প্রয়াত বঙ্গ রাজনীতির একদা চাণক্য মুকুল রায়। দীর্ঘদিন ধরে শারীরিক অসুস্থতায় ভুগছিলেন তিনি। ভর্তি ছিলেন নিউ টাউনের এক বেসরকারি হাসপাতালে। রবিবার রাতে সেখানেই শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন মুকুল। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৭১ বছর।
পরিবার সূত্রে জানা গিয়েছে, গত কয়েক বছর ধরে কিডনি-সহ নানা শারীরিক সমস্যায় গুরুতর অসুস্থ ছিলেন মুকুল রায়। প্রায়ই হাসপাতালে ভর্তি করাতে হতো তাঁকে। সম্প্রতি কলকাতার এক বেসরকারি হাসপাতালে ভর্তি ছিলেন বঙ্গ রাজনীতির একদা চাণক্য। সেখানেই মৃত্যু হয় তাঁর। মুকুলের মৃত্যুতে শোকের ছায়া নেমেছে রাজ্য রাজনীতিতে। মৃত্যুর খবর সামনে আসতেই মুকুলের বাড়ির সামনে ভিড় জমাতে শুরু করেন তৃণমূলের নেতাকর্মীরা। জানা যাচ্ছে, হাসপাতাল থেকে দেহ বাড়িতে নিয়ে আসার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। কাঁচড়াপাড়ার ঘটক রোডের বাড়ি থেকে হালিশহর শ্মশানে নিয়ে যাওয়া হবে। সেখানেই শেষকৃত্য হবে তাঁর।
উল্লেখ্য, ডানপন্থী রাজনীতিতে বাকিদের মতো কংগ্রেসের হাত ধরে ছাত্র রাজনীতি থেকে সামনের সারিতে উঠে এসেছিলেন মুকুল। ১৯৯৮ সালে তৃণমূল কংগ্রেস প্রতিষ্ঠিত হওয়ার সময় মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গেই কংগ্রেস ছেড়ে চলে আসেন তৃণমূলে। এর পর আর পিছন ফিরে তাকাতে হয়নি তাঁকে। উত্তর ২৪ পরগনার কাঁচড়াপাড়া থেকে দিল্লির রাজনীতি। মুকুল রায়ের কর্তৃত্ব দেখেছে দেশ। সাংগঠনিক রাজনীতিতে তাঁর অভিভাবকত্বে রকেটের মতো ছুটেছে তৃণমূল। বঙ্গে বাম সাম্রাজ্যের পতন থেকে দিল্লির মন্ত্রীপদ একবিংশ শতাব্দীর প্রথম দুই দশক যেন মুকুলের জন্যই সাজিয়ে রেখেছিল 'রাজনীতির ঈশ্বর'। রাজ্য রাজনীতিতে তৃণমূলের সেকেন্ড-ইন-কমান্ড হিসেবে উঠে আসেন তিনি। তাঁর একের পর এক কূটনৈতিক চাল ও দলের বিপুল সাফল্যের জেরে বঙ্গ রাজনীতিতে চাণক্য উপাধি দেওয়া হয়েছিল তাঁকে। সেই ১৯৯৮ সাল থেকে ২০১৫ সাল পর্যন্ত তৃণমূলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক পদে ছিলেন তিনি। তাঁর নেতৃত্বে বাংলা তো বটেই ত্রিপুরা, অসম-সহ উত্তর-পূর্বের রাজ্যগুলিতেও নিজেদের বীজ বপন করে ঘাসফুল।
১৯৯৮ সাল থেকে ২০১৫ সাল পর্যন্ত তৃণমূলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক পদে ছিলেন তিনি। তাঁর নেতৃত্বে বাংলা তো বটেই ত্রিপুরা, অসম-সহ উত্তর-পূর্বের রাজ্যগুলিতেও নিজেদের বীজ বপন করে ঘাসফুল।
আড়ে বহরে বঙ্গ তথা জাতীয় রাজনীতিতে তৃণমূলের আধিপত্য যত বেড়েছে দলের তরফে পুরস্কৃতও হয়েছেন চাণক্য। বিধায়ক, রাজ্যসভার সাংসদ থেকে ইউপিএ সরকারে নৌপরিবহন, রেলের মতো গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রক দেওয়া হয় তাঁকে। এহেন ক্ষমতার শীর্ষে থাকা মুকুল রায় ২০১৭ সালে তৃণমূল ছেড়ে বিজেপিতে যোগ দেন। তবে যে অভিপ্রায় নিয়ে মুকুল বিজেপিতে গিয়েছিলেন তা ব্যর্থ হয়। বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে ২০২১ সালে তৃতীয়বারের জন্য বাংলায় ক্ষমতায় আসে তৃণমূল।
তবে বঙ্গ রাজনীতিতে ততদিনে নিজের ভুল চালের জেরে নিজের 'চাণক্য' তকমা হারিয়েছেন মুকুল। একইসঙ্গে হারিয়েছেন বিধানসভায় বিধায়ক মুকুলের বিশ্বাসযোগ্যতাও। ২০২১ সালে স্ত্রীর মৃত্যুর পর থেকেই তাঁর শারীরিক অবস্থার অবনতি শুরু হয়। তিনি দীর্ঘ দিন ধরে ডায়াবিটিসে ভুগছিলেন তিনি। পাশাপাশি, ডিমেনশিয়াও ছিল তাঁর। যুগল ভবনের দোতলায় এভাবেই জীবনের শেষ অধ্যায় শেষ হল একদা বঙ্গ চাণক্য মুকুল রায়ের।
