দক্ষিণ ভারতীয় মহাসাগরের তলদেশ নিয়ে গবেষণায় ব্যস্ত ছিলেন আন্তর্জাতিক স্তরের বিজ্ঞানীদের একটি দল। এ সময় তাঁরা সাক্ষী হন এক আশ্চর্য প্রাকৃতিক ঘটনার। তাঁদের সামনে সমুদ্রতলের একটি অংশ দুই মিটারেরও বেশি প্রসারিত হয়ে, ফেটে যায় (Ocean floor splits apart)। এর পরের কয়েকদিনে সেখানে জমে থাকা লক্ষ লক্ষ কিউবিকমিটার ম্যাগমা বাইরে বেরিয়ে আসে। ছড়িয়ে পড়ে সমুদ্রপৃষ্ঠ জুড়ে। ম্যাগমা বলতে বোঝায়, গলিত লাভার অবশিষ্টাংশ। বেশ কিছুদিন ধরে ঘটে সমগ্র প্রক্রিয়াটি। কিন্তু স্বাভাবিকভাবেই বিস্ময়ে হতবাক হয়ে পড়েন বিজ্ঞানীদের দলটি।
'নেচার' পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে এ সংক্রান্ত প্রতিবেদনটি। বিজ্ঞানীরা অবশ্য জানিয়েছেন, এই ঘটনা অস্বাভাবিক নয়। নতুন সমুদ্রতল তৈরির একেবারেই স্বাভাবিক প্রক্রিয়া এটি। তবে ‘রিয়ল টাইম’-এ তার সাক্ষী হতে পারা বিজ্ঞানীদল তথা বিজ্ঞান জগতের কাছে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
কীভাবে তৈরি হয় নতুন সমুদ্রতল?
পৃথিবীর সমুদ্রতল সবসময়ই পরিবর্তনশীল। মধ্য-মহাসাগরীয় রিজ (Mid-Ocean Ridge) বরাবর টেকটোনিক প্লেটগুলো নির্দিষ্ট সময় অন্তর একে অপরের থেকে ধীরে ধীরে সরে যায়। ফলে নিচে চেপে থাকা গলিত ম্যাগমা উপরে উঠে আসে। পরে তা ঠান্ডা হয়ে, শক্ত হয়ে নতুন ভূত্বক তৈরি করে। বিজ্ঞানীরা বহু দশক ধরেই এই প্রক্রিয়া সম্পর্কে জানলেও, এতদিন কেউ তা সরাসরি ঘটতে দেখেননি। ফলে এই বিষয়ে এখনও অনেক প্রশ্নের উত্তর অজানা রয়ে গিয়েছে।
এই রহস্য উদ্ঘাটনের জন্যই গবেষকরা ভারত মহাসাগরের দক্ষিণ-পূর্ব অংশে সাউথইস্ট ইন্ডিয়ান রিজ-এ গবেষণা চালান। এই রিজটি অ্যান্টার্কটিক ও অস্ট্রেলিয়ান টেকটোনিক প্লেটকে আলাদা করেছে। দেখা গিয়েছে, দুটি প্লেটই প্রতি বছর প্রায় ৬ সেন্টিমিটার করে একে অপরের থেকে দূরে সরে যাচ্ছে। বিজ্ঞানীরা জানান, প্লেটের এই গতি সবসময় সমান থাকে না। কখনও দীর্ঘ সময় স্থির থাকার পর হঠাৎ করেই ভূমিকম্পের প্রভাবে ছিটকে দূরে সরে যায়।
২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে গবেষকরা প্রায় ১০০ কিলোমিটার অংশ জুড়ে বিভিন্ন ধরনের যন্ত্র স্থাপন করেন, যার মধ্যে ছিল হাইড্রোফোন, অ্যাকোস্টিক বিকন প্রভৃতি। গবেষণা শুরুর কিছুদিন পর হাইড্রোফোনগুলো একাধিক ভূমিকম্পজনিত কম্পন রেকর্ড করতে শুরু করে। এরপর বিকনের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, সমুদ্রতলের কিছু অংশ অন্তত দুই মিটার পর্যন্ত সরে গিয়েছে।
ফ্রান্সের ন্যাশনাল সেন্টার ফর সায়েন্টিফিক রিসার্চ (CNRS)-এর মেরিন জিওলজিস্ট জ্যঁ-ইভ রোয়ে এই ঘটনাকে ‘মেজর সারপ্রাইজ’ বলে আখ্যায়িত করেছেন। ভূত্বকের পরিবর্তনের এই সম্যক জ্ঞান যে ভূ-বিজ্ঞানীদের গবেষণায় নতুন দিশা দেখাতে পারে, সে সম্পর্কে আশাবাদী তাঁরা।
