হীরা, পান্না, রুবি, নীলা পোখরাজ, সোনা। সেই সঙ্গে লাখ-লাখ টাকার ফ্রান্সের আসবাবপত্র। লন্ডনের লকার, বিলিয়ার্ডস, বার্মিংহামের ঝাড়বাতি, জার্মানির পিয়ানো, বেলজিয়ামের পেইন্টিং করা কাঁচ। নিষিদ্ধ হওয়ার আগে রাজাদের শিকার করা রয়্যাল বেঙ্গল টাইগার, লেপার্ড, হাতির পা, বাইসনের মুখ, বারোশিঙ্গা, হরিণ। কি নেই পুরুলিয়ার কাশীপুরের
পঞ্চকোট রাজপ্যালেস 'জ্যোতি বিলাস'-এ। কোটি-কোটি টাকার বহু মূল্যবান প্রাচীন সম্পদ।
যার আন্তর্জাতিক বাজারদর কয়েক লক্ষ ডলার। আসলে এই বিপুল সম্পদের অনেকাংশই যে এখন অ্যান্টিক! তাই পুরুলিয়ার ওই রাজপ্রাসাদ রক্ষার্থে একদা রাজকন্যা তথা রাজা শংকরীপ্রসাদ সিং দেও-র কন্যা মহেশ্বরী দেবীর ছেলে, রাজপরিবারের সদস্য অনশূল রাজাওয়াতের একটি দো-নলা বন্দুকে বিশেষ ছাড় দিয়েছে নির্বাচন কমিশন। যা কার্যত নজিরবিহীন।
সমগ্র পুরুলিয়ার মধ্যে ব্যক্তিগত নিরিখে মাত্র একটি। কারণ, ভোটপর্বে এই ধরনের লাইসেন্সপ্রাপ্ত বন্দুকের ঠিকানা হয় 'থানার মালখানা'য়। কিন্তু কেন এই বিশেষ ছাড়? কমিশনের কথায়, ওই রাজপ্যালেসে অতীতে চুরির ঘটনা ঘটেছে। আর সেই ঘটনা থেকেই ওই
রাজবাড়িতে থাকা সদস্যদের প্রাণনাশের ঝুঁকি থেকে যায়। তাই ওই রাজবাড়ির আবেদনের ভিত্তিতে নির্বাচন কমিশনের এই বিশেষ ছাড়। একদা রাজকন্যা মহেশ্বরী দেবীর বড় ছেলে অনশূল রাজাওয়াত বলেন, "আমার .১২ বোর দো-নলা বন্দুকটিতে বিশেষ ছাড় পেয়েছি। আমরা খুশি। নির্বাচনের সময় এই লাইসেন্সপ্রাপ্ত আগ্নেয়াস্ত্র পুলিশ হেফাজতে থাকে।
তাই আমরা প্রশাসনের কাছে আবেদন করেছিলাম পঞ্চকোট প্যালেসের সম্পদ রক্ষার্থে আমাদের কাছে থাকা বন্দুক, পিস্তল, রাইফেলের যাতে ছাড় পেতে পারি। তবে শুধু একটা দো-নলা বন্দুকের ছাড় মিলেছে।"
পঞ্চকোট রাজবাড়ির বন্দুক
প্রায় ৬ একর জুড়ে থাকা এই প্রাসাদের সুরক্ষায় আমেরিকা, ইংল্যান্ড, জার্মান কোম্পানির তিন তিনটে দো-নালা বন্দুক, দুটো পিস্তল এবং একটি রাইফেল ছিলো এই রাজবাড়িতে। এই বন্দুক, পিস্তল, রাইফেল দিয়ে অতীতে পঞ্চকোট রাজপরিবারের সদস্যরা বাংলা, ওড়িশায় 'শিকার খেলতে' যেতেন! সেই শিকারের নানান বন্যপ্রাণ আজ নিদর্শন হয়ে রয়েছে ওই প্যালেসের অন্দরে। ওই পঞ্চকোট প্যালেসে থাকা একদা রাজকন্যা মহেশ্বরী দেবীর .১২ বোরের দো-নলা বন্দুক, .২৫-র পিস্তল আছে। ওই দুটি আগ্নেয়াস্ত্র-র অবশ্য ছাড় মেলেনি। তাঁর বড় ছেলে অনশূল রাজাওয়াতের যে .