নিরুফা খাতুন: মনখারাপ নাকি শরীর। বারো দিন পার। জলে ঠায় দাঁড়িয়ে রয়েছে সে। খেতেও ডাঙায় উঠছে না। নাইট শেল্টারেও ফিরছে না। সেই জলহস্তীকে নিয়ে মহা বিড়ম্বনায় পড়েছে আলিপুর চিড়িয়াখানা (Alipore Zoo) কর্তৃপক্ষ। তার কী রোগ হয়েছে, কোন মনখারাপের জেরে তার এই স্বেচ্ছা 'জলবন্দি জীবনযাপন' তা ভেবে কূল পাচ্ছেন না চিকিৎসক থেকে বিশেষজ্ঞরাও।
২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে নন্দনকানন থেকে একজোড়া জলহস্তী নিয়ে আসা হয়েছিল আলিপুরে। আসার কিছুদিনের মধ্যেই মেয়ে জলহস্তীর মৃত্যু হয়। সঙ্গীর মৃত্যু-শোক কাটিয়ে ধীরে ধীরে স্বাভাবিক জীবনে ফিরে এসেছিল পুরুষটি। কিন্তু সেই যে এখন জল ছেড়ে উঠছে না। খাওয়া, রাত্রিকালীন বিশ্রামাবাস ভুলে তার এই জলে টানা বারোদিন থাকায় স্বাস্থ্য নিয়ে চিন্তিত কর্তৃপক্ষ। জলহস্তীদের শরীর বেশ ভারী। দেখতে মোটা চামড়ার হলেও আদতে তাদের ত্বক সংবেদনশীল। সেই ত্বককে রোদ থেকে রক্ষা করতে এবং শরীর ঠান্ডা রাখতে জল তাদের বড়ই প্রিয়। জল ছাড়া যেহেতু বাঁচতে পারে না তাই চিড়িয়াখানায় এদের ঘরে-বাইরে সর্বত্র জলাশয়ের ব্যবস্থা রয়েছে। আলিপুরে অন্য আবাসিকদের মতো জলহস্তীরা সকাল হলে নাইট শেল্টার থেকে বেরিয়ে পড়ে। খাঁচার জলাশয়ে সারাদিন শরীর ডুবিয়ে রাখে। আবার সন্ধে নামার আগে তারা নাইট শেল্টারে ফিরে যায়। সূত্রের খবর, বড়দিনের আগে থেকে জলহস্তীটি জলাশয়ে ঠায় দাঁড়িয়ে রয়েছে। উপরে উঠছে না।
সন্ধে গড়িয়ে রাত নামলেও হাজার চেষ্টাতেও তাকে নাইট শেল্টারমুখী করা যাচ্ছে না। প্রথমে ভাবা হয়েছিল, হয়তো পায়ে কোনও আঘাত রয়েছে তাই সে জল থেকে উঠতে পারছে না। রোগনির্ণয় করতে চিড়িয়াখানার চিকিৎসকরা তাকে জল থেকে তোলার চেষ্টাও করেন। সেজন্য জলাশয়ের জল কমানো হয়। কিন্তু জল তুলে নিতে তার শারীরিক অবস্থা আরও খারাপ হতে থাকে বলে খবর। ফলে ফের জলাশয়ে সঙ্গে সঙ্গে জল ভরে দিতে হয়েছিল। তাহলে তার ঠিক কী হয়েছে? এ ব্যপারে অবশ্য স্পষ্ট করে কিছু জানাচ্ছেন না চিড়িয়াখানার কর্তারা। আলিপুর চিড়িয়াখানর অধিকর্তা তৃপ্তি শাহ বলেন, "একটি জলহস্তী অসুস্থ। চিড়িয়াখানার পশু চিকিৎসকরা তার চিকিৎসা করছেন। তবে তার কী অসুখ হয়েছে বলা যাবে না।” এদিকে জল থেকে উঠতে না পারায় তার খাওয়া দাওয়াও ঠিকমতো হচ্ছে না। খাবারের টানে সন্ধে নামতেই নাইট শেল্টারে নিজেই চলে যেত।
এক কর্মী জানান, এখন জলাশয়ের পাড়ে জলহস্তীকে খাবার দেওয়া হচ্ছে। তবুও সে খেতে পারছে না ঠিকভাবে। জলের মধ্যেই তার চিকিৎসা চলছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এতে তার কোনও ক্ষত থাকলে সেখানে পচন ধরতে পারে, জলের মধ্যে তার চিকিৎসা সম্ভব নয়। স্নায়ুজনিত সমস্যায় পা দুর্বল হয়ে গেলে তার জল থেকে ওঠার ক্ষমতা চলে গিয়ে থাকতে পারে। কারণ প্রাপ্তবয়স্ক জলহস্তীর ওজন দু' টনেরও বেশি। স্নায়ুর সমস্যা হলে সেই শরীর জল থেকে নিজের মতো করে টেনে তোলা কঠিন।
এর আগে আলিপুরে বছর ৩৫-এর একটি জলহস্তীর দাঁতের অপারেশন করতে গিয়ে মৃত্যু হয়েছিল। তার নিচের চোয়ালের দু'দিকে থাকা ক্যানাইন বেড়ে গিয়ে নাকের পাশে চামড়া ফুটো করে ঢুকে প্রায় মস্তিষ্ক পর্যন্ত গভীর ক্ষত তৈরি করে। দাঁত নাড়াতে পারছিল না। মুখ হাঁ করলে রক্ত বের হচ্ছিল। সেই ক্ষত ম্যালিগন্যান্সির দিকে যাচ্ছিল। তার দাঁতের অস্ত্রোপচারের সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন তৎকালীন অধিকর্তা শুভঙ্কর সেনগুপ্ত। ২০২৪ সালে আগস্ট মাসে সেই অস্ত্রোপচার করতে গিয়ে অকালে প্রাণ চলে যায় বন্যপ্রাণীটির। ঘুমপাড়ানি গুলির অতিরিক্ত ডোজে জলহস্তীটির মৃত্যু হয়েছিল বলে অভিযোগ উঠেছিল।
তার মৃত্যুর একমাস পরই নন্দনকানন থেকে একটি মেয়ে ও পুরুষ জলহস্তী নিয়ে আসা হয়। প্রজননের জন্য তারুণ্যে ভরা জলহস্তী জোড়াকে নিয়ে এসেছিল কর্তৃপক্ষ। কিন্তু আলিপুরে আসার কিছুদিনের মধ্যে নন্দনকাননের মেয়ে জলহস্তীটি মারা যায়। তার মৃত্যু নিয়ে ধোঁয়াশা রয়ে গিয়েছে। বর্তমানে আলিপুরে জলহস্তীর সংখ্যা দুই। যার মধ্যে একটি বয়স্ক মেয়ে জলহস্তী। উল্লেখ্য, ডিসেম্বর মাসে একটি তারুণ্যে ভরা বাঘিনির অকালমৃত্যু হয় চিড়িয়াখানা। তার আগে অক্টোবরে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে দুটি বাঘিনির মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছিল আলিপুরে। সম্প্রতি একটি কৃষ্ণসার মৃগও মারা গিয়েছে বলে জানা গিয়েছে। তার পিছনে ক্ষত ছিল। সেই ক্ষতের চিকিৎসা চলছিল। একের পর এক ঘটনায় চিড়িয়াখানার আবাসিকদের চিকিৎসা ব্যবস্থা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন পরিবেশপ্রেমীরা।
