একসময় জানবাজারের যে বাড়িতে শ্রীরামকৃষ্ণ ঠাকুরদালানে বসে দুর্গাপুজো করেছেন, শহরের বনেদিয়ানায় রানি রাসমণির বাড়ির দুর্গাপুজো খোঁজ নিলেন ইন্দ্রজিৎ দাস।
ইতিহাস-
১৭৯৩ খ্রীস্টাব্দে রাসমণি দেবীর শ্বশুরমশাই জমিদার এবং ব্যবসায়ী প্রীতরাম মাড় এই পুজোর সূচনা করেন। প্রীতরাম মাড় (পরে দাস হন) ছিলেন নুনের ব্যবসায়ী। শেয়ার মারফত তিনি প্রচুর টাকা উপার্জন করেন। এছাড়া বাঁশ ভাসিয়ে এদেশ-ওদেশ নিয়ে গিয়ে বিক্রি করাও ছিল একটা ব্যবসা। এভাবেই নানা ব্যবসায় উন্নতি করে প্রীতরাম মাড় কলকাতায় বিশাল জায়গা কিনেছিলেন। তাঁর অবর্তমানে বাড়ির দায়িত্বে থাকতেন ছেলে রাজচন্দ্র দাস। কিন্তু নিয়তির নিদানে অকালেই চলে যেতে হয় রাজচন্দ্রকে। বিশাল সম্পত্তি, সাতমহলা বাড়ি-সবই রাসমণির দায়িত্বে এসে পড়ে। অসম্ভব দক্ষতায় তিনি করায়ত্ত করেন নিজ অধিকার। দেখাশোনা শুরু করেন তাঁর বিপুল সম্পত্তির। সঙ্গে সহযোগী হিসেবে রাখেন জামাই মথুরবাবুকে।
[শুধু গঙ্গার তীরে নয়, উমার আগমন টেমসের ধারেও]
বৈশিষ্ট্য-
রানি রাসমণির বাড়ির দুর্গামূর্তির কিছু বৈশিষ্ট্য আছে। দুর্গা মায়ের মুখ ছাঁচে তৈরি হয় না। শিল্পী হাতে গড়েন মায়ের মুখ। মায়ের মুখের ও গায়ের রং শিউলি ফুলের বোঁটার রঙের মতো। ১০-১২ ফুট উঁচু একচালার প্রতিমা। শোলার সাজে সজ্জিত মাতৃমূর্তি। রথের দিনে কাঠামো পুজো করে বাড়ির ঠাকুরদালানেই মাতৃমূর্তি গড়ার কাজ শুরু হয়। মহালয়ার পরে প্রতিপদের দিন বোধন। বিশুদ্ধ সিদ্ধান্ত মতে পুজো হয় রাসমণির বাড়িতে। দুর্গামূর্তির দু’পাশে রামকৃষ্ণ ও সারদা মায়ের প্রতিকৃতি বসানো থাকে। সপ্তমী, অষ্টমী ও নবমীতে ব্রাহ্মণ কন্যার কুমারী পুজো থেকে সন্ধিপুজো সবই চলে নিয়মানুসারে। আখ, চালকুমড়ো বলি দেওয়া হয়। কোনও পশুবলি হয় না। এ বাড়িতে মাকে অন্নভোগ দেওয়ার নিয়ম নেই। তার বদলে লুচি, নানারকমের ভাজা, দই, মিষ্টি, ক্ষীর, নাড়ু, গজা-এইসব দেওয়া হয়।
ঐতিহ্য-
একসময় জানবাজারের এই বাড়িতে শ্রীরামকৃষ্ণ ঠাকুরদালানে বসে দুর্গাপুজো করেছেন। বেশ কয়েকবারই এসেছিলেন এ বাড়ির দুর্গাপুজোয়। একবার ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণ রমণীবেশে দেবীকে চামরব্যজন করেছিলেন। কেউই তাঁকে চিনতে পারেনি। তখন তিনি মথুরবাবুর সঙ্গে একই ঘরে থেকেও তাঁর চোখেও ধুলো দিয়েছিলেন। রানি রাসমণির আমলে বাড়ির প্রভাব-প্রতিপত্তির বিস্তার ছিল সারা কলকাতা জুড়েই। তাই পুজো উপলক্ষে বাড়িতে অনেক অতিথিই আসতেন। রাজা রামমোহন রায়, প্রিন্স দ্বারকানাথ ঠাকুর, ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর, মধুসূদন দত্ত প্রমুখ অতিথি এসেছিলেন জানবাজারে রানি রাসমণির বাড়ির দুর্গাপুজোয়।
একসময় বিখ্যাত শিল্পীদের গানের আসর বসত এবং নাটক ও যাত্রারও আয়োজন হত। সময়ের পরিবর্তনে আড়ম্বর আর জাঁকজমকে ভাটা পড়েছে অনেকটাই। জানবাজারের বাড়িও হারিয়েছে তার জৌলুস। তবুও ঠাকুরদালানে প্রতি বছর মা আসছেন রানির বাড়ির পুজো নিতে।
[শহরের বনেদিয়ানায় আজও অটুট সাবর্ণদের ‘আটচালার পুজো’]
The post রানি রাসমণির বাড়িতে ‘ছদ্মবেশে’ এসেছিলেন স্বয়ং রামকৃষ্ণদেব appeared first on Sangbad Pratidin.