১২ বোর দো-নলা বন্দুক রয়েছে তাতেই ছাড় দিয়েছে কমিশন। ফলে খুব স্বাভাবিকভাবেই তাঁর .২২ বোরের রাইফেল চলে গিয়েছে কাশিপুর থানার মালখানায়। তাঁর প্রয়াত স্ত্রী বীরাঙ্গানি রাজাওয়াতের যে দো-নলা বন্দুক ও ৩০০ বোরের পিস্তল ছিলো। যে পিস্তল দিয়ে হাতি পর্যন্ত মারা যায়! তা আগেই থানায় জমা রয়েছে।
তিনি গত দুর্গাপুজোর আগে মারা যাওয়ায়। যে দো-নলা বন্দুকটির বিশেষ ছাড় মিলেছে তা আমেরিকার ভেসলে রিচার্ডস কোম্পানির। অতীতে এই প্যালেসে অসংখ্য বন্দুক ছিল, ছিল একাধিক কামান। তবে ওই কামানগুলি বহু বছর আগেই পুলিশের হেফাজতে চলে গিয়েছে।
কিন্তু বিধির গেরোয় আগ্নেয়াস্ত্র ঠেকেছে এই ৬ টিতে। এই প্রাসাদে থাকা লন্ডনের বিশেষ লকার সবসময় তালা বন্দি থাকে। যেখানে বহু নথিপত্র সহ প্রাচীন সামগ্রী রয়েছে। ১৮৭২ সালে আনা বার্মিংহামের ঝাড়বাতি, জার্মানির পিয়ানো, ফ্রান্সের আসবাবপত্র দেখলে চোখ জুড়িয়ে যায়। ৫০টা তরবারি দর্শন হলেই যেন অতীতের রাজ-রাজাদের ছবি সামনে চলে আসে। চোখ টানে নানান পাথরের মূর্তি, বিদেশি কোম্পানির গ্র্যান্ড ফাদার ক্লক। আর শিকার করা বন্যপ্রাণ। যাদের শরীরের নাড়ি-ভুঁড়ি বের করে খড় ভরে যে স্টাফড বা ট্যাক্সিডার্মি রাখা আছে।
যার সংখ্যাও কম নয়। ৬ টা রয়্যাল বেঙ্গল টাইগার, একটি লেপার্ড, তিনটি হাতির পা, পাঁচটা বাইসনের মুখ, ৪ টে বারোসিঙ্গা, সেই সঙ্গে একটি হরিণ। এই বিপুল সম্পদের কারণেই
নির্বাচন কমিশনের স্ক্রীনিং কমিটি তথ্য যাচাই করে। আর তার ভিত্তিতেই মেলে ছাড়।
পঞ্চকোট রাজবাড়ির অন্দরসজ্জা
১৮৩২ সালে পঞ্চকোট রাজপরিবারের রাজধানী কাশীপুরে স্থানান্তরিত হয়। এখন সেই রাজা, রাজতন্ত্র না থাকলেও এই এস্টেট ২,৭৭৯ বর্গমাইল বিস্তৃত। যার মধ্যে রয়েছে সাবেক মানভূম, রাঁচি, বাঁকুড়া, কলকাতা, ওড়িশা এবং বেনারসে মূল্যবান খনি সহ বিস্তৃত সম্পত্তি। এই পঞ্চকোট প্যালেস তৈরি করেছিলেন এই রাজপরিবারের ৬৭তম রাজা মহারাজা জ্যোতিপ্রসাদ সিং দেও বাহাদুর। তাই 'জ্যোতি প্যালেস' নামেও এই রাজপ্রাসাদ পরিচিত। তাঁর ১২ বছরের শাসনকালে ৩০ লাখ টাকা খরচ করে চীন থেকে রাজমিস্ত্রি এনে ১২ বছর ধরে এই রাজপ্রাসাদ তৈরি হয়। ১৩২৩ বঙ্গাব্দ অর্থাৎ ১৯১৬ সালে এই প্রাসাদ নির্মাণ হয়। আজ এই প্রাসাদ ১০৯ বছরে পা দিয়েছে। সেই রাজপ্রাসাদ রক্ষার্থেই নির্বাচন কমিশনের এই পদক্ষেপ।
