জন ও তাঁর মায়ের এই গল্প কেবল পরীক্ষায় সাফল্যের নয়, বরং প্রতিকূলতার বিরুদ্ধে লড়াইয়ের। মায়ের অক্লান্ত পরিশ্রমই অসুস্থ সন্তানকে পৌঁছে দিয়েছে দেশের অন্যতম সেরা প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানে।
