Advertisement
ইরান হারে না! আয়াতোল্লার 'ভূতে'ই চাপে আমেরিকা-ইজরায়েল, মেঘের আড়ালে ঘুঁটি সাজাচ্ছেন কোন মেঘনাদ?
ইরানের সুপ্রিম লিডার থেকে শুরু করে দেশের একাধিক শীর্ষ নেতৃত্ব নিশ্চিহ্ন হয়ে গিয়েছেন এই যৌথ হামলায়। কিন্তু একটিবারের জন্যও যুদ্ধে পিছু হঠেনি ইরান।
১৪ দিন ধরে ইরানে মুহুর্মুহু আক্রমণ শানাচ্ছে আমেরিকা-ইজরায়েল। ইরানের সুপ্রিম লিডার থেকে শুরু করে দেশের একাধিক শীর্ষ নেতৃত্ব নিশ্চিহ্ন হয়ে গিয়েছেন এই যৌথ হামলায়। কিন্তু একটিবারের জন্যও যুদ্ধে পিছু হঠেনি ইরান। বরং হরমুজ প্রণালী কার্যত অবরুদ্ধ করে তারা সেয়ানে সেয়ানে টক্কর দিচ্ছে। কার নিখুঁত মগজাস্ত্রে এই পালটা মার চালিয়ে যাচ্ছে ইরান?
উত্তর লুকিয়ে রয়েছে ২৩ বছর আগের এক ঘটনায়। ২০০৩ সালে ইরানের প্রতিবেশী ইরাকে অপারেশন শুরু করে মার্কিন ফৌজ। আমেরিকার উদ্দেশ্য, ইরাকে সাদ্দাম হুসেনকে ক্ষমতাচ্যুত করা। স্রেফ সাদ্দাম জমানা নয়, একই সঙ্গে ইরাকের সেনাবাহিনীকে একেবারে সমূলে উৎখাত করে দেওয়াটাই আমেরিকার উদ্দেশ্য ছিল। মাত্র ২৬ দিনে কাজ হাসিল করে ফেলে আমেরিকা।
২৩ বছর পরে ইরানের ক্ষেত্রেও কিছুটা একই স্ট্র্যাটেজি ছিল আমেরিকা-ইজরায়েলের। অপারেশন সিংহ গর্জন শুরু করে দুই দেশ। হামলার প্রথম দিনই মৃত্যু হয় ইরানের সুপ্রিম লিডার আয়াতোল্লা খামেনেইয়ের। সঙ্গে ইরান রেভোলিউশনারি গার্ড কর্পসের কমান্ডার ইন চিফ মেজর জেনারেল মহম্মদ পাকপোরেরও মৃত্যু হয়। মৃতদের তালিকায় রয়েছেন ইরানের প্রতিরক্ষামন্ত্রী এবং সামরিক শীর্ষকর্তারা।
ওয়াকিবহাল মহলের মতে, এই মৃত্যুমিছিল পর্যন্ত আমেরিকার কৌশল খুব ভালোমতো খেটে গিয়েছে। তাদের লক্ষ্য ছিল ইরানের শীর্ষ নেতৃত্বকে গুঁড়িয়ে দেওয়া, সেটা সম্পন্ন হয়েছে। আমেরিকা-ইজরায়েল মনে করেছিল ইরানের শীর্ষ নেতাদের ধুয়েমুছে সাফ করে দিলেই দেশের মেরুদণ্ড ভেঙে পড়বে। নেতৃত্বহীনতায় ভুগবে ইরান, ফলে যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়া অসম্ভব হয়ে পড়বে। শেষ পর্যন্ত আমেরিকার কাছে নতজানু হবে তেহরান।
এই জায়গায় এসে মার্কিন-ইজরায়েলি রণকৌশল ব্যর্থ হয়ে গিয়েছে। কারণ যুদ্ধ ১৪ দিন গড়িয়ে গেলেও ইরানের তরফ থেকে যুদ্ধ থামানোর কোনও লক্ষণ নেই। বরং মধ্যপ্রাচ্যের নানা প্রান্তে ছড়িয়ে থাকা মার্কিন ঘাঁটিগুলিতে লাগাতার আক্রমণ শানিয়ে গিয়েছে। যুদ্ধের আগুনে জ্বলছে পশ্চিম এশিয়ার বিরাট অংশ। ওয়াকিবহাল মহলের প্রশ্ন, শীর্ষ নেতৃত্বের অনুপস্থিতিতেও এহেন পালটা মার ইরান দিচ্ছে কী করে?
