shono
Advertisement

Breaking News

Purulia

জুটত না থালাভর্তি ভাতও! অভাবকে পরাস্ত করে আকাদেমি পুরস্কার পাচ্ছেন ২ ছৌ শিল্পী

পরিযায়ী শ্রমিকের ঘরে চাঁদের আলো! পুরুলিয়ার দুই ছৌ শিল্পীর জীবন সংগ্রামের স্বীকৃতি এই পুরস্কার।
Published By: Sucheta SenguptaPosted: 11:35 PM Jun 12, 2026Updated: 01:40 PM Jun 13, 2026

মাটির বাড়ি। টালি-খাপরার চালা। একসময় দু'বেলা থালাভর্তি ভাত জুটত না। থাকতে হতো অর্ধাহারে। রাত জেগে ছৌ নেচে যে সামান্যটুকু আয় হতো, তা দিয়ে কোনওভাবে চলতো সংসার। তবুও বীররসের এই লোক আঙ্গিককে জীবন থেকে বাদ দেননি তাঁরা। বরং এই নাচকে আরও বেশি ভালোবেসে ছৌ বিভঙ্গে আজও লড়াই চালিয়ে যাচ্ছেন। আর সেই লড়াইয়ের স্বীকৃতি পেলেন। পুরুলিয়ার দুই ছৌ শিল্পী পাচ্ছেন সঙ্গীত নাটক আকাদেমি পুরস্কার। একজন পুরুলিয়া ১ নম্বর ব্লকের সোনাইজুড়ি গ্রাম পঞ্চায়েতের বালিগাড়া গ্রামের ৫৪ বছরের নৃপেন সহিস, আরেকজন বাঘমুন্ডি ব্লকের সেরেঙডি গ্রাম পঞ্চায়েতের কুশলডির বাসিন্দা ২৫ বছরের সোমনাথ মাহাতো। সোমনাথের স্বীকৃতি উস্তাদ বিসমিল্লাহ খান যুব পুরস্কার নামে পরিচিত। বাংলার সংস্কৃতি ক্ষেত্রে পুরুলিয়ার এই জোড়া পুরস্কার শুধু জেলা নয়, বাংলাকেও গর্বিত করেছে।

Advertisement

কৃষ্ণরূপী ছৌ শিল্পী নৃপেন সহিস। ছবি: অমিত সিং দেও

ভারত সরকারের সংস্কৃতি মন্ত্রকের এই সংস্থা সম্প্রতি ১০৮ জনের নাম আকাদেমি পুরস্কার হিসাবে ঘোষণা করে। ২০২৪ সালের নৃত্য বিভাগে নৃপেন সহিস এই শিরোপা পান। অন্যদিকে ২০২৫ সালের লোকনৃত্যে এই পুরস্কার পাবেন সোমনাথ। আজ তাঁদের এই সাফল্যের পিছনে কম কাঠখড় পোড়াতে হয়নি। দাদু রাসু সহিসের কাছে মাত্র ১০-১১ বছর বয়সে ছৌ নাচে হাতেখড়ি শিল্পী নৃপেনের। চতুর্থ শ্রেণি পাশ করা কিশোরের অনুশীলনে তাঁর শরীরে যখন বীররসের মুদ্রা ফুটে ওঠে, তখন তাঁর বাবা-কাকারা বলেন, আর লেখাপড়া করতে হবে না। বংশের ছৌ পরম্পরাকে ধরে রাখতে পাকাপাকিভাবে এই নৃত্যকলাই শিখুক নৃপেন। শিল্পীর কথায়, ‘‘লেখাপড়া করতে একদম ভালো লাগত না। কী করে ভালো লাগবে বলুন? বাড়িতে সারাক্ষণ ধামসা, মাদল বাজছে। ছৌ নাচছেন দাদু, বাবা-কাকারা। তাই বাবা-কাকাদের ওই সিদ্ধান্তে কী যে আনন্দ হয়েছিল, বলে বোঝাতে পারব না! এখন এই শিল্পই আমার পেশা। আমি এখন কৃষ্ণ সাজি।"

নৃত্যগুরু দাদুর মূর্তির পাশে শিল্পী নৃপেন সহিস। ছবি: অমিত সিং দেও

আজ সংসারে খানিকটা স্বচ্ছলতা এলেও আগে অভাব ছিল নিত্যসঙ্গী। কত রাত যে না খেয়েই কেটেছে এই ছৌ শিল্পী-সহ তাঁর পরিবারের, তার ঠিক নেই। পেট ভরাতে জঙ্গলের শাক-পাতাও খেয়ে থেকেছেন নৃপেন। কিন্তু দাদুর তৈরি দল 'রাসু সহিস বালিগাড়া কিষান ছৌ নৃত্য পার্টি' একদিনের জন্য থমকে যায়নি। তাই আজ শিল্পী নৃপেনের ছোট ছেলে বিরোচন সহিস ও বড় ছেলে বুদ্ধেশ্বর সহিসও ছৌ নাচেন। বাবা নৃপেনের হাত ধরেই দুই ছেলের ছৌ শিক্ষা। গণেশ, কার্তিক, মহিষাসুর, দুর্গা, শ্রীকৃষ্ণ - কী না সাজেন বছর ৫৪-র এই শিল্পী! বিদেশে না যেতে পারার আক্ষেপ থাকলেও এই শিল্পকলার হাত ধরে ভারত ভ্রমণ হয়ে গিয়েছে তাঁর।

পরিযায়ী শ্রমিক পরিবারের সন্তান ছৌ শিল্পী সোমনাথ মাহাতো। ছবি: অমিত সিং দেও

সোমনাথ ঝাড়খণ্ড, ওড়িশা দিল্লি সহ এই শিল্পকলাকে নিয়ে জাপান, মালয়েশিয়াতেও ঘুরে এসেছেন। পরিযায়ী শ্রমিক বাবা সাধুচরণ মাহাতোর কাছে তাঁর ছৌ নাচে হাতেখড়ি। তিনিও ছৌ নাচে সঙ্গীত নাটক আকাদেমি পুরস্কার পান। শুধু ছৌ নাচে তো আর সংসার চলে না। তাই ছোট্ট মুদি দোকান করে এই নৃত্যকলাকে ঘিরে ছেলের স্বপ্নকে পূরণ করছেন বাবা। শিল্পী সোমনাথের কথায়, ‘‘আজ বাবার জন্যই আমি এই পুরস্কার পেলাম। বাবা আমার গুরু। তবে পরবর্তীকালে আমি অনেকের কাছে এই নাচ শিখেছি। অভাবের মুখোমুখি হয়ে এক-একটা দিন যে কীভাবে কেটেছে... কিন্তু আজ ভালো লাগছে খুব।" নৃপেনের মতো ভূগোলে অনার্স, ছৌ ডিপ্লোমা সোমনাথও এই নাচে যেন অলরাউন্ডার। সব চরিত্রই ফুটিয়ে তুলতে পারেন। তবে তাঁর কার্তিকের বেশ যেন আরও বেশি করে চোখ টানে সকলের।

Sangbad Pratidin News App

খবরের টাটকা আপডেট পেতে ডাউনলোড করুন সংবাদ প্রতিদিন অ্যাপ

হাইলাইটস

Highlights Heading
Advertisement