দু'বছর আগে 'জাস্টিস', 'রাতদখল' শব্দগুলো যেন শেল হয়ে বিঁধত। শুনলেই মেজাজ হারাতেন তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। ২০২৪ সালে আর জি করের তরুণী চিকিৎসকের ধর্ষণ-খুনের সুবিচার চেয়ে পথে নামা আন্দোলনকে 'হুজুগ' বলে মনে করতেন। আন্দোলনকারীদের কাউকে নকশাল, কাউকে অতি বাম বলে দাগিয়ে দিতে পিছপা হননি। 'জাস্টিস ফর আর জি কর' স্লোগান শুনলে সপাটে জবাব দিতেন, জাস্টিস তো পাইয়ে দেওয়া হয়েছে। কাট টু ২০২৬। বিধানসভা ভোটে গোহারা হেরে এখন রাজ্য রাজনীতিতে গুরুত্ব হারিয়েছে তৃণমূল কংগ্রেস। দলের রাশও তাঁর হাতে থাকবে কি না, ঠিক নেই। কিন্তু সেদিনের সেই 'জাস্টিস' সুরই এখন মমতার গলায়! বারুইপুরে নাবালিকা ধর্ষণ-খুন কাণ্ডের প্রতিবাদে মোমবাতি হাতে রাস্তায় নেমে স্লোগান তুললেন 'তোমার আমার এক সুর/ জাস্টিস ফর বারুইপুর।' এ কেমন দ্বিচারিতা? কেনই বা? এই প্রশ্নের মুখে পড়তে হচ্ছে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে।
আর জি করের তরুণীর সুবিচার চেয়ে সেবার 'রাতদখল'-এর মতো ব্যাপক, সর্বাত্মক আন্দোলন যেখানে স্থান-কাল ছাড়িয়ে গোটা বিশ্বে ছড়িয়ে পড়েছিল, সেখানে মমতার কটাক্ষ ছিল, ‘‘ওটা হুজুগ। বাম, অতি বামদের উসকানি। এভাবে তো বিচার হয় না। বিচারের জন্য আমরা সব পদক্ষেপ নিয়েছি।'' এমনকী প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রীর এই একরোখা ভাবকে সঠিক প্রমাণ করতে নেমে পড়েছিল গোটা পুলিশ প্রশাসন। পুলিশ কমিশনার থেকে ডিসি - একেকদিন সাংবাদিক সম্মেলনে আসল দোষীদের আড়ালের কসুর করেননি।
বারুইপুর কাণ্ডের প্রতিবাদে মোমবাতি মিছিলে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। সোমবার, কালীঘাটে। নিজস্ব ছবি
আর জি করের ঘটনার সঙ্গে জড়িত পছন্দের লোকজনকে 'অপরাধী' হওয়া থেকে আড়াল করতে প্রত্যক্ষ ভূমিকা ছিল প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রীর, এই অভিযোগ উঠেছে বারবার। সম্প্রতি রাজ্যে পালাবদলের পর আর জি কর ফাইল নতুন করে খোলার পর নয়া নয়া তথ্য সামনে আসছে। এও জানা যাচ্ছে, নির্যাতিতার ভিসেরার নমুনা নষ্ট করার নির্দেশ নাকি দিয়েছিলেন খোদ মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ই! যে কারণে আসল অপরাধীদের ধরাই যায়নি বলে অভিযোগ। এমনকী সিবিআইও তদন্তে আসল ক্লু খুঁজে পেতে ব্যর্থ হয়েছে। যদিও মামলার দ্রুত শুনানি, রায়দান, সাজা কার্যকর সবই হয়েছে। তা সত্ত্বেও অপরাধ আড়ালে মমতার ভূমিকা বরাবর সমালোচিতই হয়েছে। তার কারণও আছে ঢের।
