ছাব্বিশের বিধানসভা নির্বাচনে (West Bengal Assembly Election) ২৯৪ টি আসনের মধ্যে ২৫০টি আসনে জেতার লক্ষ্যমাত্রা ঠিক করে দিয়েছেন তৃণমূলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়। সেই নির্দেশ পূরণের লক্ষ্যে উত্তর থেকে দক্ষিণ সর্বত্রই প্রার্থীরা প্রচারের ময়দানে ঝাপিয়ে পড়েছেন। শুধুমাত্র বিধায়ক প্রার্থীদের জন্যই নয়, এই নির্বাচন কাউন্সিলরদের কাছেও বড় চ্যালেঞ্জ। কারণ শীর্ষ নেতৃত্ব আগেই ইঙ্গিত দিয়েছে, বিধানসভা নির্বাচনে ওয়ার্ড-ভিত্তিক ফলাফল বিচার করে আগামী পুর নির্বাচনে কাউন্সিলরদের টিকিট দেওয়া হবে। তাই আসন্ন নির্বাচনে কাউন্সিলরদের সক্রিয় অংশগ্রহণ খুবই গুরুত্বপূর্ণ। দলীয় নেতৃত্বের নির্দেশ মেনে রাজ্যের ৭টি পুরনিগম-সহ মোট ১২৮টি পুর এলাকায় বিধানসভা নির্বাচনের প্রস্তুতি শুরু করে দিয়েছেন কাউন্সিলররাও। সম্প্রতি চেতলার অহীন্দ্র মঞ্চে ভবানীপুর বিধানসভা এলাকার জনপ্রতিনিধি ও কর্মী সমর্থকদের নিয়ে বৈঠক করেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় (Mamata Banerjee) ও অভিষেক বন্দ্যোপাধ্য়ায় (Abhishek Banerjee)। সেখানেও এলাকার কাউন্সিলরদের বিধানসভা নির্বাচনে সক্রিয় থাকার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
২০২২ সালে রাজ্যে শেষ পুর নির্বাচন হয়েছিল। ২০২৭ সালে ফের বাংলায় পুর নির্বাচন হবে। বর্তমানে রাজ্যের ১২৮টি পুর এলাকার মধ্যে একটি বাদে বাকি সব জায়গায় ক্ষমতায় রয়েছে শাসকদল। শুধুমাত্র তাহেরপুর পুরসভা রয়েছে বামেদের দখলে। এই পুরসভার মোট আসন ১৩টি। এর মধ্যে ৮টিতেই জয়ী হয়েছে বাম প্রার্থীরা। বাকি ৫টি ওয়ার্ড তৃণমূলের দখলে আছে। অন্যদিকে ৪৭টি আসনের মধ্যে ৩৭টি আসনে জয়ী হয়ে শিলিগুড়ি পুরনিগম নিজেদের দখলে রেখেছে রাজ্যের শাসকদল। ৫টি আসনে রয়েছে বিজেপি প্রার্থীরা। ৪টি আসন রয়েছে সিপিআইএমের দখলে। উল্লেখ্য, ২০২২ সালের পুর নির্বাচনে শিলিগুড়ি পুরনিগমের প্রাক্তন মেয়র অশোক ভট্টাচার্য ৬ নম্বর ওয়ার্ড থেকে তৃণমূলের আলম খানের কাছে পরাজিত হন। বর্তমানে শিলিগুড়ি পুরনিগমের মেয়র গৌতম দেব । তিনি আবার শিলিগুড়ি বিধানসভা নির্বাচনেও তৃণমূলের প্রার্থী হয়েছেন। তাঁর প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী বিজেপির শঙ্কর ঘোষ। গৌতমকে জেতাতে দলের কাউন্সিলররা অনেকদিন আগে থেকেই ময়দান নেমে পড়েছেন।
পুর নির্বাচনে ভালো ফল হলেও লোকসভা বা বিধানসভা নির্বাচনে সংশ্লিষ্ট ওয়ার্ড থেকেই লিড পান না প্রার্থীরা। এই নিয়ে তৃণমূলে অসন্তোষ নতুন নয়।
পুর নির্বাচনে ভালো ফল হলেও লোকসভা বা বিধানসভা নির্বাচনে সংশ্লিষ্ট ওয়ার্ড থেকেই লিড পান না প্রার্থীরা। এই নিয়ে তৃণমূলে অসন্তোষ নতুন নয়। ২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচনে ৭৭টি আসনে জেতে ভারতীয় জনতা পার্টি। এই নির্বাচনে বেশ কয়েকটি পুর এলাকার একাধিক ওয়ার্ড থেকে লিড পায় গেরুয়া শিবির। পরের বছরই পুর নির্বাচনে ১২৮টি পুর এলাকার মধ্যে ১২৭টিতেই জয় পায় তৃণমূল। অন্যদিকে, ২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচনে ১২টি আসনে জয়ী হয় বিজেপির প্রার্থী। এই ভোটেও পুর এলাকার বেশ কয়েকটি ওয়ার্ড থেকে লিড পেয়েছিল পদ্ম শিবির। সেই পরিসংখ্যান প্রকাশ পেতেই লোকসভা ও বিধানসভা নির্বাচনে কাউন্সিলরদের ভূমিকা প্রশ্নের মুখে পড়ে।
