বহু দিক থেকেই ন্যাশনাল স্টক এক্সচেঞ্জ (NSE) ভারতবর্ষের আর্থিক জাগরণের ছবিটি তুলে ধরেছে। এক পুরোনো জমানায় ফিরিয়ে নিয়ে যাই আপনাদের। সে সময় বছরের পর বছর ধরে বাজার আমাদের সামনে এমন সব গল্প তুলে ধরত, যা কখনও অনুপ্রাণিত করত, কখনও হতাশাজনক হত, আবার কখনও গোটা সিস্টেমের উপর আস্থাকেই কঠিন পরীক্ষার মুখে দাঁড় করাত। বাজারকে মনে হত এক ধরনের এক্সক্লুসিভ ক্লাব, যেখানে তথ্য কেবল নির্দিষ্ট কিছু সূত্রের কাছাকাছি ঘুরে বেড়াত। এবং সুযোগ পাওয়া বা না পাওয়া নির্ভর করত বিশ্বাসের চেয়ে পরিচিতির উপর বেশি। সেই জমানায় ছোট বিনিয়োগকারীদের কাছে বাজারে অংশগ্রহণ মানেই ছিল অনিশ্চয়তা এবং ঝুঁকির অনুভূতি।
নব্বইয়ের দশকের গোড়ায় NSE এল, অতীতের সব ঘটনাবলী থেকে এক বিরাট বিচ্ছেদ ঘটল। তখন অনেকেই এর গুরুত্ব পুরোপুরি বুঝতে পারেননি, পরে বুঝেছেন। NSE শুধু একটি নতুন এক্সচেঞ্জ ছিল না–এটি এসেছিল এক নতুন দর্শনের রূপ ধরে। এর কেন্দ্রে ছিল বিনিয়োগকারী। স্ক্রিন-ভিত্তিক ট্রেডিং চালু হওয়ার সময় প্রথমদিকে অবশ্য অনেক সংশয় ছিল। ট্রেডিং ফ্লোর থেকে কম্পিউটার স্ক্রিনে চলে আসা (অনেকের কাছেই) প্রাণহীন মনে হয়েছিল। কিন্তু নীরবে তাই-ই বদলে দিল বাজারে অংশগ্রহণের চরিত্র। ভৌগোলিক দূরত্ব আর বাধা রইল না। মুম্বই হোক বা কলকাতা, অথবা কোনও ছোট শহর, বিনিয়োগকারীরা সমানভাবে দাম এবং সুযোগের নাগাল পেতে শুরু করলেন। খুচরো বিনিয়োগকারীদের জন্য প্রকৃত অর্থেই ক্ষমতায়নের এক নতুন অধ্যায় শুরু করল NSE। ‘ট্রান্সপারেন্সি’, যা একসময় অধরা ছিল, ধীরে ধীরে বাস্তব রূপ পেল। রিয়েল-টাইম তথ্য, অজ্ঞাত পরিচয়ে অর্ডার ম্যাচিং এবং সিস্টেম-নির্ভর প্রক্রিয়া বাজারে চলে এল। বাজারের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি–আস্থা বা বিশ্বাস–গড়ে উঠল।
সম্ভবত সবচেয়ে গভীর পরিবর্তনটি এসেছে সংস্কৃতিগত ক্ষেত্রে। ভারত ধীরে ধীরে শুধু সঞ্চয়কারীর দেশ থেকে বিনিয়োগকারীর দেশে পরিণত হচ্ছে।
এনএসই-র সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য দিক হল তার ধারাবাহিক বিবর্তন। শুধু ত্রুটি সংশোধনেই এই এক্সচেঞ্জ থেমে থাকেনি। বরং ক্রমবর্ধমান বাজারের প্রয়োজনকে আগেভাগেই বুঝে পদক্ষেপ নিয়েছে।
- ডেরিভেটিভস থেকে শক্তিশালী ঝুঁকি-পরিচালনা কাঠামো–সর্বত্রই লক্ষ্য ছিল ভবিষ্যতমুখী এবং বিনিয়োগকারী-কেন্দ্রিক চিন্তাভাবনা।
- সংযোগ ব্যবস্থার বা কমিউনিকেশনের উন্নতি আরেকটি নীরব বিপ্লব। আজ স্মার্টফোনের মাধ্যমে বাজারে পা রাখা তো খুবই স্বাভাবিক ব্যাপার। কিন্তু এর পেছনে রয়েছে দীর্ঘমেয়াদি প্রযুক্তিগত এবং পরিকাঠামোগত উন্নয়নের প্রচেষ্টা।
- ছোট শহরের বিনিয়োগকারীরাও এখন বেশ আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে বাজারে অংশ নিচ্ছেন। পুরোনো দিনে এই ব্যাপারটি একসময় প্রায় অসম্ভব বলে মনে হতো, তাই না?
- শক্তিশালী ক্লিয়ারিং এবং সেটেলমেন্ট ব্যবস্থা অবশ্যই আছে। লোভ এবং আতঙ্কের চক্রের মধ্যেও বাজারকে স্থিতিশীল রাখতে সাহায্য করেছে তা। ফলে বৃদ্ধি ও স্থায়িত্বের সুযোগ একসঙ্গে পাওয়া যায় এখানে।
পরিশেষে আমরা বলতে চাই আরও একটি জরুরি কথা। সম্ভবত সবচেয়ে গভীর পরিবর্তনটি এসেছে সংস্কৃতিগত ক্ষেত্রে। ভারত ধীরে ধীরে শুধু সঞ্চয়কারীর দেশ থেকে বিনিয়োগকারীর দেশে পরিণত হচ্ছে। লক্ষ লক্ষ মানুষ সচেতনতা এবং আত্মবিশ্বাস নিয়ে বাজারে আসছেন, আর এই পরিবর্তন সম্ভব করে তুলতে এনএসই-র ভূমিকা অনস্বীকার্য।
আগামী দিনের পথ নতুন চ্যালেঞ্জ নিয়ে আসবে–অ্যালগরিদমিক ট্রেডিং থেকে বৈশ্বিক অনিশ্চয়তা পর্যন্ত। তবুও একটি শিক্ষা স্পষ্ট, যে প্রতিষ্ঠান বিনিয়োগকারীদের অগ্রাধিকার দেয়, সময়ের পরীক্ষায় তারাই টিকে থাকে। আজ বহু দিক থেকেই এনএসই-র যাত্রাটি ভারতের আর্থিক জাগরণের প্রতিফলন–যেখানে ভাঙা পড়েছে পুরোনো সিস্টেম। সাধারণ মানুষকে দেশের বৃদ্ধির অংশীদার করা গেছে। কারণ আমরা তো শেষ পর্যন্ত বুঝে গেছি যে বাজার শুধুমাত্র সংখ্যার খেলা নয়, বাজার আসলে সাধারণ মানুষেরই কাহিনি।
