সবার অলক্ষ্যে সাবানে চাবির ছাপ তুলে নকল চাবি তৈরি করেছিল ছেলেটি। এরপর বহুতল অভিজাত ফ্ল্যাটের দরজা খুলে পেশাদার দুষ্কৃতীর মতোই লোহা কাটার ইলেকট্রিক করাত দিয়ে কেটে ফেলে আলমারির লক। তার পর সিন্দুকের ভিতর থেকে দু’কোটি টাকার সোনার গয়না, একাধিক সোনার বিস্কুট ও সাড়ে ২৬ লাখ টাকা লুঠ করে তরুণ। সম্প্রতি সরশুনার একটি অভিজাত বহুতল আবাসনের ফ্ল্যাটে ঘটে এই ঘটনাটি।
সহজে ধনী হওয়ার লোভ। তাই নিজের বান্ধবীর ফ্ল্যাটেই লুঠপাটে নেমে পড়ে ওই একই বহুতল আবাসনের বাসিন্দা তরুণটি, যে কি না দক্ষিণ কলকাতার ভবানীপুরের একটি নামী বেসরকারি কলেজের বিসিএ-র প্রথম বর্ষের ছাত্র। রীতিমতো লুঠের ছক কষে অনলাইনে কিনে ফেলে ইলেকট্রিক করাত ও টাকা গোনার যন্ত্র। জটিল এই তদন্তের জট খুলতে মাঠে নামতে হয় লালবাজারের গোয়েন্দাদের। শুধু সিসিটিভির ফুটেজের সঙ্গে ওই তরুণের মোবাইল ফোনের অবস্থান মিলিয়েই শেষ পর্যন্ত রহস্যভেদ করেন লালবাজারের গোয়েন্দা বিভাগের চুরিদমন শাখার আধিকারিকরা। গোয়েন্দাদের হাতে গ্রেপ্তার হয় হর্ষবর্ধন সাউ নামে ওই ছাত্র। তার কাছ থেকে লুঠের সোনা ও টাকা উদ্ধারের চেষ্টা হচ্ছে। সোমবার হর্ষবর্ধনকে আলিপুর আদালতে তোলা হলে তাকে ৮ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত পুলিশ হেফাজতে রাখার নির্দেশ দেন বিচারক।
ধৃত হর্ষবর্ধন সাউ।
পুলিশ জানিয়েছে, সরশুনার ওই আবাসনের দোতলায় থাকে পুরসভার ঠিকাদারের পুত্র হর্ষবর্ধন। পাঁচতলায় থাকে ঝাড়খণ্ডের ঠিকাদারের পরিবার। পড়াশোনার সূত্রে ঝাড়খণ্ডের পরিবারের মেয়ের বন্ধু হর্ষবর্ধন। তাই বান্ধবীর ফ্ল্যাটে প্রায়ই যাতায়াত তার। গত মাসে হর্ষবর্ধন জানতে পারে যে, ২১ ডিসেম্বর থেকে কয়েকদিনের জন্য বান্ধবীর বাড়িতে কেউ থাকবে না। এ-ও জানত যে, ওই ব্যবসায়ীর শোওয়ার ঘরের আলমারির লকারে রয়েছে প্রচুর সোনা ও টাকা। তাই লুঠের ছক কষে প্রথমে একটি সাবানের টুকরোয় ফ্ল্যাটের চাবির ছাপ নেয় সে। তার সাহায্যে ফ্ল্যাটের নকল চাবি তৈরি করে নেয়। অনলাইনে কিনে নেয় ইলেকট্রিক করাত ও টাকা গোনার যন্ত্র। এর পর তালা খুলে হানা দেয় বান্ধবীর ফাঁকা ফ্ল্যাটে। ইলেকট্রিক করাত দিয়ে আলমারির পিছনের দিক থেকে লকারের জায়গাটি কেটে ফেলে। তার পর ভিতর থেকে ১ কিলো ২০০ গ্রাম সোনার গয়না ও সাড়ে ২৬ লাখ টাকা লুঠ করে সে। ফ্ল্যাটে বসে যন্ত্র দিয়ে টাকা গোনে। লুঠের টাকা ও গয়না ব্যাগে পুরে বেরিয়ে যায় সে।
পরিবারের লোকেরা আলমারি খুলতেই দেখেন, লকার ফাঁকা। শোরগোল শুরু হতেই এগিয়ে আসে হর্ষবর্ধন। নিজেই চোর ধরে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়ে উলটোদিকের ফ্ল্যাটের সিসিটিভি দেখার নাম করে হার্ড ডিস্কটি চুরি করে নেয়। এই ব্যাপারে পরিবারটি সরশুনা থানায় অভিযোগ দায়ের করে। গোয়েন্দা বিভাগ তদন্ত করতে গিয়েই দেখে উল্টোদিকের সিসিটিভির হার্ড ডিস্ক নেই। তাতেও ছাত্রটির উপর গোয়েন্দাদের সন্দেহ হয়নি। প্রথমে আবাসনের প্রত্যেকটি সিসিটিভির ফুটেজ দেখেও কোনও চোর আসার প্রমাণ পাননি গোয়েন্দারা। এরপরই গোয়েন্দারা বুঝতে পারেন, এই কাজ বাইরের লোকের নয়। কয়েকদিনের মধ্যে সিঁড়ি দিয়ে বাড়ির যে বাসিন্দারা যাতায়াত করেছেন, তাঁদের উপর নজরদারি শুরু হয় গোয়েন্দাদের। এর মধ্যে যাঁদের ব্যবসায়ীর বাড়িতে বেশি যাতায়াত, তাঁদের উপরই বেশি নজর দেওয়া হয়। হর্ষবর্ধনকে কয়েকবার ওঠানামা করতে দেখলেও তার কোনও কারণ খুঁজে পাওয়া যায়নি। ব্যবসায়ীর ফ্ল্যাটের উলটোদিকে বসানো সিসিটিভির হার্ড ডিস্ক চুরি করার কারণে তার ফুটেজও উদ্ধার করা যায়নি। তাই গোয়েন্দারা ওই ছাত্রের মোবাইলের অবস্থান খতিয়ে দেখতে শুরু করেন। তাতেই প্রমাণ মেলে, ফ্ল্যাটের মধ্যে ছিল ওই ছাত্র। সেই সূত্র ধরে তাকে টানা জেরা শুরু হয়। শেষ পর্যন্ত গোয়েন্দাদের জেরায় ভেঙে পড়ে স্বীকার করে, সে-ই লুঠপাট করেছে। সে যে ইলেকট্রিক করাত ও লুঠ করা টাকা-সোনা আবাসনের বাইরে নিয়ে যাচ্ছে, সিসিটিভির সূত্র ধরে গোয়েন্দারা তার প্রমাণ পান। লোহা কাটার ইলেকট্রিক করাত উদ্ধার করা হয়েছে। লুঠের সোনা ও টাকার সন্ধান পেতে তাকে জেরা করা হচ্ছে বলে জানিয়েছে পুলিশ।