আসন্ন বিধানসভা নির্বাচনে কুলটি বিধানসভা থেকে তৃণমূলের টিকিট পাননি তিনবারের বিধায়ক উজ্জ্বল চট্টোপাধ্যায়। ২০২১ সালের নির্বাচনে তিনি বিজেপি প্রার্থীর কাছে মাত্র ৬০০ ভোটে হেড়েছিলেন। সেই কারণেই হয়তো এবার কুলটি থেকে তাঁকে টিকিট দেওয়া হয়নি। সম্প্রতি উজ্জ্বল অসন্তোষের সুরে জানিয়েছেন, পুর নির্বাচনে ফলাফল ভালো হলেও লোকসভা বা বিধানসভা নির্বাচনে প্রার্থীকে ওয়ার্ড থেকে জেতাতে অনেক ক্ষেত্রেই ব্যর্থ হন কাউন্সিলররা। তার মাশুল গুনতে হয় প্রার্থীদের। সেই কারণে এবার বিধানসভা নির্বাচনের আগে থেকে দল স্পষ্ট করে দিয়েছে, ওয়ার্ড-ভিত্তিক পারফরম্যান্সের উপর নির্ভর করেই পরবর্তী পুর নির্বাচনে টিকিট পাবেন কাউন্সিলররা।
সম্প্রতি উজ্জ্বল চট্টোপাধ্যায় অসন্তোষের সুরে জানিয়েছেন, পুর নির্বাচনে ফলাফল ভালো হলেও লোকসভা বা বিধানসভা নির্বাচনে প্রার্থীকে ওয়ার্ড থেকে জেতাতে অনেক ক্ষেত্রেই ব্যর্থ হন কাউন্সিলররা। তার মাশুল গুনতে হয় প্রার্থীদের।
শুধু বিধায়ক প্রার্থীরাই নন, তৃণমূলের যুব সভাপতিরাও পুর এলাকার কাউন্সিলরদের পারফরমেন্সের কথা মনে করিয়ে দিয়েছেন। বেশ কয়েকটি ক্ষেত্রে দলের এই ইঙ্গিত নিয়ে অসন্তোষ তৈরি হয়েছে। অনেকের বক্তব্য, তাহলে কি কাউন্সিলররা কেউ কাজ করেন না? যদিও দলীয় নেতৃত্ব বুঝিয়ে দিয়েছে, যাঁরা সত্যিই কোনও কাজ করেন না, দলের কথা শোনেন না, শৃঙ্খলা মানেন না- এই বার্তা মূলত তাঁদের জন্যই। উত্তর কলকাতা তৃণমূল যুব কংগ্রেসের সভাপতি তথা উল্টোডাঙা এলাকার কাউন্সিলর শান্তি রঞ্জন কুন্ডু বলেন, "আমি দলের সঙ্গে ১০০ শতাংশ একমত। কিন্তু টিকিট দেওয়ার সময় দল যেন পারফরমেন্সটা বিচার করে। বড় নেতার চামচাগিরি করে এমআইসি হয়ে গেলাম এটা হলে মন খারাপ হয়। আমরা সারা বছর মানুষের সঙ্গে থাকি, জনসংযোগ করি। পুর পরিষেবা দেওয়ার ক্ষেত্রে কোনও খামতি নেই। সেই ২০১৫ সালে কাউন্সিলর হয়েছি কিন্তু দল আর কিছু বিবেচনা করেনি। হ্যাঁ, এটা ঠিক যে উত্তর কলকাতার যুব তৃণমূলের সভাপতি করেছে।"
দলীয় এই নির্দেশ নিয়ে কয়েকজনের মধ্যে অসন্তোষ তৈরি হলেও বেশিরভাগ কাউন্সিলরই তা মেনে নিয়ে কাজ শুরু করেছেন। শিলিগুড়ি পুরনিগমের ৩২ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর তাপস চট্টোপাধ্যায় জানিয়েছেন, ডাবগ্রাম-ফুলবাড়ি কেন্দ্রের তৃণমূল প্রার্থী রঞ্জনশীল শর্মাকে জেতাতে সব রমকভাবে প্রস্তুতি চলছে। ৩২ নম্বর ওয়ার্ড থেকে রঞ্জন সবথেকে বেশি লিড পাবেন বলে আশাবাদী তাপস। অন্যদিকে ১৭ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর মিলি সিনহা জানিয়েছেন, শিলিগুড়ি কেন্দ্রের প্রার্থী এবং পুরনিগমের মেয়র গৌতম দেবকে বিধানসভা নির্বাচনে জেতাতে প্রত্যেক কর্মী ঝাপিয়ে পড়েছে। এই ওয়ার্ড থেকে সর্বোচ্চ লিড দিতে কাজ শুরু হয়েছে।
অন্যদিকে দার্জিং জেলা তৃণমূল কংগ্রেসের চেয়ারম্যান সঞ্জয় টিব্রেওয়াল জানিয়েছেন, শিলিগুড়ি পুনিগমের ৪৭টি ওয়ার্ডের মধ্যে ৩৭টি ওয়ার্ডই রয়েছে তৃণমূলের দখলে। ওই ৩৭টি ওয়ার্ডের পাশাপাশি বিজেপির দখলে থাকা ওয়ার্ডগুলিতেও দলের কর্মী সমর্থকরা কাজ শুরু করে দিয়েছে। দলের নির্দেশ মেনেই সর্বোত্র কাজ করছে কাউন্সিলররা।
আসানসোল পৌরনিগমের ৮৬ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর ও মেয়র পারিষদ মানস দাস বলেন, "খুব কমই হেরেছি ওয়ার্ড থেকে। বেশিরভাগ সময়ই লিড দিয়েছি। এবারের প্রার্থী তাপস বন্দ্যোপাধ্যায়কে এলাকাবাসী সকলেই চেনে। তাই তাঁকে জেতানো খুব কঠিন হবে না। টিকিট দেওয়া না দেওয়ার বিষয়টি দল নির্ধারণ করবে।"
