কলেজ স্ট্রিটে ঢিল ছুড়লে যাঁর মাথায় পড়বে তিনিই গ্র্যাজুয়েট। রসিকতাভরা বঙ্গবচনকে একটু ঘুরিয়ে ব্যবহার করলে বলাই যায়, কলকাতার ভরকেন্দ্র ধর্মতলায় দাঁড়িয়ে যেদিকেই তাকানো যাক না কেন, নির্মাণ মানে অধিকাংশই অনিয়ম! তা সে হোটেল হোক বা শপিং মল। অথবা কোনও দোকান। কিংবা রাতের নাচঘর-পানশালা। এবং সবই গড়ে ওঠে অদ্ভুতভাবে। বড়বাজার, বাগরি মার্কেটে যেমন কোনও বাড়ির আসল মালিক খুঁজে বের করতে দিস্তে দিস্তে লিজ চুক্তির পর চুক্তিতে চোখ বুলিয়ে হেদিয়ে মরতে হয়, এও তেমনই। অধিকাংশ ভবনের পত্তনের পর তার উত্তরাধিকার ভাগ বাঁটোয়ারা হয়েছে। ব্যবসা ভাগ হয়েছে। কিন্তু আইনি ক্ষেত্রে সমস্ত নিয়ম মানা হয়নি। একটাই ট্রেড লাইসেন্সে দুই ভাইয়ের ব্যবসার তথ্যও সামনে এসেছে। আর কলকাতার যে বার কালচার এখন জাঁকিয়ে বসেছে ধর্মতলা থেকে ইস্টার্ন মেট্রোপলিটান বাইপাস, বিমানবন্দরগামী ভিআইপি রোড অথবা হাওড়া শহরে সেখানেও প্রতি ফ্লোরে শুধুই আইন ভাঙার গল্প।
নন্দরাম মার্কেট, স্টিফেন কোর্টে অগ্নিকাণ্ডে মৃত্যু মিছিল থেকেও যে এই শহরের ব্যবসায়ীরা নিজেদের বদলাননি এবং প্রশাসনের চোখ থেকে ঠুলি সরেনি তা ফের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিল মির্জা গালিব স্ট্রিটের হোটেলের অগ্নিশিখা। ধর্মতলা থেকে নিউমার্কেট, হোটেল মানেই একই ভবনে একাধিক আবাসের ব্যবস্থা। শরিকি ভাগ বাঁটোয়ারায় ব্যবসা ভাগ, পুরো বাড়ি ভাগ হয়ে একাধিক হোটেল। কখনও মূল নাম একই রেখে তার আগে 'দ্য', 'নিউ' অথবা 'আদি' শব্দ জুড়ে পৃথকীকরণ অথচ ট্রেড লাইসেন্স থেকে বিদ্যুৎ সংযোগ আলাদা করার বালাই নেই। ফলে এসি বাড়ে, বিদ্যুতের চাহিদা বাড়ালেও তার জন্য যে আধুনিকীকরণ করা দরকার তা হয় না।
সবচেয়ে বড় কথা, একেবারে ধর্মতলায় একের পর এক পুরনো ব্রিটিশ আমলের বাড়িতে দোতলা, তিনতলায় হোটেল আর নিচে সার দিয়ে দোকান, ফাস্ট ফুডের কারবার। ফায়ার অডিট হয় নামেই আর আপৎকালীন অগ্নিনির্বাপক ব্যবস্থার জন্য রাখা এক্সটিংগুইশার সবই মেয়াদ পার করা, আগুনের সামনে যার খাপ খোলার চেষ্টা করাটাই মৃত্যুকে ডেকে আনা। পুরনো বাড়ি, তাই দ্বিতীয় সিঁড়ি তার অভিধানে নেই। তা ছাড়া এখানকার ছোট হোটেলগুলো কোনও সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত হতে চায় না বলেও অভিযোগ। ব্যাঙের ছাতার মতো গজিয়ে নিজেদের মতো করে আবাসিক রাখে। হোটেল রেস্টুরেন্ট সংগঠনের কর্তা সুদেশ পোদ্দারও সহমত, আইন না মানলে এভাবে অনেকের জীবন যাবে। সংগঠনের দাবি, সরকার কড়া সিদ্ধান্ত নিক। পদক্ষেপ করুক।
ওয়েস্ট বেঙ্গল হোটেল বার অ্যান্ড এক্সাইজ লাইসেন্সিজ অ্যাসোসিয়েশনের নেতা অচিন্ত্য বসুও স্বীকার করেন, "কিছু ক্ষেত্রে বার ও সিঙ্গিং ফ্লোরে নিয়ম মানা হয় না। অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থায় গাফিলতি থাকে। তা দেখুক সরকার। কারণ, মানুষ আনন্দ করতে এসে জীবন হারান, তা তো কাম্য নয়।"
বিধাননগরে বার কাম রেস্টুরেন্টের লাইসেন্স দেন জেলাশাসক। আর কলকাতায় দেখেন এক্সাইজ কালেক্টর। নিয়ম মেনে কতখানি মিথাইল অ্যালকোহল মজুত আছে তা নিয়মিত জানাতে হয়। কতটা মজুত করা যাবে তাও নির্দিষ্ট করে দেওয়া হয় প্রশাসনের তরফে সব দিক খতিয়ে দেখে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সেই নিয়ম যে সবাই মানে না তা স্পষ্ট। অধিকাংশ পানশালা বা তথাকথিত ড্যান্স ফ্লোরের কোনও দ্বিতীয় সিঁড়ি বা জরুরি ক্ষেত্রে বেরিয়ে যাওয়ার ব্যবস্থা যে নেই তা বোঝা যায় চাঁদনি চক, বেন্টিংক স্ট্রিট চত্বরে সন্ধ্যা গড়ালেই ভিড়ে ভিড়াক্কার পানশালা ও ড্যান্স ফ্লোরে উঁকি মারলে। এমনকী, এমন কিছু গলির মধ্যে দাহ্য ভরা সব রেস্টুরেন্ট ও বার যে দমকলের ছোট গাড়িও থমকে যাবে বিপর্যয় মোকাবিলায় গিয়ে। দমকলের ডিজি অনুজ শর্মাও এদিন দুর্ঘটনাস্থলে দাঁড়িয়ে এই ধরনের কিছু সমস্যার কথা স্বীকার করেছেন। কিন্তু স্বীকারোক্তি এবং তার পর পদক্ষেপের ফাঁক পূরণ হবে আর কত প্রাণের বিনিময়ে, সেটাই বড় প্রশ্ন।
