বাংলা সাহিত্য জগতের এক উজ্জ্বলতম দিনে একটু কলঙ্কের দাগ। শনিবার রবীন্দ্রসদনে প্রতিবাদী লেখিকা তসলিমা নাসরিনের (Taslima Nasrin) 'ফেরা' উপলক্ষে সাংস্কৃতিক সন্ধ্যায় যা ঘটল, সেই ঘটনাকে এভাবে ব্যাখ্যা করা যায়। মঞ্চে ভাষণ রাখতে গিয়ে তসলিমা আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন প্রবাদপ্রতিম কবি জয় গোস্বামী (Joy Goswami )। কিন্তু দর্শকদের সমবেত আপত্তিতে কবি মঞ্চে পৌঁছতে পারেননি। মাঝপথে ফিরে যান নিজের আসনে। জয় গোস্বামীর এহেন 'অপমান' নিয়ে ভাষণে কিছু না বললেও পরে মুখ খুলেছেন 'দ্বিখণ্ডিত' স্রষ্টা। তিনি জানান, ভালোবেসে শ্রদ্ধেয় কবিকে মঞ্চে ডেকেছিলেন। এমনটা হবে, আশা করেননি। যে বাকস্বাধীনতায় বিশ্বাস করেন তিনি নিজে, এক্ষেত্রে সেই স্বাধীন পরিবেশ থাকলে ভালো লাগত।
শনিবার পূর্ব নির্ধারিত সময় অনুযায়ী রবীন্দ্রসদনে তসলিমা নাসরিনের অনুষ্ঠান শুরু হয়। তাঁকে স্বাগত জানিয়ে নাগরিক সংবর্ধনা দেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। এরপর তসলিমা নাসরিনকে বক্তব্য রাখার জন্য আমন্ত্রণ জানানো হয়। তিনি উঠে দর্শকাসনে বসে থাকা শ্রদ্ধেয় কবি জয় গোস্বামীকে মঞ্চে আহ্বান জানান। বলেন, ‘‘দেখতে পাচ্ছি আমার অগ্রজ, শ্রদ্ধেয় কবি জয় গোস্বামী ওখানে বসে আছেন। আমি তাঁকে মঞ্চে আসার অনুরোধ জানাচ্ছি।'' জয় গোস্বামী আসন ছেড়ে উঠতেই দর্শকাসন থেকে হইহই শুরু হয়। বোঝা যায়, কবির মঞ্চে ওঠা তাঁদের অপছন্দের। তার মূল কারণ হতেই পারে তসলিমাকে নিয়ে জয়ের বরাবরের 'নীরব' অবস্থান এবং মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের অতি-ঘনিষ্ঠতা। দর্শকরা চাননি, তসলিমার মঞ্চে জয় থাকুন। তাঁরা সমস্বরে বলতে থাকেন, ‘‘ওঁর কথা শুনতে চাই না।'' সঙ্গে সঙ্গে মঞ্চের উলটোদিকে হেঁটে ফের নিজের আসনে গিয়ে বসে পড়েন জয় গোস্বামী।
রবীন্দ্রসদনের অনুষ্ঠানে জয় গোস্বামীকে মঞ্চে ডেকেছিলেন তসলিমা, কিন্তু দর্শকদের প্রবল হইচইতে মঞ্চে ওঠা হয়নি কবির, শনিবার
সংবাদমাধ্যমে প্রতিক্রিয়া দিতে গিয়ে জানান, ‘‘আমি ভালোবেসে ওঁকে মঞ্চে ডেকেছিলাম। ওঁর রাজনৈতিক মত ভিন্ন হতে পারে, তার সঙ্গে আমার মিল না-ই থাকতে পারে, কিন্তু উনি তো বাংলা সাহিত্যের একজন বড় কবি। আমাকে নিয়ে কবিতা লিখেছিলেন, সেটা পড়তে চেয়েছিলেন। কিন্তু এমনটা হবে, আশা করিনি। আমি বারবার আমার বক্তব্যে যে স্বাধীন, মুক্ত চিন্তাধারার কথা বলেছি, মুক্ত পরিবেশের কথা বলছি, সেটা বজায় থাকলে ভালো লাগত।''
এরপর তসলিমা নিজের দীর্ঘ ভাষণে বারবার স্বাধীন চিন্তা, বাকস্বাধীনতার কথা বললেন জয় গোস্বামীর এহেন অপমান নিয়ে একটি শব্দও উচ্চারণ করেননি। পরে অবশ্য এক সংবাদমাধ্যমে প্রতিক্রিয়া দিতে গিয়ে জানান, ‘‘আমি ভালোবেসে ওঁকে মঞ্চে ডেকেছিলাম। ওঁর রাজনৈতিক মত ভিন্ন হতে পারে, তার সঙ্গে আমার মিল না-ই থাকতে পারে, কিন্তু উনি তো বাংলা সাহিত্যের একজন বড় কবি। আমাকে নিয়ে কবিতা লিখেছিলেন, সেটা পড়তে চেয়েছিলেন। কিন্তু এমনটা হবে, আশা করিনি। আমি বারবার আমার বক্তব্যে যে স্বাধীন, মুক্ত চিন্তাধারার কথা বলেছি, মুক্ত পরিবেশের কথা বলছি, সেটা বজায় থাকলে ভালো লাগত।''
তসলিমার আরও বক্তব্য, ''মঞ্চে যে রাজনৈতিক নেতারা আজ ছিলেন, তাঁদের মতের সঙ্গে তো আমি একমত নই। তাই বলে কি আমার তাঁদের পাশে বসতে অসুবিধা হয়েছে? তা তো নয়। কারও ভাবনা অন্য কিছু হলেই যে তাঁকে বর্জন করতে হবে, তেমন পরিবেশের কথা আমি ভাবতে পারি না। নিজের আদর্শ, মতামত বজায় রেখে কারও সঙ্গে মিশতে কোনও অসুবিধা হওয়ার কথা নয়।'' রবীন্দ্রসদনের এই 'ছোট্ট' ঘটনা নিয়ে নানা মহলে নানারকম আলোচনা। কেউ কবির অপমানের তীব্র নিন্দা করেছেন। কারও মতে, এই পরিস্থিতির জন্য জয় গোস্বামী নিজেই দায়ী। এসব ছাপিয়ে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন নিশ্চিতভাবেই হয়ে দাঁড়াচ্ছে, তাঁরই আমন্ত্রণে সাড়া দিয়ে যে কবিকে এই অপ্রীতিকর পরিস্থিতিতে পড়তে হল, তা নিয়ে মঞ্চেই কেন প্রতিবাদ করলেন না লেখিকা?
