নিছক অঙ্গসজ্জা বা উৎসবের মরশুমে বাঙালি সোনা কেনে। কিনে আলমারিতে রেখে দেয় বছরের পর বছর। কালেভদ্রে তা যে অঙ্গে চড়ে না, তা নয়। যথারীতি টুকটাক সোনার গয়না অনেকেই পরে থাকেন। কিন্তু খুব একটা ব্যবহার যে হয় তা নয়। আর সেই গয়নাই এখন মধ্যবিত্তের পরম সম্পদ। যেকোনও প্রয়োজনে চটজলদি বন্ধক রেখে লোন নেওয়ার প্রবণতা ভারতীয় পরিবারগুলির মধ্যে বৃদ্ধি পেয়েছে। সম্প্রতি 'এক্সপেরিয়ান'-এর একটি সমীক্ষায় উঠে এসেছে এমনই এক চমকপ্রদ তথ্য। দেশের আমজনতার কাছে সোনা এখন আর শুধু অলংকার নয়, বরং সংকট মোচনের সবচেয়ে বড় সহায়।
ফাইল ছবি।
পরিসংখ্যান বলছে, গত ২০২৬ অর্থবর্ষে নতুন গোল্ড লোন বা স্বর্ণঋণের পরিমাণ আগের বছরের তুলনায় এক ধাক্কায় প্রায় ৮৪ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। ২০২৩ সালের মার্চ মাসে যেখানে মোট স্বর্ণঋণের পরিমাণ ছিল ৬.৩ লক্ষ কোটি টাকা, ২০২৬ সালের মার্চে তা প্রায় তিন গুণ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৯.৪ লক্ষ কোটি টাকায়। এই বিপুল জোয়ারের নেপথ্যে রয়েছে বিশ্ববাজারে সোনার আকাশছোঁয়া দাম। সোনার মূল্য বাড়ার কারণে, একই পরিমাণ গয়না বন্ধক রেখে আগের চেয়ে অনেক বেশি অঙ্কের ঋণ পাচ্ছেন গ্রাহকরা। ২০২৪ সালের মার্চের তুলনায় সোনার দামের সূচক যেখানে ১৪৪ শতাংশ বেড়েছে, সেখানে ঋণ মঞ্জুরের সূচক পেরিয়েছে ২০০ শতাংশের গণ্ডি। ফলে ২০২৩ অর্থবর্ষে গড় ঋণের পরিমাণ যেখানে ছিল ৯৮ হাজার টাকা, ২০২৬ অর্থবর্ষে তা দ্বিগুণ হয়ে দাঁড়িয়েছে ১ লক্ষ ৯৬ হাজার টাকায়।
ফাইল ছবি।
আগে স্বর্ণঋণের চল মূলত দক্ষিণ ভারতেই বেশি দেখা যেত। কিন্তু এখন সেই ধারা বদলে গিয়েছে। উত্তরপ্রদেশ, রাজস্থান বা মহারাষ্ট্রের পাশাপাশি এ রাজ্যেও এই প্রবণতা বাড়ছে ঝড়ের গতিতে। পশ্চিমবঙ্গে স্বর্ণঋণের বৃদ্ধির হার ১১২ শতাংশ। ছোট শহর ও মফস্বলের মানুষও এখন মহাজনের কুসীদ চক্র ছেড়ে ব্যাংকের দোরগোড়ায় ভিড় করছেন। গ্রামীণ অর্থনীতিতে গতি আনতে এই ঋণ বড় ভূমিকা নিচ্ছে। সমীক্ষায় দেখা যাচ্ছে, মোট স্বর্ণঋণের প্রায় ২৩ শতাংশই যাচ্ছে কৃষি বা ছোট ব্যবসার মতো অগ্রাধিকার ক্ষেত্রে। ব্যাংকের প্রতি তৈরি হচ্ছে গভীর আস্থা। তাই তো দেখা যাচ্ছে, গত ত্রৈমাসিকে প্রায় ৭৫ শতাংশ গ্রাহকই পুরোনো এবং বারবার সোনার ওপর ভরসা রাখছেন। অথচ আশ্চর্যের বিষয় হল, ঋণ নেওয়ার ধুম বাড়লেও গ্রাহকরা সময়মতো তা শোধও করে দিচ্ছেন। অনাদায়ী ঋণের পরিমাণ ০.৪ শতাংশ থেকে কমে দাঁড়িয়েছে মাত্র ০.২ শতাংশে। সব মিলিয়ে, ঘোর দুর্দিনেও সোনার উজ্জ্বল আভায় স্বস্তির আলো দেখছে ভারতীয় পরিবারগুলি।
