ভোটে জেতাই একমাত্র লক্ষ্য নয়। সারাবছর জনসংযোগ, মানুষের পাশে থাকে মা-মাটি-মানুষ। নির্বাচনী প্রচারে এমনই লম্বা-চওড়া কথা শোনা গিয়েছিল তাঁর গলায়। বিশেষত নিজের সংসদীয় এলাকায় গিয়ে বারবার একথাই বলে এসেছিলেন, ‘‘আমি তো আপনাদের ঘরের ছেলে, সারাবছর আপনাদের সঙ্গে থাকি, দেখা করি।'' অথচ পরবর্তীতে বেশ প্রমাণিত হয়ে গিয়েছে, একটা নির্বাচনী পরাজয় কথা আর কাজে বিস্তর ফারাক করে দিয়েছে। বলা হচ্ছে তৃণমূলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক তথা ডায়মন্ড হারবারের সাংসদ অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের কথা।
রবিবার রাতে তিনি বাড়ি থেকে ভিডিও কল করেছিলেন নির্যাতিতার পরিবারকে। জানিয়েছেন, ‘‘আমরা পাশে আছি। বিচার পেতে যা যা দরকার, সব করব। আপনারা একটু ধৈর্য রাখুন, আমাদের উপর ভরসা রাখুন। আমি চেষ্টা করব একদিন গিয়ে আপনাদের সঙ্গে দেখা করে আসার।'' ব্যস, ওইটুকুই!
বারুইপুরে গণধর্ষণ-খুন কাণ্ড সামনে আসার পর থেকে দলে দলে রাজনৈতিক নেতারা সুবিচারের দাবিতে পথে নেমেছেন। এমনকী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ও মোমবাতি মিছিল করেছেন। আর এখানেই সমালোচিত অভিষেকের ভূমিকা। তিনি কেবল বাড়িতে বসে পরিবারকে ভিডিও কল করে পাশে থাকার আশ্বাস দিয়েছেন। লড়াইয়ের ময়দানে না থেকে কেন তিনি ঘরে? এ প্রশ্নের মুখে তো পড়তেই হচ্ছে তৃণমূলের 'যুবরাজ'কে।
বারুইপুরের নির্যাতিতার পরিবারের সঙ্গে ভিডিও কলে কথা অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের
২০২৪ সালে আর জি করে তরুণী চিকিৎসকের ধর্ষণ-খুনের ঘটনায় যখন গোটা রাজ্য আন্দোলনে উত্তাল, সেসময় শাসকদলে জনপ্রতিনিধি হওয়া সত্ত্বেও অভিষেককে সেভাবে দেখা যায়নি। এমনকী তৃণমূল নেতৃত্ব যেভাবে তৎকালীন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় সরকারের পক্ষ নিয়ে আসরে নেমে পড়েছিল, সেখানে অভিষেক আলাদাভাবে যে খুব গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিয়েছিল, তা মনে পড়ে না। আর পাঁচজনের মতো আইনে ভরসা রাখার কথা শোনা গিয়েছিল তাঁর মুখে। দীর্ঘ আন্দোলন, বিচারপ্রক্রিয়ার মাঝে অভিষেক আবার বিদেশেও চলে গিয়েছিলেন, চিকিৎসার জন্য। তবে কি পালিয়ে গেলেন? এনিয়ে কম বিতর্কের মুখে পড়তে হয়নি তাঁকে। এমন নেতিবাচক আলোচনা কানে গেলেও আত্মপক্ষ সমর্থনে কিছুই বলেননি তৃণমূল সাংসদ।
যে দক্ষিণ ২৪ পরগনায় এতদিন গেরুয়া শিবির দাঁত ফোটাতে পারেনি, সেখানে বেশিরভাগ আসনে ফুটেছে পদ্ম। এই ব্যর্থতার দায় তো নেননি অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়। এমনকী শাসক বিজেপির দ্বারা যে তৃণমূল কর্মীরা আক্রান্ত হয়েছেন, মৃত্যু পর্যন্ত বরণ করেছেন, তাঁদের পাশে গিয়ে দাঁড়াতেও বড় দেরি করেছেন তিনি। যখন গিয়েছেন, তখন তাঁকে জনবিক্ষোভের মুখে পড়তে হয়েছে। গায়ে ডিম, ইট-পাটকেলের আঘাত সইতে হয়েছে। সোনারপুরে নিহত তৃণমূল কর্মীর বাড়ি যাওয়ার পথে এই তিক্ত অভিজ্ঞতার কথা নিশ্চয়ই কখনও ভুলবেন না বরাবর কর্পোরেট অফিসে বসে দলের রণকৌশল তৈরি করা সাংসদ!
