নতুন প্রজন্মের সামনে সুযোগের দরজা খুলবে বাংলায়, বলছেন সিস্টেমেটিক্স প্রাইভেট ওয়েলথ-এর জয়েন্ট এমডি ও সিইও ভাস্কর হাজরা।
আমার স্টোরিটা এই রাজ্যের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত, এতটাই জড়িত যে নিজের জীবন, কেরিয়ার, ভবিষ্যত, সবের সঙ্গেই আমি পশ্চিমবঙ্গের তাল-লয়-ছন্দ খুঁজে পাই। পঁচিশ বছরের বেশি সময় ধরে প্রাইভেট ব্যাঙ্কিংয়ে কাজ করছি। এই সিকি শতাব্দীতে মধ্যে দেখেছি, ব্যবসা ও পুঁজি সবসময় সেই সব রাজ্যের দিকে ঝুঁকেছে যেখানে প্রশাসন স্থিতিশীল এবং শিল্প-বাণিজ্যের জন্য পরিবেশ ইতিবাচক। আমি সেই বাঙালিদের একজন যার কর্মজীবন পশ্চিমবঙ্গের বাইরে গড়ে উঠেছে। কিন্তু আমার শিক্ষা, বেড়ে ওঠা এবং বাবা-মা-সবই এই শহরের সঙ্গে যুক্ত।
ভনিতা থাকুক। সোজা কথায় আসি। কেন আমার মতে ২০২৬ আলাদা? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজি, আসুন। আমি এমন অপরচুনিটিতে বিনিয়োগ করি, যেখানে ঝুঁকি ও সম্ভাবনার অনুপাত অসম। আর এই ভাবনার আঙ্গিকে আমার বিশ্বাস যে ২০২৬ সালের পশ্চিমবঙ্গ, ভারতের অর্থনৈতিক পরিসরে সবচেয়ে আকর্ষণীয় সম্ভাবনাগুলির একটি হয়ে উঠতে পারে। স্বাধীন ভারতের ইতিহাসে এই প্রথম রাজ্য ও কেন্দ্রীয় সরকার একই অভিমুখে দাঁড়িয়ে আছে। এবং লক্ষ্যও এক পার্সোনাল ফিনান্স-সহ পজিটিভ সব কিছুকে উৎসাহ দেওয়া।
ভেবে দেখুন পরিস্থিতি কেমন। বাংলার মৌলিক শক্তিগুলি এখনও অটুট। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার প্রবেশদ্বার আমরা। শ্রমের খরচ এখনও মহারাষ্ট্র বা কর্নাটকের তুলনায় কম, এবং জমির দামও তুলনামূলকভাবে কমপিটিটিভ। এই রাজ্যকে এখন নতুন করে মূল্যায়ন করছে বেসরকারি পুঁজি।
বহু বছর ধরে ৫ শতাংশের নিচে থাকা বাংলার প্রকৃত জিডিপি বৃদ্ধির হার আগামী সাত থেকে দশ বছরে কাঠামোগতভাবে বছরে ৮-৯ শতাংশের দিকে পৌঁছতে পারে বলে মনে করেন অনেকে। তাই বাংলায় ব্যক্তিগত সম্পদ সৃষ্টির ক্ষেত্রেও এক দীর্ঘমেয়াদি উত্থানের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।
আমার কর্মজীবন গড়ে উঠেছে মুম্বইয়ে। আমার চেনা বহু বাঙালি প্রফেশনাল বাংলা ছেড়েছিলেন, কারণ বাংলা তাঁদের মেধা ও সামর্থ্যকে ধারণ করতে পারেনি বলেই। আজ বহুদিন পরে, সেই আশাটা আবার বাস্তবসম্মত বলে মনে হচ্ছে। ব্যবসার জন্য দরজা খুলছি আমরা।
অর্থনীতির সংখ্যাগুলি বেশ জটিল হয় অনেক সময়। ইতিহাসও বড় মাপের 'লেসন' দেয়। ১৯৬০ সালে ভারতের কথা মনে করিয়ে দিই। মোট জিডিপির ১০.৫% আসত পশ্চিমবঙ্গ থেকে, এবং এখানকার মানুষের মাথাপিছু আয় ছিল গড় ভারতীয়ের তুলনায় ২৭.৫% বেশি। ব্যপারটা একবার ভেবে দেখবেন।
