ভোটের মুখে গোষ্ঠীদ্বন্দ্বে একেবারে দীর্ণ বারাকপুর শিল্পাঞ্চলে বেজায় অস্বস্তিতে গেরুয়া শিবির! বৃহস্পতিবার দ্বিতীয় দফায় বিজেপির প্রার্থী তালিকা প্রকাশিত হতেই তা একেবারে প্রকাশ্যে চলে এল। বীজপুরের প্রার্থী হিসেবে যাঁকে প্রার্থী করা হয়েছে, সেই সুদীপ্ত দাস তৃণমূল কর্মী খুনে অভিযুক্ত বলে পরিচিত। এমনকী বীজপুর থানা এলাকায় তাঁর প্রবেশেও নিষেধাজ্ঞা ছিল। এমন একজনকেই বিজেপি প্রার্থী করল কেন, তা নিয়ে বিতর্ক শুরু হয়ে গিয়েছে। বারাকপুর থেকে এবার বিজেপি প্রার্থী কৌস্তভ বাগচী। কিন্তু তাঁকে নিয়ে আপত্তি তুলে দলের মিডিয়া গ্রুপ ছেড়েই দিলেন রাজ্য যুব মোর্চার মুখপাত্র সুপ্রিয় ঘোষ। এতেই প্রকট গেরুয়া শিবিরের গোষ্ঠীদ্বন্দ্ব।
তৃণমূল কর্মী খুনের ঘটনায় অভিযুক্ত সুদীপ্ত দাসকে এবার বীজপুর আসনে বিজেপি প্রার্থী করায় রাজনৈতিক মহলের পাশাপাশি এলাকাতেও উঠছে একাধিক প্রশ্ন। ২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচনের পর কাঁচরাপাড়ায় গুলিতে খুন হন তৃণমূল কর্মী রাজু কুড়মি। সেই ঘটনায় অভিযুক্তদের তালিকায় উঠে আসে সুদীপ্ত দাসের নাম। তদন্তের পর তিনি গ্রেপ্তার হন, পরে জামিন পেলেও আদালত তাঁকে বীজপুর থানা এলাকার বাইরে থাকার নির্দেশ দেয়। অর্থাৎ যে কেন্দ্র থেকে তিনি প্রার্থী, সেই এলাকাতেই এতদিন তাঁর প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা ছিল। এই প্রেক্ষাপটে প্রশ্ন আরও ঘনীভূত, খুনের মামলায় অভিযুক্ত একজনকে প্রার্থী করে কী বার্তা দিতে চাইছে বিজেপি? আইনি জটিলতা সত্ত্বেও এই সিদ্ধান্ত কি সচেতন রাজনৈতিক কৌশল? আর এতদিন এলাকায় অনুপস্থিত থাকা এক নেতা ভোটের মুখে সংগঠনকে কতটা কার্যকরভাবে নেতৃত্ব দেবেন, এই প্রশ্ন আবার বিজেপির অন্দরে।
বীজপুরের বিজেপি প্রার্থী সুদীপ্ত দাস তৃণমূল কর্মী খুনে অভিযুক্ত।
বীজপুরের বিজেপি প্রার্থীকে নিয়ে তৃণমূলের কটাক্ষ, “এতেই পরিষ্কার, শিল্পাঞ্চলে বিজেপি শান্তি নয়, গুন্ডাদের রাজনীতি চায়।” যদিও সমস্ত অভিযোগ অস্বীকার করেছেন সুদীপ্ত দাস। তাঁর দাবি, “তৃণমূল একটা মিথ্যা মামলা আমাকে ফাঁসানোর চেষ্টা করেছিল। তারপর জামিন হওয়ার সময় কিছু শর্ত ছিল। তার মধ্যে ছিল, আমি বীজপুর থানা এলাকায় যেতে পারব না। শুক্রবার হাই কোর্টে এই মামলার শুনানি ছিল, আদালত থেকে অনুমতি মিলেছে। এখন আমার উপর আর কোনও বিধিনিষেধ থাকল না, আমি সব জায়গায় যেতে পারব।” বীজপুরে সুদীপ্ত দাসের প্রতিপক্ষ তৃণমূলের বিদায়ী বিধায়ক সুবোধ অধিকারী।
অন্যদিকে, বিজেপির দ্বিতীয় প্রার্থী তালিকায় বারাকপুরের তরুণ আইনজীবী নেতা কৌস্তভ বাগচীর নাম ঘোষণা হতেই দলের অন্দরের ক্ষোভ প্রকাশ্যে চলে এল। মিডিয়া গ্রুপ ছেড়ে রাজ্য যুব মোর্চার মুখপাত্র সুপ্রিয় ঘোষ সরাসরি গঠনতন্ত্রের বৈধতাকেই প্রশ্নে তুললেন, ভোটের মুখে যা সংগঠনের জন্য বড় অস্বস্তি নিঃসন্দেহে। দীর্ঘদিনের কর্মী সুপ্রিয়র আপত্তির কেন্দ্রবিন্দু প্রার্থী নির্বাচনের নিয়ম। তাঁর বক্তব্য, ৩ বছর পূর্ণ না হলে দলে সক্রিয় সদস্যপদ দেওয়া হয় না, অথচ সেই নিয়ম ভেঙেই কৌস্তভ বাগচীকে প্রার্থী করা হয়েছে। অর্থাৎ, বিজেপির নিজস্ব সাংগঠনিক কাঠামোই মানা হচ্ছে না - এই বার্তাই কার্যত সামনে আনলেন তিনি।
বারাকপুরের বিজেপি প্রার্থী তরুণ আইনজীবী কৌস্তভ বাগচীকে নিয়ে আপত্তি দলের একাংশের। ছবি: ফেসবুক
এর মধ্যেই স্পষ্ট নিচুতলার ক্ষোভ, পুরনো কর্মীদের উপেক্ষা করে ‘দলে নবাগতদের’ অগ্রাধিকার দেওয়ার অভিযোগ। তবে, প্রশ্ন তুলেও সরাসরি বিদ্রোহে যাননি সুপ্রিয়। প্রতিবাদকে ‘দলের ভিতরের প্রতীকী অবস্থান’ বলেই ব্যাখ্যা করেছেন। জল্পনা উড়িয়ে স্পষ্ট জানিয়েছেন, “বিজেপি ছাড়ার প্রশ্ন নেই - দল ছিল, আছে, থাকবে।” প্রার্থী কৌস্তভ বাগচী অবশ্য ক্ষোভ মানতে নারাজ। তাঁর দাবি, “এটা পরিবারগত স্বাভাবিক মতভেদ। সুপ্রিয় ঘোষ নির্বাচনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেবেন।” সঙ্গে বার্তা-প্রার্থী ব্যক্তি নয়, পদ্মফুল। রাজনৈতিক মহলের মতে, গঠনতন্ত্র ইস্যু তুলে সুপ্রিয় ঘোষ শুধু ব্যক্তিগত ক্ষোভ জানাননি, প্রার্থী বাছাইয়ে ‘নিয়ম ভাঙা’র অভিযোগও প্রকাশ্যে এনে দিলেন, যা ভোটের আগে বিজেপির অন্দরে অস্বস্তি আরও বাড়িয়েছে।