দু'বছর পেরিয়ে এখন তৃণমূলের অবস্থা অবশ্য একেবারে অন্য। ছাব্বিশের ভোটে গোহারা হেরেছে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের দল। অভিষেকের নিজের গড় ডায়মন্ড হারবার বিধানসভা কেন্দ্র তৃণমূল কোনওক্রমে নিজের দখলে রাখতে পারলেও বাকি আসনগুলি হাতছাড়া। অথচ অভিষেক নিজে দাবি করেছিলেন, রেকর্ড ভোটে সাতটি বিধানসভা আসনই তৃণমূলের দখলে আসবে।
বাস্তবে দেখা গেল ঠিক উলটো ছবি। যে দক্ষিণ ২৪ পরগনায় এতদিন গেরুয়া শিবির দাঁত ফোটাতে পারেনি, সেখানে বেশিরভাগ আসনে ফুটেছে পদ্ম। এই ব্যর্থতার দায় তো নেননি অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়। এমনকী ভোট পরবর্তী হিংসায় তৃণমূল কর্মীদের আক্রান্ত ও মৃত্যুর অভিযোগ পেয়েও তাঁদের পাশে গিয়ে দাঁড়াতেও বড় দেরি করেছেন তিনি। যখন গিয়েছেন, তখন তাঁকে জনবিক্ষোভের মুখে পড়তে হয়েছে। গায়ে ডিম, ইট-পাটকেলের আঘাত সইতে হয়েছে। সোনারপুরে নিহত তৃণমূল কর্মীর বাড়ি যাওয়ার পথে এই তিক্ত অভিজ্ঞতার কথা নিশ্চয়ই কখনও ভুলবেন না বরাবর কর্পোরেট অফিসে বসে দলের রণকৌশল তৈরি করা সাংসদ! নিশ্চয় সেই ঘটনা তাঁকে শিক্ষা দিয়েছে, এটাই আসল রাজনীতির লড়াই।
সোনারপুরে ডিম-হামলার মুখে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়, ফাইল ছবি
কিন্তু শিক্ষাগ্রহণের বদলে অভিষেক সম্ভবত আরও ভীত হয়ে পড়েছেন। সোনারপুরের সেই ঘটনার পর আর তাঁকে পথে নামতে দেখা যায়নি। সম্প্রতি বারুইপুরে ঘটে যাওয়া নৃশংস ঘটনার নিন্দায় যেখানে সকলে ঝাঁপিয়ে পড়েছেন, সেখানে তৃণমূল সাংসদ বাড়ি বসেই সক্রিয়তা দেখিয়েছেন। ঘটনার দিন অর্থাৎ রবিবার রাতে তিনি বাড়ি থেকে ভিডিও কল করেছিলেন নির্যাতিতার পরিবারকে। জানিয়েছেন, ‘‘আমরা পাশে আছি। বিচার পেতে যা যা দরকার, সব করব। আপনারা একটু ধৈর্য রাখুন, আমাদের উপর ভরসা রাখুন। আমি চেষ্টা করব একদিন গিয়ে আপনাদের সঙ্গে দেখা করে আসার।'' ব্যস, ওইটুকুই! এরপর সোমবার কালীঘাট তৃণমূলের বর্ষীয়ান নেতা বিমান বন্দ্যোপাধ্যায়, দোলা সেন, প্রতিমা মণ্ডলরা এলাকায় গিয়েছেন। এমনকী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় নিজেও মোমবাতি মিছিল করেছেন বাড়ির সামনে। শুধু পথে নেই অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়! এরপরও কি জনপ্রতিনিধি হিসেবে তাঁর ভূমিকা, রাজনৈতিক নেতা হিসেবে তাঁর যোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন উঠবে না? জনতা তো জবাব চায়।
