তিনবার বিধানসভা, দু’বার লোকসভা, তার সঙ্গে বাঁকুড়া জেলা পরিষদের একাধিক আসনে লড়াই। নির্বাচনের ময়দানে বারবার নামলেও জয়ের মুখ আজও দেখেননি। তবু থামেননি তিনি। ২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনেও ফের প্রার্থী হয়ে লড়াইয়ের ময়দানে সেই গৌরচন্দ্র হেমব্রম। পাঁচবার লোকসভা-বিধানসভা নির্বাচনে পরাজয়ের ইতিহাস সঙ্গী হলেও ষষ্ঠবার লড়াইয়ে নামার জেদই যেন তাঁর রাজনৈতিক পরিচয় হয়ে উঠেছে।
চলতি ২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনে তিনি রানিবাঁধ কেন্দ্র থেকেই নির্দল প্রার্থী হিসেবে লড়াইয়ের ময়দানে নেমেছেন। পেশায় শিক্ষক গৌরচন্দ্র। দুর্গাপুর প্রজেক্ট বয়েজ হাই স্কুল, ইউনিট-২-এর টিচার ইনচার্জ হিসেবে কর্মরত তিনি। শিক্ষকতার পাশাপাশি রাজনীতির ময়দানে তাঁর এই ধারাবাহিক উপস্থিতি এলাকায় বহুদিনের আলোচনার বিষয়। রাজনৈতিক জীবনের শুরু ২০০৬ সালে। সে বছর রায়পুর বিধানসভা কেন্দ্র থেকে ঝাড়খণ্ড মুক্তি মোর্চার প্রার্থী হিসেবে প্রথম ভোটযুদ্ধে নামেন তিনি। পরে ২০১২ সালে বাঁকুড়া বিধানসভা কেন্দ্রের উপনির্বাচনে ঝাড়খণ্ড পিপলস পার্টির প্রার্থী হয়ে ফের ভাগ্য পরীক্ষা করেন। তাতেও জয় আসেনি। চলতি ২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচন তাঁর তৃতীয় বিধানসভা লড়াই।
লোকসভা নির্বাচনেও একাধিকবার প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছেন গৌরচন্দ্র। ২০১৪ সালে বাঁকুড়া লোকসভা কেন্দ্রে নির্দল প্রার্থী হিসেবে লড়েন। ২০১৯ সালে ঝাড়খণ্ড পিপলস পার্টির প্রার্থী হয়ে ফের ভোটে নামেন। ২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচনেও নির্দল প্রার্থী হিসেবেই লড়াই করেন তিনি। ফলে বিধানসভা ও লোকসভা মিলিয়ে এ পর্যন্ত পাঁচবার নির্বাচনী লড়াইয়ে অংশ নিয়েছেন তিনি।
শুধু বিধানসভা বা লোকসভা নয়, বাঁকুড়া জেলা পরিষদের বিভিন্ন আসনেও ২০০৮, ২০১৩, ২০১৮ এবং ২০২৩ সালে প্রার্থী হয়ে নির্বাচনে লড়েছেন তিনি। কিন্তু প্রতিটি ক্ষেত্রেই পরাজয় সঙ্গী হয়েছে তাঁর। রাজনীতির এই দীর্ঘ লড়াইয়ের পাশাপাশি পারিবারিক জীবনও সমানতালে সামলাচ্ছেন গৌরচন্দ্র। তাঁর স্ত্রী মামনি টুডু সারেঙ্গা গার্লস হাই স্কুলের শিক্ষিকা। এক ছেলে ও এক মেয়ে নিয়ে তাঁদের সংসার। ছেলে হুলসাই হেমব্রম পড়াশোনার পাশাপাশি বাবার নির্বাচনী প্রচারেও কখনও কখনও পাশে দাঁড়ায় বলেই জানিয়েছেন পরিবারের সদস্যরা।
স্ত্রী মামণি টুডুর কথায়, “এতবার হারলেও উনি হাল ছাড়েন না। স্কুলের কাজ সামলে মানুষের জন্য কিছু করার ইচ্ছেটাই ওঁকে বারবার ভোটে দাঁড় করায়। পরিবার হিসেবে আমরা ওঁর পাশে আছি, কারণ উনি যা করেন, বিশ্বাস থেকেই করেন।” নিজের লড়াই নিয়ে গৌরচন্দ্র হেমব্রম বলেন, “হার-জিত তো ভোটের অঙ্গ। মানুষের সমস্যার কথা বলার একটা মঞ্চ দরকার, সেই কারণেই আমি বারবার ভোটে দাঁড়াই। জিতলে ভালো, না জিতলেও মানুষের পাশে থাকার চেষ্টা থামাব না।” স্থানীয় রাজনীতিতে তাই তিনি এক আলাদা চরিত্র। বাড়ি বাড়ি গিয়ে প্রচার চালানো, মানুষের সঙ্গে কথা বলা - এই নিয়মিত পরিশ্রমেই নিজের রাজনৈতিক অস্তিত্ব টিকিয়ে রেখেছেন তিনি।
রাজনৈতিক মহলের একাংশের মতে, জয়ের মুখ না দেখেও বারবার প্রার্থী হওয়ার জেদই তাঁকে আলাদা করে চেনায়। আবার বিরোধীদের কটাক্ষ, “এতবার পরাজয়ের পরও একই পথে হাঁটা কতটা ফলপ্রসূ, সেটাই বড় প্রশ্ন।” তবে সমালোচনা বা কটাক্ষ কিছুতেই দমে যাওয়ার মানুষ নন গৌরচন্দ্র হেমব্রম। পাঁচবার লোকসভা-বিধানসভা নির্বাচনে পরাজয়ের পরও ২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনে ষষ্ঠবার বড় লড়াইয়ে নামার সিদ্ধান্তই যেন তাঁর রাজনৈতিক অধ্যাবসায়ের প্রতীক। ভোটের ফল যাই হোক, লড়াই চালিয়ে যাওয়াই যেন তাঁর একমাত্র পরিচয়।