আর জি করের তরুণীর সুবিচার চেয়ে সেবার 'রাতদখল'-এর মতো ব্যাপক, সর্বাত্মক আন্দোলন যেখানে স্থান-কাল ছাড়িয়ে গোটা বিশ্বে ছড়িয়ে পড়েছিল, সেখানে মমতার কটাক্ষ ছিল, ‘‘ওটা হুজুগ। বাম, অতি বামদের উসকানি। এভাবে তো বিচার হয় না। বিচারের জন্য আমরা সব পদক্ষেপ নিয়েছি।'' এমনকী প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রীর এই একরোখা ভাবকে সঠিক প্রমাণ করতে নেমে পড়েছিল গোটা পুলিশ প্রশাসন। পুলিশ কমিশনার থেকে ডিসি - একেকদিন সাংবাদিক সম্মেলনে আসল দোষীদের আড়ালের কসুর করেননি। ছবি দেখিয়ে বোঝাতে চাইতেন, তাঁদের হাতে আসা তথ্যের ভিত্তিতেই তদন্তের গতি কোনদিকে এগোবে, তা স্থির হয়েছে। সেসময় যাঁদের ক্লিনচিট দিয়েছিলেন দুঁদে পুলিশ অফিসাররা, পরবর্তী সময়ে দেখা যায়, তাঁরা মারাত্মক সব অপরাধের সঙ্গে যুক্ত। এমনকী সেই পদাধিকারীরাও অন্যায় থেকে বাঁচেননি। কলকাতা পুলিশের তিন পদাধিকারী আজ সাসপেন্ডেড।
আজ, ২ বছর পর শাসকের ভূমিকা বদলে এখন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ও তাঁর দল বিরোধী আসনে। এখন মমতার মুখে 'জাস্টিস' স্লোগান! মোমবাতি হাতে পথে নেমে প্রতিবাদ জানাতে দেখা গেল মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে। স্লোগান তুললেন, 'তোমার আমার এক সুর/ জাস্টিস ফর বারুইপুর।' প্রায় একই স্লোগান শোনা গিয়েছিল আর জি কর আন্দোলনের প্রতিবাদীদের গলায় - 'তোমার স্বর আমার স্বর/ জাস্টিস ফর আর জি কর'। আন্দোলনের ধাঁচ থেকে স্লোগান - সবেতেই তো সেই পূর্ব আন্দোলনের ছায়া!
অভয়ার বিচারের দাবিতে মোমবাতি হাতে শয়ে শয়ে মানুষ নেমে এসেছিলেন রাজপথে। ফাইল ছবি
আজ, ২ বছর পর শাসকের ভূমিকা বদলে এখন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ও তাঁর দল বিরোধী আসনে। এখন মমতার মুখে 'জাস্টিস' স্লোগান! ছাব্বিশের ভোটে সর্বস্ব হারিয়ে বিরোধিতার রাস্তাও তেমন মসৃণ নেই তাঁর সামনে। সদ্য বারুইপুরে নাবালিকাকে ধর্ষণের পর খুনের ঘটনা ঘিরে যে অশান্তির পরিবেশ দেখা গিয়েছিল সেখানে, আজকের প্রশাসন শক্ত হাতে তা দ্রুত সামাল দিতে সক্ষম হয়েছে। ঘটনার ২৪ ঘণ্টার মধ্যে বিশেষ তদন্তকারী দল গঠন করে মূল অভিযুক্ত-সহ জড়িতদের গ্রেপ্তার করেছে। এত দ্রুততার সঙ্গে অন্যায় মোকাবিলায় কাজ প্রায় বিরল।
এতে প্রশাসনকে কৃতিত্ব না দিয়ে মোমবাতি হাতে পথে নেমে প্রতিবাদ জানাতে দেখা গেল মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে। স্লোগান তুললেন, 'তোমার আমার এক সুর/ জাস্টিস ফর বারুইপুর।' প্রায় একই স্লোগান শোনা গিয়েছিল আর জি কর আন্দোলনের প্রতিবাদীদের গলায় - 'তোমার স্বর আমার স্বর/ জাস্টিস ফর আর জি কর'। আন্দোলনের ধাঁচ থেকে স্লোগান - সবেতেই তো সেই পূর্ব আন্দোলনের ছায়া! এ তো চুরি! এতদিনের জননেত্রীর এই এত দ্বিচারিতা কেন? প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক।
