আকারে সাধারণ হরিণের মতোই। নিরীহ, শান্ত, সাধারণত মানুষের সঙ্গে মোলাকাত এড়িয়ে চলতেই ভালোবাসে এরা। কিন্তু হঠাৎ মুখোমুখি হয়ে গেলে, রীতিমতো ভিরমি খেয়ে যায় মানুষ। কেন? কারণ হরিণটির মুখের দুইপাশ থেকে বেরিয়ে রয়েছে ধারালো দাঁত, অল্প বেঁকে ঝুলছে মুখের দু’পাশে। আচমকা এমন প্রাণীর সঙ্গে সামনাসামনি দেখা হলে, ঘাবড়ে যাবেন যে কেউ। আর তাই তো লোকমুখে সে তকমা পেয়েছে ‘ভ্যাম্পায়ার ডিয়ার’-এর।
অথচ শুনলে অবাক হতে হয়, খয়েরী-ধূসর এই হরিণের সঙ্গে রক্তচোষা বাদুড়ের কোনও সম্পর্কই নেই! বরং নিতান্তই মুখচোরা এই ভ্যাম্পায়ার ডিয়ার (Endangered musk deer)। আদতে তা কস্তুরী হরিণের এক প্রজাতি বিশেষ, যা হিমালয়ান মাস্ক ডিয়ার নামে পরিচিত। অত্যন্ত বিরল এই হরিণ। বাসস্থানের অভাব তো রয়েছে, তাছাড়াও রয়েছে শিকারির ভয়। এই হরিণের নাভীমূল থেকে নানা ধরনের সুগন্ধিযুক্ত প্রসাধনী তৈরি করা যায়। তাই নির্বিচারে হত্যা হতে হয় চোরাশিকারিদের হাতে। এমন নানা কারণেই গত ৭০ বছর ধরে রাজ্যের জঙ্গলগুলিতে দেখা মেলেনি ভ্যাম্পায়ার ডিয়ারের। শেষবার পশ্চিমবঙ্গে তার উপস্থিতি নথিভুক্ত করা গিয়েছিল ১৯৫৫ সালের কাছাকাছি।
সাম্প্রতিককালে আবারও চর্চায় উঠে এসেছে এই হরিণ। কেন? কারণ পশ্চিমবঙ্গের কালিম্পঙের নেওরা ভ্যালি জাতীয় উদ্যানে বসানো ট্র্যাপ ক্যামেরায় ধরে পড়েছে ছবি। দেখা গিয়েছে, রাতের অন্ধকারে সেখানে চড়ে বেড়াচ্ছে এক ভ্যাম্পায়ার ডিয়ার। বিগত বছরগুলিতে অরুণাচল, হিমাচল, জম্মু ও কাশ্মীর, সিকিম, উত্তরাখণ্ডের বিভিন্ন এলাকায় দেখা যাচ্ছিল এই জাতের হরিণগুলিতে। তবে পশ্চিমবঙ্গের কোথাও তারা রয়েছে কি-না, বোঝা যাচ্ছিল না কোনওভাবেই।
তাই ২০২৩ সাল থেকে ভ্যাম্পায়ার হরিণের খোঁজে নামে জীববিজ্ঞানীরা। ২০২৪-এর একেবারে শেষভাগে ট্র্যাপ ক্যামেরায় ধরা পড়ে মোট ৬টি ছবি। সে ছবির সূত্র ধরে এগিয়েই বর্তমানে আরও নিশ্চিত হওয়া গিয়েছে এদের অস্তিত্ব সম্পর্কে।
ট্র্যাপ ক্যামেরা ফুটেজ।
এই প্রজাতির স্ত্রী হরিণটি একেবারেই সাদামাটা দেখতে। তবে পুরুষটির ক্ষেত্রে দেখা যায়, মুখের দুইপাশে বেরিয়ে থাকা ধারালো ক্যানাইন দাঁত, ও সূচাল কান। অন্য হরিণের মতো এদের শিং থাকে না; বরং ওই দাঁতই প্রজনন মৌসুমে প্রতিদ্বন্দ্বীর সঙ্গে লড়াই এবং আধিপত্য প্রতিষ্ঠার কাজে ব্যবহৃত হয়। আন্তর্জাতিক প্রকৃতি সংরক্ষণ সংঘ (IUCN) কস্তুরী হরিণকে Endangered (বিপন্ন) শ্রেণিতে অন্তর্ভুক্ত করেছে।
নেওরা ভ্যালি জাতীয় উদ্যান দীর্ঘদিন ধরেই লাল পান্ডা, মেঘলা চিতা, হিমালয়ান কালো ভালুক-সহ বহু বিরল প্রাণীর নিরাপদ আবাস হিসেবে পরিচিত। বিজ্ঞানীদের মতে, সেখানে কস্তুরী হরিণের পুনরাবির্ভাব ভবিষ্যতে আরও বিস্তৃত গবেষণা, জনসংখ্যা নিরূপণ এবং সংরক্ষণ কর্মসূচির পথ খুলে দেবে।
