মোথাবাড়ি কাণ্ডে ভারচুয়াল শুনানিতে কমিশন নিযুক্ত রাজ্য পুলিশের ডিজি সিদ্ধিনাথ গুপ্তা ও মুখ্যসচিব দুষ্মন্ত নারিয়াল তীব্র 'ভর্ৎসনা' সুপ্রিম কোর্টের। আদালতের নির্দেশ অনুযায়ী, রাজ্য পুলিশের দায়ের করা ১২টি এফআইআরের তদন্ত করবে এনআইএ। সেই রিপোর্ট জমা দিতে হবে আদালতে। সোমবার সুপ্রিম কোর্টের মোথাবাড়ি কাণ্ডে প্রাথমিক রিপোর্ট জমা দেয় কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থা। রিপোর্ট জমার আগে দিল্লির সদর দপ্তরে একপ্রস্থ বিশেষ বৈঠকও করেন এনআইএ আধিকারিকরা।
এদিনের সওয়াল জবাব পর্বের কয়েকঘণ্টা আগে নদিয়ার কৃষ্ণনগরের নাকাশিপাড়ায় প্রচার সভা করেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। উত্তরপ্রদেশ থেকে আসা সিআরপিএফকে কাজে লাগিয়ে হামলার ষড়যন্ত্রের আশঙ্কা প্রকাশ করেন তিনি। শুনানিতে ওঠে সে প্রসঙ্গ। ভিডিও ক্লিপিংস আদালতে জমা দেন কমিশনের আইনজীবী ডি এস নায়ডু। মোথাবাড়ি কাণ্ডের কথা উল্লেখ করে তৃণমূলনেত্রীর বিরুদ্ধে আদালতে নালিশ করে নির্বাচন কমিশন।
এদিকে, কেন্দ্রের আইনজীবী সলিসিটার জেনারেল তুষার মেহতাও বাংলার পরিস্থিতি নিয়ে তীব্র সমালোচনা করেন। বলেন, "ওঁরা (জুডিশিয়াল অফিসার) কান্নাকাটি করছেন। বলছেন, আমাদের বাঁচান। এই তো পশ্চিমবঙ্গের অবস্থা।" রাজ্য প্রশাসন কাজ না করলে প্রয়োজনে হস্তক্ষেপ করা হবে, স্পষ্ট জানাল সুপ্রিম কোর্ট। ট্রাইবুনাল প্রধান শিবজ্ঞানমের চিঠি দেখানোর জন্য নজিরবিহীনভাবে এই প্রথমবার মোবাইল হাতে এদিন এজলাসে আসেন সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতি। গত একুশের বিধানসভা নির্বাচনের হিংসার প্রসঙ্গও ওঠে শুনানিতে। কেন্দ্র এবং কমিশন দু'পক্ষের আইনজীবী দাবি করেন, ছাব্বিশের নির্বাচনেও এমন পরিস্থিতি তৈরি হোক তা সম্ভবত চায় না রাজ্য প্রশাসনও। এই মর্মে সুপ্রিম কোর্টের হস্তক্ষেপের দাবিও জানানো হয়।
এদিকে, এনআইএ-র জমা দেওয়া রিপোর্ট অনুযায়ী, মোট ১২টি এফআইআর দায়ের হয়েছে। যেগুলির প্রাথমিক তদন্ত করেছে স্থানীয় থানার পুলিশ আধিকারিকরা। তার ফলে তদন্ত প্রভাবিত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে বলেই মত কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থার। তদন্তের স্বার্থে সমস্ত তথ্যপ্রমাণ এনআইএ-র হাতে তুলে দেওয়ার আর্জি জানানো হয়। সুপ্রিম কোর্ট জানায়, এনআইএ চাইলে নতুন করে এফআইআর দায়েরের পর তদন্ত করতে পারে। সেই অনুযায়ী রিপোর্ট জমা দিতে হবে শীর্ষ আদালতে। আর এই ১২টি এফআইআরের ভিত্তিতে তদন্তের খুঁটিনাটি তথ্য সুপ্রিম কোর্টে জমা দিতে হবে। মুখ্যসচিব ও ডিজি হলফনামা জমা দেন।
তাঁরা জানান, পুলিশ সঠিকসময় তদন্ত করে মোথাবাড়ি কাণ্ডের 'মাস্টারমাইন্ড' মোফাক্কেরুল ইসলাম ও তাঁর শাগরেদকে গ্রেপ্তার করেছে। এই দু'জনকে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব এনআইএ-র হাতে তুলে দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছে সুপ্রিম কোর্ট। কেন ঘটনার দিন ফোনে মুখ্যসচিবের সঙ্গে যোগাযোগ করা গেল না, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন প্রধান বিচারপতি। রাজ্য পুলিশের ডিজি-ই বা কী করছিলেন, সে প্রশ্নও তোলেন। কেন রাত দু'টোর সময় প্রধান বিচারপতিকে এই ঘটনার কথা জানানো হল, তা-ও জানতে চাওয়া হয়। মুখ্যসচিব ও ডিজির উদ্দেশে আদালতের সওয়াল, "আপনারা কাজ করছিলেন? আপনার দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখছিলেন। কেন রাত ২টো, এগারোটার সময় কেন জানতে পারলেন না প্রধান বিচারপতি।" রাজ্যের আভ্য়ন্তরীণ নিরাপত্তায় গলদ রয়েছে বলেই পর্যবেক্ষণ সুপ্রিম কোর্টের।
উল্লেখ্য, ভোটার তালিকায় নাম না ওঠায় গত পয়লা এপ্রিল সকাল থেকেই মালদহের কালিয়াচক এলাকায় মানুষের ক্ষোভ বাড়ছিল। কিন্তু বেলা বাড়তেই পরিস্থিতি অন্যদিকে মোড় নেয়। জনরোষ আছড়ে পড়ে এসআইআরের কাজে যাওয়া বিচারকদের উপর। যার জেরে রাতদুপুরে অগ্নিগর্ভ হয়ে ওঠে মালদহের কালিয়াচক। অভিযোগ, বিক্ষোভকারী জনতা দীর্ঘক্ষণ ধরে কালিয়াচক ২ বিডিও অফিসে আটকে রাখেন সাতজন জুডিশিয়াল অফিসারকে। তাঁদের মধ্যে ছিলেন মহিলা-সহ ৩ জন বিচারকও।
শেষমেশ গভীর রাতে ঘটনাস্থলে গিয়ে তাঁদের উদ্ধার করে বিশাল পুলিশবাহিনী। ঘটনাকে কেন্দ্র করে শুরু হয় জোর রাজনৈতিক বিতর্ক। এই ঘটনার জল গড়ায় সুপ্রিম কোর্টেও। ঘটনার তদন্তভার এনআইএ-কে দেওয়া হয়। ঘটনায় রাজ্যের মুখ্যসচিব এবং রাজ্য পুলিশের ডিজিপিকে শোকজ নোটিস। একইসঙ্গে মালদহের পুলিশ সুপার এবং জেলা শাসককেও শোকজ করে সুপ্রিম কোর্ট। ঘটনায় রাজ্যের মুখ্যসচিব এবং রাজ্য পুলিশের ডিজিপিকেও শোকজ নোটিস দেওয়া। একইসঙ্গে মালদহের পুলিশ সুপার এবং জেলা শাসককেও শোকজ করে সুপ্রিম কোর্ট। সেই মতো সোমবার শীর্ষ আদালতে ভারচুয়ালি হাজিরা দেন তাঁরা। শীর্ষ আদালতে কড়া সমালোচনার মুখে পড়েন দু'জনে।