বিশ্লেষকদের একাংশ মনে করছে, মেঘের আড়ালে মেঘনাদের মতো ইরানে কাজ করছেন মহম্মদ আলি জাফারি। ইরানের রেভোলিউশনারি গার্ড কর্পসের প্রাক্তন কমান্ডার ইন চিফ। ১৯৭৯ সাল থেকে শুরু হওয়া ইরান-ইরাক যুদ্ধে লড়েছেন। সেখান থেকে ধীরে ধীরে উন্নতি। ২০০৭ সালে ইরানের বাহিনীর কমান্ডার ইন চিফ পদে বসেন। প্রায় একাহাতে তিনি ইরানের সামরিক ভবিষ্যৎকে শক্তিশালী করে তোলেন।
২০০৫ সালে জাফারিকে ইরান সেনার স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজ বিভাগের ডিরেক্টর করা হয়। সেসময়েই ইরাকের সঙ্গে ইরানের যুদ্ধ নিয়ে চুলচেরা বিশ্লেষণ শুরু করেন। ইরাকে মার্কিন সেনার অপারেশন নিয়েও পড়াশোনা চালিয়ে যান। দু'বছর ধরে অক্লান্ত পরিশ্রমের পর তৈরি করেন ইরানের মোজাইক ডিফেন্স ডকট্রিন। যে তত্ত্বের জোরে আজ আমেরিকা-ইজরায়েলকে পালটা মার দিচ্ছে ইরান।
কী রয়েছে এই মহাগুরুত্বপূর্ণ ডকট্রিনে? মার্কিন রিপোর্ট অনুযায়ী, ইরান-ইরাক যুদ্ধ এবং ইরাক-আমেরিকা যুদ্ধ খতিয়ে দেখে বিশেষ এক বিধি তৈরি করেন জাফারি। সেখানে বলা হয়, ইরানের মোল্লাতন্ত্র উপড়ে ফেলতে দুইভাবে ছক সাজাতে পারে প্রতিপক্ষ। প্রথমত, ইরানের মানবাধিকার এবং অন্যান্য স্বেচ্ছাসেবী সংস্থার মাধ্যমে বিদ্রোহ ঘোষণা। দ্বিতীয়ত, আমেরিকার সামরিক হামলা।
মোল্লাতন্ত্রের বিরোধী এই দুই শক্তির মোকাবিলা করতে শুরু হয় 'মোজাইক ডিফেন্স'। অর্থাৎ ইরানের সেনাকে দেশের প্রত্যেক প্রান্তে ছড়িয়ে দেওয়ার প্রক্রিয়া। দেশজুড়ে তৈরি হয় ইরান সেনার ৩১টি ইউনিট, যাদের হাতে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা রয়েছে। ইরানের কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব যদি সিদ্ধান্ত নেওয়ার মতো অবস্থায় না থাকে তাহলেও সেনার কার্যক্ষমতা কমবে না। বরং পরিস্থিতি বুঝে ইরান সেনার অংশগুলিই স্বয়ংসম্পূর্ণ হয়ে প্রতিরক্ষার ভার তুলে নিতে পারবে।
মোজাইক ডিফেন্সকে কার্যকরী করে তুলতে প্রয়াত আয়াতোল্লা খামেনেইয়ের যথেষ্ট ভূমিকা ছিল। তাঁর পরিচালনা এবং নেতৃত্বেই দেশজুড়ে তৈরি হয় ইরান সেনার ৩১টি ইউনিট। প্রত্যেকটি অংশের নিজস্ব অস্ত্রভাণ্ডার, গোয়েন্দা সূত্র-সমস্তই রয়েছে। জরুরি পরিস্থিতিতে সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকারও রয়েছে প্রত্যেক ইউনিটের। কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের সিদ্ধান্তের অপেক্ষা না করেই কাজ করার স্বাধীনতা দেওয়া হয়েছে ইউনিটগুলিকে।
বিশ্লেষকরা মনে করছেন, শীর্ষ নেতৃত্ব ধুয়েমুছে সাফ হয়ে যাওয়ার পর হার না মেনে ইরান যে নানা প্রান্তে পালটা হামলা চালিয়ে যাচ্ছে, সেটার অন্যতম কারণ হল সামরিক ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ। দেশের সকল প্রান্তে স্বয়ংসম্পূর্ণ সেনা মোতায়েন থাকার কারণেই পালটা আক্রমণ শানানোর ক্ষেত্রে একবিন্দু ভুলচুক করছে না ইরান সেনা। অর্থাৎ নেতা ছাড়াই ইরান দিব্যি যুদ্ধ চালিয়ে যাচ্ছে। বিশ্লেষকদের মতে, মোজাইক ডিফেন্সের মূল উদ্দেশ্য হার এড়ানো। আমেরিকার বিরুদ্ধে এখন সেটাই করছে ইরান।
Published By: Anwesha AdhikaryPosted: 04:49 PM Mar 13, 2026Updated: 04:50 PM Mar 13, 2026
Sangbad Pratidin News App
খবরের টাটকা আপডেট পেতে ডাউনলোড করুন সংবাদ প্রতিদিন অ্যাপ