সেই সময় মহারাষ্ট্রের অংশ ছিল ১২.৫%। হাওড়া, দুর্গাপুর ও আসানসোল জুড়ে বিস্তৃত শিল্পাঞ্চল, দেশের সবচেয়ে কর্মক্ষম বন্দর এবং দক্ষিণ এশিয়ার বাণিজ্যিক কেন্দ্র হিসেবে কলকাতা সব মিলিয়ে বাংলা ছিল ভারতের অর্থনৈতিক শক্তিকেন্দ্রগুলোর অন্যতম। বাংলা শুধু প্রতিযোগিতায় ছিল না, নেতৃত্ব দিচ্ছিল। কীভাবে সেই নেতৃত্ব হারিয়ে গেল তা আমরা বেশ জানি।
লিখতে লিখতে আশির দশকের কথা মনে পড়ল। যে সিদ্ধান্তগুলি দরজা বন্ধ করে দিয়েছিল, সে সবের কথা ভাবলাম। দুটি নীতিগত সিদ্ধান্ত পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছিল। সরকারি দপ্তরে কম্পিউটার ব্যবহারে নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছিল কেরানিদের চাকরি রক্ষার জন্য। ঠিক সেই সময় যখন গোটা বিশ্ব ডিজিটাল অর্থনীতির ভিত গড়ে তুলছিল। পাশাপাশি, প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে ইংরেজি সরিয়ে দেওয়া হয় এবং বাংলাকে শিক্ষার মাধ্যম করা হয়। এর ফলে এমন একটি প্রজন্ম তৈরি হয়, যারা ইংরেজি-ভিত্তিক জাতীয় চাকরির বাজারে প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ে। কোনও নীতিই শ্রমিকদের সুরক্ষা দেয়নি; বরং তাঁদের প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতা আরও কমিয়ে দিয়েছিল।
১৯৯১ সালে অর্থনৈতিক উদারীকরণ এলে বাংলা কাঠামোগতভাবে প্রস্তুত ছিল না। বেঙ্গালুরু, হায়দরাবাদ ও পুনে প্রযুক্তি-বিপ্লবের মূল কেন্দ্র হয়ে ওঠে এবং বাংলার ইঞ্জিনিয়াররাও কাজের সন্ধানে সেদিকেই চলে যান।
২০০৭ সালে একটি ভাবমূর্তির স্থায়ী প্রতিষ্ঠা দেখতে পেলাম আমরা। টাটা গোষ্ঠী ঘোষণা করেছিল যে তারা সিঙ্গুরে ন্যানো গাড়ির কারখানা তৈরি করবে। বাংলার জন্য এক গুরুত্বপূর্ণ শিল্প বিনিয়োগের সংকেত ছিল এটি। কিন্তু রাজনৈতিক বিরোধিতার কারণে সেই প্রকল্পকে রাজ্য ছাড়তে বাধ্য হয়। কারখানাটি গুজরাতে স্থানান্তরিত হয় এবং রতন টাটা প্রকাশ্যে জানান যে তিনি আর বাংলায় বিনিয়োগ করবেন না। এই ঘটনাই বহু বছর ধরে কর্পোরেট ভারতের চোখে বাংলার ভাবমূর্তিকে প্রভাবিত করে।
তবে টাটা প্রথম নয়। সত্তরের দশকের শুরুতে আদিত্য বিড়লাকে কলকাতার রাস্তায় রাজনৈতিক আন্দোলনকারীদের হাতে প্রকাশ্যে অপমানিত হতে হয়েছিল। সেদিন সন্ধ্যাতেই তিনি বম্বে চলে যান এবং আর কখনও ফিরে আসেননি।
২০১১ সালে সরকার পরিবর্তন হলেও পরবর্তী ১৫ বছরে সেই ক্ষতির মৌলিক পরিবর্তন হয়নি। আর্থিক ঘাটতি বেড়েছে, ব্যবসা করার পরিবেশের সূচক আরও খারাপ হয়েছে এবং দক্ষ পেশাজীবীদের রাজ্য ছাড়ার প্রবণতা অব্যাহত থেকেছে।
আশা করি আমার নিজের মনের ভাবনা আপনাদের সঙ্গে যথাযথভাবে শেয়ার করতে পেরেছি। আগামী দিনগুলিতে অনেক পরিবর্তন দেখব, এই বিশ্বাস রাখি।
